ঘটনার শুরু গভীর রাতে। বাড়ির সবাই যখন ঘুমে অচেতন, তখন বড় ছেলে সাইফুর রহমান সোহান (২৮) তার ছোট ভাই সাকিবের (১৮) ওপর আক্রমণ করে। প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছোট ভাইয়ের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়, যাতে সে পালাতে না পারে। এরপর একাধিক আঘাতে নিশ্চিত করে তার মৃত্যু। এই পুরো ঘটনাটি ঘটে নিঃশব্দে। হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ পরই বাবা সোহেল রানা (৫০) ঘটনাটি দেখে ফেলেন। নিজের ছেলের হাতে আরেক ছেলের নির্মম মৃত্যু—এই দৃশ্যই তাকে পরিণত করে দ্বিতীয় শিকারে। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সোহান আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং দ্রুত একজন সহযোগীকে ডেকে আনে। এরপর তারা দুজন মিলে বাবাকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যায়। ফেলে রাখা হয় রেললাইনে। একটি চলন্ত ট্রেন পিষে দিয়ে যায় বাবাকেও।
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ভাই ও বাবাকে রোমহর্ষক হত্যার এভাবেই বর্ণনা দেন ঘাতক সোহান। গতকাল সোমবার বিকেলে গাজীপুর চিফ জুডিসিয়াল মেট্রোপলিটন আদালতের বিচারক তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) বায়েজিদ নেওয়াজ।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে সেই ভয়াবহ দৃশ্য—রাতের অন্ধকারে দুজন ব্যক্তি একজন দুর্বল মানুষকে ধরে রেললাইনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন, সেই ব্যক্তি ছিলেন সোহানের বাবা। ফুটেজে আরও দেখা যায়, রেললাইনের ওপর তাকে ফেলে রেখে দ্রুত সরে যায় তারা। কিছু সময় পর ট্রেনের নিচে পড়ে মৃত্যু হয় তার। ঘটনার পরপরই এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে—বাবা নাকি ছোট ছেলেকে হত্যা করে নিজেই আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু এ গল্প বেশিক্ষণ টেকেনি। কারণ, সিসিটিভি ফুটেজই ভেঙে দেয় সব মিথ্যা। সেখানে স্পষ্ট দেখা যায় বাবাকে জীবিত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, সোহানের উপস্থিতি এবং তার সন্দেহজনক গতিবিধি। এ প্রযুক্তিগত প্রমাণই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং সামনে আসে প্রকৃত সত্য।
গত শনিবার মধ্যরাতে গাজীপুরের টঙ্গীর বনমালা এলাকায় ঘটে এ ঘটনা। পরদিন রোববার সকালে দুটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় সাইফুর রহমান সোহানকে।
তদন্তে জানা গেছে, পরিবারের খালাতো বোনের সঙ্গে বড় ছেলে সোহানের বিয়ে ঠিক হয়েছিল; কিন্তু সেই মেয়ের সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক গড়ে তোলে ছোট ভাই সাকিব। বিষয়টি জানার পর থেকেই দুই ভাইয়ের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। সোহান বারবার সতর্ক করলেও সম্পর্ক থামেনি। ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক পরিণত হয় মানসিক চাপ, অপমানবোধ এবং জমে থাকা ক্ষোভে। শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষোভই রূপ নেয় রক্তাক্ত প্রতিশোধে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের ডিসি (ক্রাইম) মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ত্রিভুজ প্রেমের বলি হয়ে বড় ভাই একাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ঘটনার পর সোহানের আচরণ ছিল রহস্যজনক। সে পালিয়ে যায়নি, বরং স্বজনদের ফোন করে হত্যার খবর জানাতে থাকে; কিন্তু তার ফোনকলের সময়, বক্তব্য এবং বাস্তব ঘটনার মধ্যে অসংগতি পাওয়া যায়।

ন্যাশনাল ডেস্ক । জনতার কন্ঠ 



















