মেজর (অব:) মনজুর কাদের
১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের পরপরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাসভবনে আমি সাক্ষাৎ করি এবং আওয়ামী বাকশালীদের অত্যাচারের কাহিনি বিশদভাবে তাঁর সামনে তুলে ধরি।
সরকারি মালিকানাধীন, ইংরেজি দৈনিক দ্য বাংলাদেশ অবজারভারে ১৯৭২-৭৫-এ ফুলটাইম সাংবাদিক হিসাবে, বাংলাদেশের প্রায় সকল দৈনিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায় লেখালেখি করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যখন বর্ণনা করছিলাম বেগম জিয়া বারবার বলে উঠছিলেন, আওয়ামী লীগ অগণতান্ত্রিক একটি রাজনৈতিক দল তা জানতাম, কিন্তু এতো বাজে তা আগে বুঝিনি।
দীর্ঘ আলোচনার সময়ে আমি আমার যুক্তি উপস্থাপন করি যে একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠন করা ছাড়া আওয়ামী লীগকে রাস্তায় এবং নির্বাচনে কোনোভাবেই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। আওয়ামী লীগ হলো একটি ফ্যাসিস্ট দল, একে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামি শক্তির জোট গঠনের কোনো বিকল্প নেই।
যেহেতু আমার নির্বাচনি এলাকায় আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন মহাসচিব (পরে আমির) মাওলানা মতিউর নিজামী। তাই আমার আসন (সাথিয়া-বেড়া) তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলি জোট গঠনের স্বার্থে। তিনি বলেন যে তার প্রয়োজনে আমাকে সেখানে থাকতে হবে।
চারদলের মহাসচিবদের বৈঠক
________________
আমার একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে প্রথম পর্যায়ে বিরোধী দলের নেতার সরকারি বাসভবন, ২৯, মিন্টো রোডে জোটের অন্তর্ভুক্ত চারটি দলের মহাসচিবদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বর চারদলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সাবেক মন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসনের তথ্য উপদেষ্টা আনোয়ার জাহিদ প্রণীত বৈঠকের ঘোষণাপত্রটি আমার কম্পিউটারে টাইপ করা হয়, যা সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করে মিন্টো রোডে আমার নিয়োজিত লোক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে দালানের পেছনের দেওয়াল টপকিয়ে পৌঁছে দেয়।
বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন
__________________
এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন : ১. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ২. জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ৩. জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির অধ্যাপক গোলাম আযম এবং ৪. ইসলামী ঐক্যজোটের প্রধান আল্লামা শায়খুল হাদিস। দলগুলোর মহাসচিব যথাক্রমে আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, নাজিউর রহমান মঞ্জু, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং ফজলুল হক আমিনী উপস্থিত ছিলেন।
হঠাও হাসিনা বাঁচাও দেশ
__________________
বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৯৯৬-২০০১-এর স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যৌথ আন্দোলন জোরদার করা। ‘হঠাও হাসিনা বাঁচাও দেশ’-এর দাবিকে এক দফায় পরিণত করা এবং সরকারের দমননীতি, হত্যা, গুম, রাহজানি, দুর্নীতি ও একতরফা ভারতপন্থি নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের কর্মসূচি নেওয়া।
চারদলীয় শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর থেকেই আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলা হয়, যা ২০০১ সালের নির্বাচনের জন্য ঐক্যকে সুদৃঢ় করে।
২০০১ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ
__________________
আমি ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারি ও জুন মাসে অনুষ্ঠিত ( দুটি) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি পাবনা-১ ( সাঁথিয়া-বেড়া) আসন থেকে।
২০০১ সালের নির্বাচনে আমি বিএনপি থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলাম পাবনা -১, পাবনা -২ এবং পাবনা – ৫ আসন থেকে। কিন্তু পার্লামেন্ট বোর্ড থেকে যখন শোনানো হলো যে আমাকে সিরাজগঞ্জ -৬ ( চৌহালী- শাহজাদপুর) থেকে নির্বাচন করতে হবে তখন বোর্ডের সকল সদস্যের সামনেই বিএনপির চেয়ারপার্সনকে তার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম।
কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। আমিও পার্টির মনোনয়ন নিতে অস্বীকার করলাম । এভাবে তিনদিন কেটে গেল। হারিস চৌধুরী (পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব) এবং নজরুল ইসলাম খানের ( বর্তমানে ষ্ট্যান্ডিঙ কমিটির সদস্য) উপর্যুপুরি অনুরোধের মুখে আমি মনোনয়নের চিঠি গ্রহণ করি এবং এক অজানা গন্তব্যেস্থলের দিকে এগিয়ে যাই।
৫ দিনের নির্বাচন
______________
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০০১ অক্টোবর ১, ২০০১-এ অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে প্রচারের জন্য আমার হাতে সময় ছিল মাত্র ৫ দিন। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী নির্বাচনের ২ দিন আগে থেকে কোন প্রচারণা চালানো যাবে না।
নির্বাচনী প্রচারনা শুরু করি ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল বেলায়। সিরাজগঞ্জ -৬ (শাহজাদপুর -চৌহালী ) ছিল আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন এলাকা। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে বিকেল বেলায় যখন এনায়েতপুরের দিকে যাচ্ছিলাম পথের মধ্যে সন্ধ্যাবেলায় একটি জায়গায় অনেক লোকজন আমার গাড়ি রোধ করে বক্তব্য রাখার জন্য অনুরোধ করলেন।
আমি বিরাট এই পথসভায় বক্তব্য শেষ করার পর কেউ একজন আমার কানের কাছে এসে বললেন, চলুন এবার আপনার নিজ নির্বাচনী এলাকায় যাই। আমি জিজ্ঞেস করলাম তাহলে এটা কোন এলাকা? উত্তর এলো: এটি বেলকুচি নির্বাচনী এলাকা।
চললাম সিরাজগঞ্জ – ৬ নির্বাচনী এলাকার দিকে। তীব্র যানজটের কারণে গাড়ি এগুচ্ছিল না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ-কাম-রাস্তার দু’পাশে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি, দোকানপাট উত্তোলনের কারণে রাস্তায় যানজট সারাক্ষণ লেগেই থাকে।
নির্বাচনী অফিস
_____________
শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী পর্যন্ত অত্যন্ত ধীর গতিতে গাড়ি এগিয়ে যেতে থাকলো। রাস্তা এবং বাধের উপরে অসংখ্য ধানের শীষ প্রতীকের নির্বাচনী কার্যালয় দেখা গেল। পথে থেমে থেমে আমি হ্যান্ড মাইক ব্যবহার করে পথসভায় বক্তব্য রাখলাম।
শাহজাদপুরে পৌর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা
______________
এরমধ্যে চারদলীয় জোট প্রার্থী ( জাপা -নাজিউর ) ডাঃ মতিন আমাকে মোবাইল টেলিফোনে অনুরোধ করলেন পৌর এলাকায় তার একটি সভায় বক্তব্য দিতে। আমি দ্রুত সেখানে গিয়ে বক্তব্য রেখে ফিরে এলাম।
ফেরার পথে
__________
কৈজুরী থেকে সিরাজগঞ্জ শহরে ফিরে আসার সময় একই অবস্থার সুম্মখীন হলাম। পথসভা করতে থাকলে বিএনপির স্থানীয় নেতৃবৃন্দ আমাকে অনুরোধ করে বললেন তাদের সাথে ‘জরুরি আলোচনা’ করার জন্য। এদের কাউকে আমি আগে থেকে চিনি না, অতীতে আমরা সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি।
খরচের ভাউচার
______________
আমি গণসংযোগ শেষ করে রাত দেড়টার দিকে স্থানীয় বিএনপি নেতা সাইদুর রহমানের বাসভবনে জরুরি আলোচনার জন্য উপস্থিত হলাম। জরুরি বিষয় কি তা বুঝতে চাইলে তারা জানালেন, রাস্তার দু’পাশে অবস্থিত মোট ৬৭টি ধানের শীষের অফিস থেকে গত এক মাস হলো প্রচারনা চালানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন অফিস চালানোর খরচ তাদেরকে দিতে হবে।
আমি তাদের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লাম। বললাম, আমি তো আজ এসেছি। আপনারা তো জানতেন না যে কে প্রার্থী হবেন। কোন প্রার্থীর পক্ষে এতদিন আপনারা কাজ করেছেন?
সোজা সাপ্টা জবাব, ‘ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে আমরা প্রচার করেছি। যিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আসবেন, তাকেই এই খরচ দিতে হবে’।
আমি একথা শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। জানতে চাইলাম, কত টাকা দিতে হবে। তারা একটি ফর্দ বের করে দিয়ে বললেন, তাদেরকে ৬৭টি অফিসের জন্য ৬৭( চৌষট্টি) লক্ষ টাকা দিতে হবে। আমার কাছে তখন আছে সর্বমোট এক লক্ষ বাষাট্টি হাজার টাকা। তাদের চাহিদা মেটানো আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমি সোজা সাপ্টা বলে দিলাম, আমার পক্ষে কোনো অর্থ দেওয়া সম্ভব নয়।
শাহজাদপুর উপজেলার খুকনি ইউনিয়নের জয়েন চেয়ারম্যান বলে উঠলেন, তাহলে তো আপনি নির্বাচনে হারবেন। আওয়ামী লীগ জিতলে আমাদের পরিণতি কি হবে? আমি বললাম এটা বিএনপির চেয়ারপার্সকে গিয়ে বলেন। কারণ আমি এখানে মনোনয়ন চাইনি। সকলেই মোটামুটি ক্ষুব্ধ হয়ে চলে গেলেন।
নির্বাচনী প্রচারণা : বিএনপির বন্ধ অফিস খোলার জন্য পাঁয়তারা
_____________
পরেরদিন সকালে নৌপথে ২টি স্পীড নিয়ে চৌহালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গেলাম এবং জনগণের উদ্দেশ্যে অনেকগুলো পথসভায় ভাষণ দিলাম।
এরপরদিন সকাল বেলা পুনরায় বেতিল থেকে কৈজুরী যাওয়ার পথে রাস্তা ফাঁকা দেখলাম। বিএনপির ধানের শীষ অফিসগুলো বন্ধ, ব্যানার ফেস্টুন কিছু নেই। কিন্তু আমার গাড়ি দেখে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ছুটে এলেন । সকাল থেকে রাত ১ টা পর্যন্ত অসংখ্য পথসভায় বক্তৃতা করলাম। বিএনপির অফিসগুলো বন্ধের কথা ভুলে গেলাম। ফেরার পথে স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ সাইদুলের বাসায় আবার বসার জন্য অনুরোধ করলেন।
যাওয়ার পথে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা জয় তার কর্মীদের নিয়ে আমার গাড়ির সামনে শুয়ে পড়লেন। তাদের কথা শুনতে হবে। উদ্দেশ্য হলো আমার সময় নষ্ট করা। কি বলতে চাইছে আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।
সাইদুলের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে এবার তারা অফিস খুলে রেখে প্রচারনার জন্য আমার অনুমতি চাইলেন। বললেন টাকা দিতে হবে না। হিসেব নির্বাচনের পরে হবে। আমি বুঝতে পারলাম যে এসব লোকজন নির্বাচনের পর ৬৭ লক্ষসহ আরো বেশি টাকা দাবি করে বসে থাকবে। আমি সম্মতি না দিয়ে সিরাজগঞ্জ শহরে চলে এলাম।
পরদিন বিকেলে চৌহালী ডিগ্রি কলেজ মাঠে বিশাল জনসভায় বক্তৃতা দিয়ে রাতে জরুরি কাজে ঢাকায় এলাম। সকালে কাজ সেরে
আরিচা ঘাট হয়ে স্পিড বোটে এনায়েতপুরের দিকে যাচ্ছি তখন বাজে বেলা ৩টা। ।
পাবনা -১ ( সাঁথিয়া-বেড়া) এর চারদলীয় জোট প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর আমীর, মওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেব আমাকে ফোন করলেন। তিনি বললেন, ‘চাচা আমার সঙ্গে কারা যেন বেঈমানি করছে। নির্বাচনী সভায় ম্যাডামের আসার কথা ছিল কিন্তু তা স্থগিত করা হয়েছে। আপনি জনসভায় না এলে আমি নিশ্চিত ফেল করবো’ ।
আমার মাথায় বাজ পড়ল। আমার হাতে আছে মাত্র ২ দিন। আমি সেন্টারের খরচ পর্যন্ত দিতে পারিনি।
আমি না বলার সুযোগ পেলাম না, নিজামী সাহেবের অনুরোধ ফেলতে পারলাম না।
পুরানো এলাকায় ফিরে আসা
_____________________
চারদলীয় জোট প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য পাবনা -১ ( সাঁথিয়া-বেড়া) নির্বাচনী এলাকায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।
স্পিড বোট নিয়ে পেচাকোলার দিকে যেতে থাকলাম। আমার নিজ নির্বাচনী এলাকা পাবনা -১ ( সাঁথিয়া-বেড়া)-নির্বাচনী প্রচারণায় অন্য কারো জন্য ভোট চাইতে আসতে হবে আমি ভাবতে পারিনি।
পেঁচাকোলা ঘাটে পৌঁছে দেখলাম হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছেন। এখানে পথসভা করলাম। এরপর পৌঁছে গেলাম কাশিনাথপুর হাই স্কুল মাঠে।
লক্ষাধিক মানুষের সামনে নিজামী সাহেবকে জয়ী করার জন্য সকলকে অনুরোধ করে বক্তৃতা করলাম। এরপর গেলাম করমজার সিএন্ডবি বাস স্ট্যান্ডে। এখানেও লক্ষাধিক লোকের উপস্থিতিতে বক্তৃতা করলাম, নিজামী সাহেবকে ভোট দেয়ার জন্য আহ্বান জানালাম। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল।
মওলানা নিজামী তার বক্তৃতায় বলেছিলেন পরবর্তী মন্ত্রীসভায় আমারা দুজনেই মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেব।
এদিকে আমি সিরাজগঞ্জ – ৬ (চৌহালী-শাহজাদপুর) এলাকায় ভোট কেন্দ্রের খরচ দেয়ার সময় না পাওয়ায় স্থানীয় জনসাধারণ যার যার সেন্টারের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন।
স্বল্প সময়ের নির্বাচনী প্রচারণার সময় আমি যেখানেই আমার হ্যান্ডমাইক দিয়ে বক্তৃতা করেছি সেখানেই হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছেন। জয়ের জন্য আত্নবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলাম।
জনগণের মনোভাব
________________
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা বললেন, ‘আর কষ্ট করতে হবে না, আপনি ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন’। আমি জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন যে তারা প্রায় ৪৭ টি স্পটে সার্ভে করেছেন। সব জায়গায় আমাকে ভোটদানের কথা জনগণ বলেছেন।
তাকে তো আপনারা চিনেন না, ভোট দেয়ার কারণ জিজ্ঞেস করতেই ভোটাররা বলেছিলেন, ‘আমরা শুনেছি তিনি পাবনা জেলায় অনেক কাজ করেছেন, সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়ও তিনি কাজ করেছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করেছেন, তাই এধরনের অভিজ্ঞ ব্যক্তি আমাদের জন্য কাজ করবেন বলি আমারা মনে করি’।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তার কথা সঠিক হয়েছিল। আমি মাত্র তিন দিনের নির্বাচনী প্রচারণায় ৪৭ হাজারের বেশী ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হই। নিজামী সাহেবও পাবনা -২ আসন থেকে বিজয়ী হন।
নাম কেটে দেয়া হয়
________________
মন্ত্রীসভার শপথ অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত হলাম। শপথ অনুষ্ঠানের মাত্র ৫ মিনিট আগে মন্ত্রীসভার তালিকা থেকে আমার নাম কেটে দেয়া হয়েছে বলে একজন সাংবাদিক আমাকে জানালেন।এবিষয়ে পরে পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। মন্ত্রীসভায় আমার নাম কেটে দেয়ায় আমি বরং খুশী হয়েছিলাম কারণ আমর কাছে হিসেব এবং তথ্য ছিল যে এই মন্ত্রীসভার সদস্যদের পরিণতি হবে ভয়াবহ।
গণসংযোগ এবং উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি
_________
চৌহালী শাহজাদপুরের চরাঞ্চলের মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতে জানতে আমার কিছুটা সময় লেগে গেল।
সিরাজগঞ্জ সদর থেকে শাহজাদপুরের কৈজুরী বাঁধের উপরে এবং দুপাশে অবৈধ স্থাপনা ও বাড়িঘর নির্মাণ করে অনেকেই মদ, গাঁজা, জুয়া এবং অসামাজিক কার্যকলাপের অভয়ারণ্য তৈরি করেছে স্বাধীনতার পর থেকে।
আজুগড়ার সীমানা শেষে বেতিল কবরাস্থানের পাশে যাত্রা অনুষ্ঠান, নাচগান চলতো সারারাত। এর সঙ্গে থাকতো অন্যান্য অসামাজিক কার্যকলাপ। ভোরে যখন মসজিদ থেকে আজান দেয়া হতো তখন যাত্রা পালার শেষন্কের দৃশ্য চলতে থাকতো উচ্চতালে বাদ্য বাজিয়ে । একদিকে মসজিদের আজান অন্যদিকে সমানতালে যাত্রার শেষ দৃশ্য এবং সঙ্গে উচ্চস্বরে গানবাজনা চলতো। বাঁধা দেওয়ায় কেউ ছিলো না, প্রতিবাদ করার সাহস কেউ পেত না।
হিমালয় পর্বত সমান সমস্যা
__________________
এসব দেখেশুনে আমার মনে হলো হিমালয় পর্বত পেরিয়ে আমাকে ওপারে যেতে হবে নইলে হিমালয়ের পাদদেশেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে এলাকার জনগণের এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে।
এদিকে সাধারণ মানুষ আমার কথা বিভিন্ন জায়গা থেকে শুনেছেন যে আমি সব অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য চেষ্টা করি,। তাই তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে ভালো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
আমি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝালাম তারা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য আমার উপর ভরসা করে আছেন কারণ তারা জানেন আমি সাংবাদিক, আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তি, সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য এবং সেচ মন্ত্রী থাকাকালে তিস্তা ব্যারাজ, পাবনা সেচ প্রকল্প, সিরাজগঞ্জ বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প, ঢাকা শহর বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প, চাঁদপুর নদী শাসন, ভোলা নদী শাসন, বেড়া নদী শাসন, খুলনা পানি নিষ্কাশন প্রকল্প, ভেড়ামারা জিকে পুনর্বাসন প্রকল্প, দিনাজপুর সেচ প্রকল্প, রাজশাহীর বরেন্দ্র পকল্পসহ বড় বড় প্রকল্পগুলো স্বল্প সময়ে বাস্তবায়ন করেছি । জনগণ এগুলো শুনেছেন, জেনেছেন বলেই বিশ্বাস রেখে ৭২ ঘন্টার নির্বাচনী প্রচারণায় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ৪৭ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী করেছিলেন।
একথা তাঁরা শুনেছিলেন এবং বিশ্বাস করেছিলেন যে ছোট বেলা থেকেই জনগণকে আমি মূল্যায়ন করেছি, তাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করিনি কখনো, জনগণকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেইনি। আমার কনভিকশন হলো, একজন বাংলাদেশীকে আর্থিকভাবে এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং তার নিরাপত্তা বিধান করার অর্থই হলো জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করা।
কর্মকাণ্ড শুরু
___________
আমি আমার নতুন নির্বাচনী এলাকার ( সিরাজগঞ্জ -৬ : চৌহালী-শাহাজাদপুর) সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ শুরু করে দিলাম। শুরু হলো কড্ডা ও সাইদাবাদের মোড় থেকে কৈজুরী পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ-রাস্তার উপর এবং দুপাশ থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে রাস্তা খালি এবং প্রশস্ত করার কাজ। এর বিরুদ্ধে আমার নিজ দলের নেতারাও প্রকাশ্যে এবং গোপনে বিরোধিতা শুরু করলেন।
এতদিন যারা সরকারি জমির উপর স্থাপনা নির্মাণ করে অবৈধ ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছলেন, তাঁদের স্বার্থে সরাসরি আঘাত হানায় তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। অনেকেই আমার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেন এবং বলা শুরু করলেন যে স্বাধীনতার পর থেকে লোকজন বাঁধের উপর বাড়িঘর দোকানপাট নির্মাণ করে আছে, কেউ উচ্ছেদ করতে পারলো না, উনি পারবেন কিভাবে?
দুঃসাধ্য কাজ
___________
এটি ছিল একটি দুঃসাধ্য কাজ। শেষমেষ উচ্ছেদের জন্য সব পথ পেরিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেয়া এবং টেলিফোন করানোর ব্যবস্থা করা হলো।
শুরু হলো উচ্ছেদ অভিযান। বুলডোজার এবং কপালে লাল ফিতে বাধা হাজার হাজার উচ্ছেদকর্মীর আঘাতে আঘাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল কড্ডার মোড় থেকে কৈজুরী পর্যন্ত সকল অবৈধ স্থাপনা। অবৈধ দালানকোঠা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হলো, কোনো বাঁধা টিকলো না। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, যা এই এলাকার লোকজন কখনো কল্পনাও করেননি।
অসম্ভবকে সম্ভব করা
__________________
উচ্ছেদের পর কয়েকদিন আশেপাশের গ্রামবাসীগণ তাদের বাড়ি চিনতেই ভুল করতেন কারন পুরো এলাকার ভুগোল পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। বিশাল প্রশস্ত ফাঁকা রাস্তা দেখে সকলেই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন কিভাবে এক অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়েছে।
এর কিছুদিন পর স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা আমাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানালেন যে তাদের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করার সময় তারা আমাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তাদের কয়েকজন বিবাহযোগ্য মেয়ের দ্রুত বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তারা বুঝতে পারলেন, সরকারি বাঁধের উপরে তাদের বাড়িঘর থাকায় ঠিকানা বিহীন অবস্থায় পাত্ররা বিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এখন নিজেরা জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করায় নিজস্ব ঠিকানা হয়েছে এবং ইজ্জত বেড়ে গিয়েছে। এছাড়া যাতায়াত ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন হওয়ায় এলাকার কদর বেড়েছে, সম্পত্তির মূল্য বেড়েছে। যাহোক এসব শোনার পর আমি আশ্বস্ত হলাম এই ভেবে যে তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন
______________
অঞ্চলটি তাঁত শিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। সাংবাদিক হিসেবে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় আমি ‘পদ্মা যমুনা পাবনা ‘শিরোনামে প্রচ্ছদ কাহিনী লেখার জন্য ১৯৭৫ সালের জুন মাসে পাবনা সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েছি এবং সাধারণ গরীব দুঃখী মানুষের নিকট থেকে অনেক কথা শুনেছি। বিচিত্রায় কভার ষ্টোরি প্রকাশিত হয় জুলাই ১৮, ১৯৭৫-এ। প্রতিবেদনের একজায়গায় ‘সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প’ উপশিরোনামে লিখেছিলাম:
” কিংবদন্তী আছে, বৃটিশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মসলিন কাপড় প্রস্তুতকারীরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং একাংশ সাদিয়া চাঁদপুর গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়ে সাধারণ কাপড় বুনতে থাকে। সেইসব তাঁতীদের কাছ থেকে কাজ শিখে বহু তাঁতী বেলকুচি থানার সোহাগপুর আজুগড়া , তামাই রান্ধুনীবাড়ি, চৌহালী থানার এনায়েতপুর, বেতিল, দৌলতপুর, শাহজাদপুর থানার শাহজাদপুর, খুকনিতে কাজ করতে থাকে”।
একেই বলে ডেষ্টেনি। যে এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে সাংবাদিক হিসেবে ১৯৭৫ সালে পত্রিকায় লিখেছিলাম সেই এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার উপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে।
তাঁত শিল্পের বিকাশ
________________
তাঁত শিল্পের বিকাশ কিভাবে হতে পারে সে সম্পর্ক সাংবাদিক হিসেবে আমি জেনেছিলাম। বাস্তবে এসে দেখলাম তাঁত শিল্প বিকাশের জন্য কোনো অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, বাজার ব্যবস্থাপনা নেই। গরীব দুঃখী ক্ষুদ্র তাঁত কাপড় ব্যবসায়ীদের কাপড় বিক্রি করতে যেতে হয় অনেক দূরের হাটে। এই কারণে দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে আটকে পড়ে ক্ষুদ্র তাঁতীরা। বড় বড় মহাজন নিজেদের উঠোনকে বানিজ্য কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষুদ্র তাতীদর কাপড় কমমূল্যে ক্রয় করে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রির মাধ্যমে বহু টাকার মালিক বনে যান অল্প সময়ের মধ্যে।
তাঁত শিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও কর্মসংস্থানভিত্তিক একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এর বিকাশের জন্য সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল স্বাধীনতার পর থেকে।
এই শিল্প বিকাশের জন্য সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে থাকা উচিত ছিল কাঁচামাল ও সরঞ্জাম সরবরাহ, সাশ্রয়ী মূল্যে সুতা, রং ও অন্যান্য কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা, তাঁতযন্ত্র আধুনিকীকরণের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা ভর্তুকি প্রদান, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ, তাঁত শ্রমিকদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, আধুনিক নকশা, নতুন প্রযুক্তি এবং বাজারযোগ্য পণ্য তৈরিতে কারিগরি সহায়তা, বাজার সম্প্রসারণ করে দেশীয় বাজারে তাঁতপণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করা,
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারের জন্য রপ্তানি প্রণোদনা ও প্রদর্শনী আয়োজন, তাঁত কাপড়ে নকশা ও বৈচিত্র্য এনে আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন নকশা তৈরি, ঐতিহ্যবাহী জামদানি, বেনারসি, শাড়ির পাশাপাশি নতুন ধরনের পণ্য (কুশন কভার, পর্দা, ব্যাগ ইত্যাদি) উৎপাদন, আর্থিক সহায়তা ও নীতি সমর্থন, ক্ষুদ্র তাঁতিদের জন্য জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা, তাঁত শিল্পের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল বা তাঁত গ্রাম গড়ে তোলা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, হাত তাঁতের ব্যবহার বাড়ানো, গবেষণার মাধ্যমে উন্নত সুতা ও পরিবেশবান্ধব রং তৈরি, তাঁতিদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বীমা) নিশ্চিত করা, তাঁদের কাজকে শিল্পীসুলভ মর্যাদা দেওয়া এবং এভাবে তাঁত শিল্পকে ঐতিহ্য ধরে রেখে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিকশিত করলে, এটি শুধু অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করবে না, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার নিশ্চয়তা দেবে।
হস্তচালিত তাঁতে কোনো বিদ্যুৎ বা জ্বালানী প্রয়োজন হয়না বিধায় এই শিল্প পরিবেশ বান্ধব এবং বিদেশি ক্রেতাগণ হাতে তৈরি দ্রব্যাদির প্রতি প্রচুর আগ্রহ দেখায়।
বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব
_____________________
পন্য বিক্রি ব্যবস্থাপনার উপর উৎপাদন নির্ভর করে। এই অঞ্চলে তাঁত কাপড়ের হাট নেই বলে আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেনি। ক্ষুদ্র তাতীদর পাঁচটি কাপড় বিক্রি করার জন্য যেতে হয় ২০ কিলোমিটার দূরে শাহজাদপুর হাটে। সেখানে যেতে আসতে সময় চলে যায় তাঁতীদের ।
এই দুরবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে এনায়েতপুরে কাপড়ের হাট স্থাপন জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু
কাপড়ের হাটের জন্য কোন জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। সরকারের কাছে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতার পর থেকেই হাট স্থাপনের জন্য আবেদন নিবেদন করেছেন কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।
শেষ ভরসাস্থল আমি, স্থানীয় জনসাধারণ জানালেন।
রাস্তার পাশে একটি বড় গর্ত দেখিয়ে একজন নেতা বললেন এটি ভড়াট করে হাট লাগানো যায়। আমি আয়তন দেখে বুঝলাম এত অল্প জায়গায় হাট স্থাপন করে তাতীদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যাবে না।
এলাকা ঘুরে ঘুরে সিদ্ধান্ত নিলাম এনায়েতপুর থানা কমপ্লেক্স এর পূর্বে প্রায় ১৫০ ফুট গভীর খাদ ভড়াট করা ছাড়া উপায় নেই। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লোক পাঠালাম। সেখান থেকে জানা গেল, খাদের জমি তাদের নয় তাই তারা কিছু করতে পারবে না।
তথ্য নিয়ে জানা গেল, গভীর খাদটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের যা ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় পানির তীব্র স্রোতের ঘূর্ণিপাকে ১৫০ ফুট গভীর হয়ে যায়।

এনায়েতপুর কাপড়ের হাট স্থাপন ও উন্নয়ন
________
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই জমিতে হাট নির্মাণ করা ছাড়া কোন বিকল্প কোনো জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। জেলা প্রশাসক তার অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে দিলেন। আমি বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ মন্ত্রী থাকাকালে সিরাজগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আমাকে চিনতেন।
প্রতিনিধি পাঠালাম তার কাছে। তিনি সবকিছু জেনে বললেন যেহেতু আমি তার বিভাগের মন্ত্রী ছিলাম এবং আমার পরিকল্পনার কথা শুনে তিনি জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে জমি রিজিউম করার প্রস্তাব দিতে বললেন।
জেলা প্রশাসক জমি রিজিউম করার প্রস্তাব দিলে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে অনুমোদিত হয় এবং গেজেট প্রকাশিত হয়।
আমার কোম্পানীর নিজস্ব অর্থায়নে ৩১ একর ভূমিতে গভীর খাদ ভড়াট কাজ, বহুতল বানিজ্যিক দালান নির্মাণের জন্য ফাউন্ডেশন বেড তৈরি করে সমগ্র হাটব্যপী অসংখ্য দোকানপাট নির্মাণ করা হলো।
হাটের পুরাতন অংশ নিয়ে মোকদ্দমা দায়ের
______________
এদিকে ষড়যন্ত্রকারী দাদন ব্যবসায়ীরা হাট স্থাপনের বিপক্ষে উঠে পড়ে লেগে গেলেন। তরিকুল নামের এক ব্যক্তি এনায়েতপুর হাট-বাজারের পুরাতন কিছু অংশের জমির মালিকানা দাবি করে সিরাজগঞ্জ জেলার ১ম সহকারী জজ আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করে নিষেধাজ্ঞার আদেশ পেলেন।
হাটবাজারের অস্তিত্ব নেই বলে এনায়েতপুর বণিক সমিতির রেজিস্ট্রেশন স্থগিত হয়ে গেল। জেলা প্রশাসন আদালতের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলেন না। এভাবেই বাংলাদেশে সরকারি জমি প্রশাসনের অবহেলায় হাতছাড়া হয়ে যায়।
তরিকুলের মোকদ্দমায় আমার প্রতিনিধি পক্ষভুক্ত হলেন এবং আপীল আদালতে আমার নিয়োজিত সিনিয়র আইনজীবী দরখাস্ত দিয়ে নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রত্যাহার করালেন।
উন্নয়ন কাজে বিরোধিতা
____________________
হঠাৎ আব্দুল মজিদ মন্ডল নামের এক ব্যক্তি হঠাৎ দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন। তিনি বিএনপিতে যোগদানের জন্য ঘুরঘুর করতে থাকলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন যে এনায়েতপুর হাটের পেরিফেরি হবে না, এটা সম্ভব না। স্থানীয় পত্রিকায় এবিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। বুঝতে পারলাম এনায়েতপুর হাট স্থাপনের শত্রুদের মধ্যে তিনি অন্যতম ।
মন্ডল আরো ঘোষণা করলেন, পেরিফেরি যদি হয় তাহলে হাট স্থাপনের জন্য আমার বিনিয়োগকৃত অর্থ একসাথে দেবেন। অর্থাৎ হাটটি সরকারি অনুমোদন লাভ করবে না এবং পেরিফেরি হবে না। আমার নিজ দলের জেলা নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করেই তিনি এই ষড়যন্ত্র করেছিলেন।

ষড়যন্ত্র রোধ করা হলো
_______________
জেলা প্রশাসক সিরাজগঞ্জ পেরিফেরী প্রস্তাবের ৩ নং অনুচ্ছেদে লিখে দিলেন যে আমার অর্থায়নে এনায়েতপুরে বিশাল হাটের উন্নয়ন এবং বহুসংখ্যক দোকানপাট নির্মিত হয়েছে যার ফলে তাঁত শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
হাটের পেরিফেরি অনুমোদন
_________________
বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে জেলা প্রশাসকের পাঠানো পেরিফেরি প্রস্তাব অনুমোদন করে তার এক কপি আমাদের নিকট প্রেরণ করেন, অর্থাৎ ভূমি মন্ত্রণালয় আমাদের বিনিয়োগের বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবহিত আছেন।
হাটের পেরিফেরি হলো কিন্তু আব্দুল মজিদ মন্ডল তার ঘোষণাকৃত টাকা আমাকে দিলেন না। বোঝা গেল তিনি হাট পেরিফেরির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সংস্কৃতি অনুষ্ঠান
______________
২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে হাটের নির্মাণ কাজের শেষ পর্যায়ে হাট এলাকায় এক বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এনায়েতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বললেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে হুজুররা একটু কথা বলতে চান।
আমি বুঝে গেলাম হুজুরগণ কি বলতে পারেন । তাদের সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। কারন পাবনা -১ ( সাঁথিয়া-বেড়া) নির্বাচনী এলাকায় ১৯৮৬ সালের সংসদ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে আমি পরাজিত করেছিলাম এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি আমার চেয়ে অনেক কম ভোট পেয়েছিলেন।
হুজুরদের বক্তব্য হলো গানের অনুষ্ঠান নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই তবে নাচানাচি হলে তাদের বক্তব্য আছে। তাদের দেয়া পরিচয় থেকে জানলাম তারা সকলেই হজ্জ করে এসেছেন অর্থাৎ সকলেই হাজী।
আমি বললাম আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওরার আগে আজুগড়া সীমান্ত ঘেষে বেতিল কবরাস্থানের পাশে যখন যাত্রা অনুষ্ঠানে অশ্লীল নাচনাচি হতো এবং যাত্রা অনুষ্ঠানের শেষ পালায় যখন বাদ্যযন্ত্র উচ্চস্বরে বাজানোর কারনে মাইকে দেয়া আজানের ধ্বনি ম্লান হয়ে যেত তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? কোন উত্তর নেই।
আমি হুজুরদের প্রশ্ন করে জানতে চাইলাম তারা নিজেদের বাসায় টেলিভিশন দেখেন কিনা। উত্তর হ্যাঁ দিলেন। টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখানো হয় কিনা এবং বিজ্ঞাপনের মধ্যে মডেলগণ নাচানাচি করে কিনা। উত্তর হ্যাঁ এলো।
আমি বললাম, এনায়েতপুর হাট হলো বাংলাদেশের মধ্যে পেরিফেরিভুক্ত সর্ববৃহৎ হাট। এনায়েতপুর হাটে তাঁত কাপড়ের বানিজ্য স্বল্প সময়ের মধ্যে সর্বাধিক প্রচারের জন্য এই বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে যাতে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায়ী এবং লোকজন উপস্থিত হন। এই অনুষ্ঠানে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের মডেলের মতো কিছু নাচানাচি হলে দোষের কি?
উপস্থিত সকলেই যুক্তি বুঝতে পারলেন। অনুষ্ঠানের জন্য দশ ফুট উঁচু, ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৫০ ফুট প্রস্থ মঞ্চ তৈরি করা হয়। দূর থেকে বড় পর্দায় অনুষ্ঠান দেখা এবং শোনার জন্য সবচেয়ে আধুনিক মাইকের ব্যবস্থা করা হয়।
এতবড় অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেয়া হলো। শৃঙ্খলা রক্ষাকার জন্য আমরা ভলান্টিয়ার নিযুক্ত করলাম। অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতা চাইলাম। সকলে হাত তুলে সম্মতি জানালেন।
ঢাকা থেকে প্রায় সকল জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীদের আনা হলো অনুষ্ঠানে। প্রায় দশ লক্ষ লোক বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে এসে উপস্থিত হন। এনায়েতপুরে নতুন এক ইতিহাস তৈরির মাধ্যমে অত্যন্ত সফলতার সাথে অনুষ্ঠান শেষ হলো। মিডিয়ায় এনায়েতপুর হাটের কথা সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লো। এনায়েতপুর কাপড়ের হাটের সুনাম সমগ্র বাংলাদেশ এবং বিদেশে প্রবাসীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
________________
কড্ডার মোড় থেকে এবং সাইদাবাদ থেকে শাহজাদপুর পর্যন্ত বাঁধ-রাস্তা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে রাস্তা প্রশস্ত ও পাকাকরণ করে এবং শাহজাদপুর ব্রীজ নির্মাণের কাজ ত্বরান্বিত করে ব্রীজের এপ্রোচ রোড নির্মাণের ব্যবস্থা করার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে।
জালালপুর, কৈজুরী এবং খুকনী ইউনিয়নের ভেতরের গ্রামগুলোর রাস্তা নির্মাণ, প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন করে প্রধান সড়ক এবং শাহজাদপুরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। সোনাতনী, সাদিয়া চাঁদপুর ও স্থল ইউনিয়নের চরাঞ্চলেও ব্যাপক উন্নয়ন করা হয় ।
কৈজুরী নদী শাসন, জালালপুরে মডেল হাই স্কুল নির্মাণ, ঠুঠিয়া কলেজের উন্নয়ন, বেতিল হাই স্কুল উন্নয়নসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সকল প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের মাধ্যমে এলাকার শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিকতায় বিপ্লবী পরিবর্তন আনা হয়।
যমুনা নদী বিভক্ত করেছে নির্বাচনী এলাকা
______________
যমুনা নদী নির্বাচনী এলাকার চৌহালী উপজেলা সদরকে এনায়েতপুর থানা এবং শাহজাদপুর উপজেলার পূর্বাংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
দুটি অঞ্চলের মানুষের মন মানসিকতা এবং সংস্কৃতি ভিন্ন। চৌহালী উপজেলার পূর্বপাশে টাঙ্গাইলের নাগরপুর, দক্ষিণ-পূর্ব পাশে মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চাম কোনে পাবনা জেলার বেড়া উপজেলা, দক্ষিণ- পশ্চিমে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এবং পশ্চিমে উল্লাপাড়া উপজেলা অবস্থিত ।
এত বিস্তৃত এবং নদী বিধৌত যমুনার চরাঞ্চল নিয়ে দুর্গম এলাকার উন্নয়ন করা দুঃসাধ্য ব্যাপার।
চৌহালী সদরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা
__________________
২০০১ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর চৌহালী উপজেলা সদরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল কঠিন। টাঙ্গাইল শহর থেকে ভাঙ্গা রাস্তা দিয়ে টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার হয়ে ধলেশ্বরী নদীর এলাসিনে খেয়া নৌকায় পার হয়ে টাঙ্গাইল উপজেলাধীন নাগরপুর উপজেলা সদর পেড়িয়ে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলায় পৌঁছুলাম।
উপজেলা সদর থেকে ইউনিয়ন গুলোতে পায়ে হেঁটে এবং নৌকাযোগে যেতে হয়। পাকা রাস্তা বলতে কিছুই নেই।
জনগণের সঙ্গে কথাবার্তা বললাম , উন্নয়নের জন্য কি করা যায় তার সঠিক পরিকল্পনা কেউ তেমন দিতে পারলেন না। বুঝলাম, তারা হতাশাগ্রস্থ কারণ অতীতে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কোনো জনপ্রিতিনিধি কিছুই করতে পারেননি।
চৌহালীর সঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলা সদরের কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই সেকারণে উন্নয়নের জন্য জেলা থেকে কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তাও চৌহালী আসেন না। এখানে এলে কর্মকর্তাদের সারাদিন এবং রাত ব্যয় করতে হয়।
চৌহালী নিয়ে ভাবনা
_________________
আমাকে কি করতে হবে তা নিয়ে আমাকে একাই ভাবতে হবে কারণ জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে।
ঢাকায় ফিরে এসে চৌহালীর উন্নয়নের জন্য ভাবতে শুরু করলাম, অতীত অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকালাম।
সানবার্ন : রাস্তা নির্মাণ
_________________
২০০২ সালের চৈত্র মাসের একদিন চৌহালী উপজেলা সদরে গিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রখর রোদের মধ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। উদ্দেশ্য চৌহালী উপজেলা সদরের সঙ্গে এলাকার সর্বদক্ষিণে গ্রামগুলোর যোগাযোগ স্থাপনের জন্য পাকা রাস্তা নির্মাণ করা। ১৭ কিলোমিটার পথ হাঁটতে গিয়ে চৈত্র মাসের প্রখর রোদে আমার সানবার্ন ( রোদে চামড়া পুড়ে যাওয়া) হয়ে গেল।
এরপর পার্লামেন্টের অধিবেশন যোগ দিলে মোহাম্মদপুর-আদাবর নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য প্রখ্যাত আইনজীবী (যিনি আমার আইনজীবী ছিলেন) খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আমাকে দেখে চিনতে পারলেন না। এমন গভীর সানবার্ন নিয়েই রাস্তা নির্মাণের জন্য সকল কার্যক্রম গ্রহণ করি।
চৌহালীকে আধুনিক করতে গিয়ে অন্য জেলায় উন্নয়ন
_________________
সবচেয়ে কষ্টদায়ক ছিল সড়ক পথে চৌহালী পৌঁছানো। টাঙ্গাইল দিয়ে যেতে হলেও এলাসিন ঘাটে এসে খেয়া নৌকায় পার হতে হতো। এলাসিন ঘাট হলো টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলায় অবস্থিত ধলেশ্বরী নদীর একটি ঘাট, যা একসময় পাটের একটি প্রধান ব্যবসায়িক কেন্দ্র ছিল এবং স্টিমার চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ধলেশ্বরী নদী মৃত প্রায় হয়ে গেছে।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ মন্ত্রী থাকতে বাংলাদেশর সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে উদ্বোধন পর্যন্ত বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা আমার ছিল।
আমি সড়ক ও জনপথ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে মৃত নদীর অর্ধেকটা বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা করলাম এবং গাড়ি পারাপারের জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেরির ব্যবস্থা করলাম। গাড়ি পারাপারের সময় একদম কমে গেল।
এই এলাকা আমার নির্বাচনী এলাকার অন্তর্ভুক্ত নয়। তবুও আমি টাঙ্গাইল জেলার মানুষ যাতে এই যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যমুনা নদীতে পৌঁছুতে পারে তার দিকে দৃষ্টি দিলাম।
আমার নির্বাচনী এলাকার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের বহু এলাকা এভাবে উন্নয়ন করে দিয়েছি। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গিয়ে নাগরপুর উপজেলার উত্তরে অবস্থিত শাহজানী হাটের ব্যবসায়ীরা যাতে যমুনা নদী থেকে মালামাল সহজে আনতে পারে তার জন্য খগেনের ঘাটে রাস্তা নির্মাণ করে দেই ।
সলিমাবাদ ব্রীজ নির্মাণ
___________________
এমনিভাবে টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার দক্ষিণে অবস্থিত সলিমাবাদের ব্যবসায়ীরা যাতে যমুনা নদী থেকে মালামাল সহজে আনতে পারে তার জন্য নদীতে একটি ব্রীজ ও রাস্তা নির্মাণ করে দেই । এই রাস্তা দিয়ে চৌহালী উপজেলার মানুষ মানিকগঞ্জ জেলা, সাভার এবং ঢাকা শহরে সহজেই যেতে পারেন।
ঢাকা, মানিকগঞ্জ এবং টাঙ্গাইল জেলার সঙ্গে চৌহালী উপজেলার সংযোগ হয়ে যায় এবং একই সাথে
চৌহালী থেকে পাথরাইল পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করার বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করি।
চৌহালী উপজেলা সদর থেকে পাথরাইল পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ
_______________
যোগাযোগ করে জানা যায় যে রাস্তা নির্মাণ করার ঠিকাদার হলো ক্ষমতাসীন দলের সিরাজগঞ্জ জেলার নেতার ভাই যাকে নিয়ন্ত্রণ করে কাজ আদায় করা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলীদের সাধ্যের বাইরে।
এমতাবস্থায়, আমি স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর সাথে দেখা করি। তিনি বাস্তবতা বুঝলেন এবং প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে রাস্তার নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দিলেন। দ্রুত গতিতে আদেশের চিঠি চৌহালী উপজেলায় এসে পৌছুলো।
প্রকল্প কমিটিগুলোর ধারণা ছিল অতীতের মতো কাজ করে তারা পার পাবেন, কিন্তু নির্মাণ কাজের সময় আমার ঘন ঘন উপস্থিত থাকা তাদের সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়।
দ্রুত রাস্তার মাটির কাজ, রাস্তা ভিজিয়ে শেয়ার বাই লেয়ার কমপ্যাকশন করা শুরু হলো। আমার পুরানো নির্বাচনী এলাকাধীন বেড়া পৌরসভা ( আমি এটি ১৯৮৭ সালে স্থাপন করে দিয়েছিলাম) এবং টাঙ্গাইল জেলা সদর থেকে ৬ টি বুলডোজার আনার ব্যবস্থা করলাম।
লেয়ার বাই লেয়ার কমপ্যাকশন
_____________________
পানি ছিটিয়ে শ্রমিক দিয়ে লেয়ার বাই লেয়ার কমপ্যাকশনের পর বুলডোজার দিয়ে কমপ্যাকশনের পর রাস্তা পাথরের মত শক্ত হয়ে গেল। রইলো বাকি মিটুয়ানি ব্রীজ।
আমি নিজে যমুনা নদীর স্রোতের তীব্রতা মাথায় রেখে ব্রীজের নকশা করা হলো এবং ৭০ ফুট মাটির নীচ থেকে ব্রীজের ফাউন্ডেশন দেয়া হলো। বর্ষার আগেই রাস্তা নির্মাণ, পাকাকরণ এবং ব্রীজ নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে গেল। রাস্তাটি এমন চওড়া করা হয়েছিল যাতে দুটি বড় গাড়ি অনায়াসে যেতে পারে।
এলাসিন ব্রীজ নির্মাণ
_________________
টাঙ্গাইল জেলার এলাসিন ঘাটে নদীর উপর দিয়ে রাস্তা করার কারণে ব্রীজ নির্মাণের দৈর্ঘ্য কমে এলো। আমি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে ব্রীজ নির্মাণের স্থান পরিবর্তন করে দেই । ব্রীজটি দ্রুত নির্মিত হলো, সরকারের খরচ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেল।
চৌহালী, নাগরপুর এবং টাঙ্গাইলবাসীর স্বপ্ন পুরন হলো। যমুনা নদী থেকে আশেপাশের মানুষ এই রাস্তা দিয়ে দিনরাত ২৪ ঘন্টা সড়কপথে যাতায়াতের সুযোগ পেলেন।
চৌহালী উপজেলার ভেতরে অনেক সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে দেয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার অদ্ভুত পূর্ব উন্নয়ন হলো।
মেয়েদের শিক্ষার প্রসারের জন্য চৌহালী সদরে স্থাপিত মহিলা কলেজ এমপিওভুক্ত, চৌহালী ডিগ্রি কলেজর অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন, মনজুর কাদের কারিগরি কলেজ এবং সুম্ভুদিয়া মনজুর কাদের কলেজ প্রতিষ্ঠা ও সকল স্কুলের অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়। ছাত্রদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ ফিরিয়ে আনার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়। চৌহালীতে পরীক্ষার সময় নকল বন্ধ করায় শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায়।
মসজিদ, মাদ্রাস, কবরস্থান এবং সকল প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করে মানুষের মনের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা হলো।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন উন্নয়ন করা হয় যে গৃহস্থের বাড়ি থেকে গরু ছাগল মুরগি চুরি বন্ধ হয়ে যায়। পল্লী বিদ্যুৎ এর লাইন ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
চৌহালী উপজেলাকে চৌহালী নাগরপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের আওতায় এনে নদী ভাঙ্গন রোধের কাজ শুরু করা হয়।
চৌহালীতে অনেকগুলো পুকুর খনন করে প্রচুর মাছ চাষ করে বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়।
ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ করে গরীব দুঃখী মানুষের কল্যাণের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হয়।
নিজ দলের নেতা কর্মীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কারণে মানুষের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে। চরাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।
উন্নয়ন অব্যাহত থাকাকালে পরবর্তী নির্বাচনের সময় চলে আসে
__________________
এভাবেই ২০০৬ সালের অক্টোবর মাস চলে আসে। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার তখন বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর ঢাকার পল্টন-বায়তুল মোকাররম এলাকায় জামায়াতে ইসলামী এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। আটাশে অক্টোবর ছিল বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন। এই দিন আওয়ামী লীগে সদ্য যোগদানকারী মজিদ মন্ডলের নেতৃত্বে একটি মিছিল এনায়েতপুর হাটে এবং হাট কার্যালয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে।
২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে আমি সিরাজগঞ্জ – ৬ (চৌহালী- শাহজাদপুর) নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাই এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হই। কিন্তু ১/১১ এর সরকার সেই নির্বাচন বাতিল করে দেয়।
নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ
__________
সিরাজগঞ্জ – ৬ আসন বিলুপ্ত করে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে বেলকুচি -চৌহালী নির্বাচনী এলাকা ঘোষণা করা হয়।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০৮ ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। এনির্বাচনে আমার নিজ দলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে ।
আমার নির্বাচনী এলাকায় বিকল্প প্রার্থী রেখে দিয়ে চক্রান্তকারীরা আমাকে হারানোর বন্দোবস্ত করে। যেমনটি করা হয়েছিল ২০০১ সালের নির্বাচনে, হঠাৎ করে সম্পূর্ণ নতুন নির্বাচনী এলাকায় আমাকে মনোনয়ন দিয়ে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আমাকে পরাজিত করার ষড়যন্ত্র
________________
ঘটনাচক্রে ২০০৮ সালের নির্বাচনেও প্রচারণার জন্য আমি মাত্র ৫ দিন সময় পাই এবং কেন্দ্র খরচের ক্ষেত্রে একই অবস্থা হয়।
আমার নিশ্চিত বিজয়ের মুখে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন আচরণবিধি উপেক্ষা করে বেলকুচি উপজেলা সদরের কলেজ মাঠে আব্দুল মজিদ মন্ডল ঘোষণা করেন যে যত টাকা লাগে বিএনপির প্রার্থীকে হারাতে হবে। শেখ হাসিনার সঙ্গে তিনি নাকি অঙ্গীকার করে এসেছেন। মন্ডলের উদ্দেশ্য ছিল আমাকে পরাজিত করা এবং এনায়েতপুর হাট ধ্বংস করা।
এত ষড়যন্ত্রের মুখে সম্পূর্ণ নতুন উপজেলা বেলকুচিতে নির্বাচনের দিন ভোটারদের মনোভাব দেখে বুঝতে পারি আমি প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবো।
২০০৮ সালের নির্বাচনের দিন: ব্যাপক ষড়যন্ত্র
_____________
নির্বাচনের দিন ( নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০৮, ২৯ ডিসেম্বর) দুপুর একটার দিকে মোবাইল ফোনে আমার এক পরিচিত সহকারী জজ মোবাইল টেলিফোনে জানালেন, আপনি জিতে যাচ্ছেন কিন্তু আপনাকে হারিয়ে দেয়া হবে। আমি বললাম এটা সম্ভব নয়।
৬০ থেকে ৭০ হাজার ভোট নষ্ট করে কাউকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। ভোট শেষে আমি বেলকুচি উপজেলার সদরে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে উপস্থিত হলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন বেলকুচির বিএনপির সভাপতি জামাল ভুঁইয়া। আর কোনো নেতাকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে পাওয়া যায়নি।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অনুপস্থিত। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে তিনি পরাজিত হয়েছেন। ভোট গণনা শুরু হলে আমার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসতে থাকলো। বিপুল ভোটে যখন আমি বিজয়ী হতে চলেছি তখন কারচুপির জন্য ধীর গতিতে ভোটের বাক্স আসা শুরু হলো। অনেক কেন্দ্রে ম্যানুপুলেশন করে আমার ভোট কমিয়ে দেয়া হচ্ছিল।
বেলকুচিতে আমাকে বিজয়ী ঘোষণা
______________
একপর্যায়ে রাত দেড়টার দিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এসে উপস্থিত হন। তিনি নিজেকে বিজয়ী ঘোষনার জন্য বলেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, আপনি ৩৭০০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন । এর উত্তরে আওয়ামীলীগ প্রার্থী বলেন যে তিনি চৌহালীতে বিজয়ী হয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন সেটি চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিষয়, আপনি এখানে পরাজিত হয়েছেন।
আমি নীচে নেমে গাড়িতে উঠতে দেখি আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা উপজেলা সদর ঘিরে রেখেছে। সমগ্র বাংলাদেশে যে বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে তা আমার জানা ছিলো না।
পরের দিন জানতে পারলাম যে বেলকুচিতে একটি ভোটকেন্দ্রে ৫০০ ‘নো’-ভোট দেখিয়ে এবং চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলের কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে আমার অনেক ভোট বাতিল দেখিয়ে আমার প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগকে মাত্র ২৫২ ( দুইশত বায়ান্ন)ভোটে বিজয়ী দেখানো হয়েছে।
নির্বাচনী ফলাফল পরিবর্তনে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
___________________
নির্বাচনে এধরনের ব্যাপক কারচুপির কারণে বেলকুচি -চৌহালী নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ পায় যার প্রতিফলন ঘটে উপজেলা নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে। আমার সমর্থিত প্রার্থীদের উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে জনগণ বিজয়ী করেন।
নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা: আমাকে বিজয়ী ঘোষণা
____________________
হাইকোর্ট বিভাগে স্থাপিত নির্বানী ট্রাইব্যুনালে আমি ১ নং মামলা দায়ের করলে শুনানি শেষে আমার পক্ষে রায় ঘোষণার পূর্ব মুহূর্তে আমার প্রতিপক্ষের আইনজীবী হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান।
আমি চিন্তা করলাম আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমি তার সদস্যপদের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়ী হলে তার মন্ত্রিত্ব গেলে বেলকুচি উপজেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে এইভাবে যে বেলকুচি উপজেলার মানুষ কোনো নেতাকে মন্ত্রিসভায় পাননি। অপরদিকে আমি বহু আগে মন্ত্রী হয়েছি এবং বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। সাধারণ মানুষ আইনের অত প্যাঁচ না বুঝে মনে করতে পারেন যে ক্ষমতার প্রতি আমার বেশী আকাঙ্ক্ষার কারণে তারা উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এছাড়া, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমি আপিল বিভাগে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য পদ ফিরিয়ে নেয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। বিরোধী দলগুলো তখন লাগাতার সংসদ বর্জন করেছিল।
এনায়েতপুর কাপড়ের হাট ধ্বংস করার প্রচেষ্টা
__________
২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট পর্যন্ত আমার স্থাপিত এনায়েতপুর হাট ধ্বংস করার জন্য আওয়ামী লীগ তথা মজিদ মন্ডল চক্র অনবরত চেষ্টা করে গেছে, অপরদিকে জনস্বার্থে হাট টিকিয়ে রাখার জন্য আমাকে হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগে বারবার শরনাপন্ন হতে হয়েছে।
হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে আওয়ামী লীগের নেতা ও সংসদ সদস্য আব্দুল মজিদ মন্ডল হাটের ব্যবসায়ীদের হাটের দোকান থেকে হটিয়ে আওয়ামী লীগের বিশাল কার্যালয় স্থাপন করে এবং ভূমি দস্যুদের দিয়ে হাটের অর্ধেকেরও বেশী জায়গা দখল করে নিয়ে হাট ধ্বংস করার চেষ্টা করেন।
হাট ভিত্তিক উন্নয়ন
________________
হাট নির্মাণ করার পূর্বে হাট সংলগ্ন মৌজার এক শতাংশ জমির মূল্য ছিল পাঁচশ টাকা যার বর্তমান মূল্য হয়েছে দশ থেকে পনের লক্ষ টাকা । ভূমি দস্যুগণ অর্থের লোভ সামলাতে না পেরে হাটস্থ সরকারি সম্পত্তি জাল দলিল সৃজনের মাধ্যমে বিক্রি করে দখল প্রদান করেছে। এটি হলো সেই প্রবাদের মতো, ‘খায় দায় করিম আলী মোটা হয় জব্বর’। আমার নিজ অর্থ বিনিয়োগ করে অসাধ্য সাধন করলাম, আর ভূমি দস্যুগণ রূপান্তরিত হতে থাকলো কোটিপতিতে।
আমার নির্মিত হাট থেকে সরকার রাজস্ব আদায় করেছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আর আমার বিনিয়োগেরকৃত অর্থ হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ফেরত না দিয়ে আমাকে কপর্দকহীন বানানোর অটচেষ্টা কর হয়েছে। ভালো কাজের মূল্যায়ন এভাবেই ফ্যাসিস্ট সরকার করেছে।
গরীব তাঁতিদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য গত ২০ বছরে হাট স্থাপন, রক্ষা এবং চালু রাখার জন্য আমাকে কেমন আত্মত্যাগ করতে হয়েছে তা সাধারণ মানুষ অবগত আছেন এবং একারণে এই হাট রক্ষার জন্য তারা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সবসময়।
২০১০ সালে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ২ জন বিচারপতি আমার পক্ষে হাট বিষয়ে দায়ের করা রীট পিটিশন শুনানিকালে বিচার কক্ষে প্রকাশ্যে বলেন, বাংলাদেশে এই ধরনের এমপি থাকা দরকার যারা নিজেকে উজাড় করে দিয়ে দেশের স্বার্থে কাজ করেন।
চক্রান্ত
______
সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে আহ্বায়ক এবং আমাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ২০১০ সালে বিএনপির সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটি গঠন করা হয়। হঠাৎ জেলা আহ্বায়ক আমাকে টেলিফোন করে বললেন সিরাজগঞ্জে তার সঙ্গে যেতে। আমি জলা পর্যায়ের রাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করব না বলে তাকে সাফ জানিয়ে দিলাম। কিন্তু তার উপর্যুপুরি অনুরোধের প্রেক্ষিতে আমি তার সঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলা সদরে গেলাম। সদর উপজেলা হলো আহ্বায়কের নিজ নির্বাচনী এলাকা যেখানে তার বিরুদ্ধে প্রায় সব স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বিদ্রোহ করেছেন। আমি ততক্ষণে বুঝতে পারলাম আমাকে সঙ্গে নিয়ে আসার আসল উদ্দেশ্য কি।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সিরাজগঞ্জ জেলার বিএনপির কমিটি গঠন
_______________
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সকল চক্রান্ত উপেক্ষা করে সকল উপজেলায় আমরা আহ্বায়ক কমিটি গঠন করলাম। জেলা কমিটি গঠনের জন্য এ্যরিষ্টোক্রেট হোটেল এমন গন্ডগোল শুরু হলো যে একটার পর একটা জুতা নিক্ষিপ্ত হতে থাকলো আহ্বায়কের দিকে। অনেক নেতা কর্মী আবার দেশীয় অস্ত্রসহ যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল।
আমার একান্ত প্রচেষ্টায় গন্ডগোল হট্টগোল থামিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে সভাপতি এবং মোকাদ্দেস আলীকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে জেলা কমিটি ঘোষণা করলাম।
পরবর্তীতে কমিটির বিরুদ্ধে মামলা হলে তা মোকাবেলা করার জন্য আমি নিজে মামলার জবাব লিখে দিয়ে শুনানিতে উপস্থিত থেকে মামলাটিকে অকার্যকর করার ব্যবস্থা করলাম।
এরপর ২০১২ সালের দিকে আমি যাতে দলের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে না পারি তার জন্য দলের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্র শুরু হলো। আমার অনেকগুলো নির্বাচনী এলাকা আছে বিধায় সিরাজগঞ্জ জেলায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আর নিজেকে জড়িয়ে রাখা সমিচীন মনে করলাম না।
২০১৮ সালের নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-৫ ( বেলকুচি -চৌহালী) নির্বাচনী এলাকায় মনোনয়ন চাইলে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি।
আমার আগের নির্বাচনী এলাকা পাবনা -১ ( সাঁথিয়া-বেড়া) নির্বাচনী এলাকায় আমার প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের নেতা ও আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী (পরবর্তীতে গণফোরাম) অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে ধানের শীষ প্রতীক দিয়ে রাজনীতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনার সূত্রপাত করা হয়।
এই প্রার্থী ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত তথ্য প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এমনসব নোংরা কথা বলেছেন যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না তবে তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে কারণ তিনি ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। আমার সমস্ত ব্যবসা বাণিজ্য ধংস করার জন্য সব ধরনের চেষ্টাই তিনি করেছিলেন। তিনি হয়ে গেলেন ধানের শীষের কান্ডারি।
আরও পড়ুন : প্রয়োজন আরেকজন জিয়াউর রহমান: মেজর (অব.) মনজুর কাদের
২০২৬ এর নির্বাচন
________________
আমার সবগুলো নির্বাচনী এলাকার মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এবং জানতে চাইছেন যে আমি কোন নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করব। এনিয়ে অপেক্ষা করতে করতে নির্বাচন একদম সন্নিকটে চলে এসেছে।
সবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব সিরাজগঞ্জ – ৫ ( বেলকুচি -চৌহালী) নির্বাচনী এলাকা থেকে কারণ এই এলাকার মানুষ ২০০৮ সালে চরম এক রাজনৈতিক দুঃসময়ে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং আমাকে নির্বাচনে বিজয়ী করেছিলেন। প্রচুর ভোট বাতিল এবং ৫০১ নোভোট দেখিয়ে মাত্র ২৫২ ভোটে আধিপত্যবাদী ভারতের মদদপুষ্ট শক্তি নির্বাচনে আমাকে পরাজিত দেখালেও জনগণের কাছে আমি ছিলাম কার্যত (de facto) সংসদ সদস্য আর আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন আইনত (de jure).
আমাদের ( সিরাজগঞ্জ -৫) এই নির্বাচনী এলাকার সকল মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তিকে পরাভূত করতে, আমিও আছি তাদের সাথে। একসঙ্গে আমরা বেলকুচি উপজেলার তাঁত কাপড় ব্যবসায়ী এবং সকল স্তরের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য এবং চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলের নদী ভাঙ্গন কবলিত ও বানভাসী মানুষদের স্থায়ী ঠিকানা দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দুয়ার খুলে দেব বলে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি।
এই এলাকায় উন্নয়নের রাজনীতি এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে শ্রমিক কৃষক ছাত্র জনতা বুঝতে পারেন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এইতো সময়, এগিয়ে যাওয়ার এইতো সময়।

রিপোর্টার: 




















One thought on “ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এইতো সময় এগিয়ে যাওয়ার এইতো সময়”