প্রধান প্রতিবেদক:
গত জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে আবারও ফুঁসে উঠেছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। মহাসড়ক ব্লকেড করে মানববন্ধন, মহাসড়কে পাঠদান কার্যক্রম এমনকি উত্তরবঙ্গের সকল রুট অবরোধ করে তাদের বিক্ষোভ সমাবেশের মতো কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। তাদের ক্রমাগত আন্দোলনে মূলত অচল হয়ে পড়েছে শাহজাদপুর। সেই সঙ্গে দূর্ভোগের অন্ত নেই উত্তরাঞ্চলবাসীর।
সোমবার (১১ আগষ্ট) ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক অবরোধ করে রাস্তার উপরই নবীন বরণ অনুষ্ঠান ও ওরিয়েন্টশন ক্লাস করে শিক্ষার্থীরা। আগেরদিন রোববার (১০ আগষ্ট) সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টাব্যাপী হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় ঢাকা-রাজশাহী, পাবনা ও রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। তারা ক্যাম্পাস নির্মাণ ও পরিবেশ উপদেষ্টা রেজওয়ানা হাসানের পদত্যাগ দাবীতে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাক। হাটিকুমরুল গোলচত্বরে ঢাকার সাথে উত্তরবঙ্গের সকল সড়ক যোগাযোগ বন্ধ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের কারণে নানা বিড়ম্বনায় উত্তরাঞ্চলের পরিবহন সেক্টর, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। প্রতিদিনই দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা করে মহাসড়ক অবরোধ করায় ঢাকা-পাবনা রুটে প্রতিদিনই যানজট লেগে থাকছে। শাহজাদপুরে বাঘাবাড়ি বন্দরের তেল, সারসহ বিভিন্ন পণ্য যথাসময়ে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতদস্বত্বেও স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা শিক্ষার্থীদের দাবীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
স্থানীয় বাস মালিক সমিতির নেতা আইয়ুব আলী বলেন, মহাসড়ক অবরোধে পরিবহণ মালিক-শ্রমিকদের ভোগান্তির অন্ত নেই। তবুও কিন্তু কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়, আমরা এটুকু কষ্ট মেনে নিচ্ছি। আমরা শিক্ষার্থীদের দাবীর সাথে একমত।
শাহজাদপুর বণিক সমিতির সভাপতি নওশাদ আলী ও বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোক্তার হোসেন শিক্ষার্থীদের দাবীর সাথে একমত প্রকাশ করে বলেছেন, ছাত্রদের আন্দোলন নিয়ে আমরা চরম দূর্ভোগে রয়েছি। তারপরও আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি হোক।
কেন শ্রেণীকক্ষ ছেড়ে রাজপথে রবীবা শিক্ষার্থীরা:
২০১৬ সালে কবিগুরুর স্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুরে তাঁর ১৫৫তম জন্মদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠার সময় বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিকমানের করার ঘোষণা দেওয়া হলেও ৯ বছরে নির্মিত হয়নি ক্যাম্পাস। আর এ কারণেই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা। একটি ভবনও বরাদ্দ হয়নি। বিগত সরকারের সাড়ে সাত বছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গন্ডিও পার হয়নি প্রকল্পটি। বিশ্বকবির নামাঙ্কিত প্রকল্পটি ৮ বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছে আর ফিরেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের কর্মকর্তাদের।
তাই বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের ডিপিপি অনুমোদনের দাবীতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা কর্মচারিরা। ইতিমধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য মহাসড়ক ব্লকেডের মতো কঠোর আন্দোলন শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা। সরকার থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেলে উত্তরবঙ্গের রেলপথ ব্লকেড, আমরন অনশনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১৬ সালে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হলেও ২০১৮ সালে ভাড়া করা ভবনে এর শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১২শ শিক্ষার্থী, ৩৪ জন শিক্ষক, ৫৪ জন কর্মকর্তা ও ১০৭ জন কর্মচারি কর্মরত রয়েছেন। চারটি অনুষদের অধীন বাংলা, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ম্যানেজমেন্ট এবং সংগীত এই পাঁচটি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের পাঠদান চলছে। বিগত ৭ বছর ধরে শাহজাদপুরের বিভিন্ন প্রান্তে ৮টি ভাড়া ভবনে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে।

যা বলছেন শিক্ষার্থীরা:
জাকারিয়া জিহাদ, রায়হান, হৃদয় সরকারসহ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, ভাড়া করা কতটা কষ্ট করে ক্লাস করতে হয় সেটা বলে বোঝাতে পারবো না। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের কারণে অনেক কষ্ট করতে হয়। আমরা স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করতে পারছি না। একটি ক্লাস যখন চলে অন্য ক্লাসের শিক্ষার্থীদের বাইর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এভাবে চলতে পারে না। সব শর্ত পূরণ করা হলেও ক্যাম্পাস প্রকল্পটি একনেক বৈঠকের এজেন্ডায় স্থান না পাওয়া দূরভিসন্ধিমূলক।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, কয়েক বছর ধরেই ক্যাম্পাসের দাবীতে আন্দোলন করছি। গত ১৯ জানুয়ারি থেকে টানা ১১ দিন আন্দোলনের পর কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে স্থগিত করি। এরপর ৭ মে একনেক সভায় প্রকল্পের ডিপিপি’র নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হলেও পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান পরিদর্শন করতে চান। ১৬ জুন তিনি পরিদর্শনে এসে বলেছিলেন, এটা অনুমোদন হয়েই গেছে শুধু আমি এসেছি দেখার জন্য। এরপর তিনি চলে গিয়ে কি প্রতিবেদন দিলেন, প্রকল্প আর একনেক সভায় ওঠেনি। ২৪ জুন ও ২৭ জুলাই দুটি একনেক সভা যাওয়ার পর আমরা ২৬ জুলাই থেকে আবারও আন্দোলন শুরু করেছি। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আর পেছনে ফেরার অবকাশ নেই। ক্যাম্পাস বাস্তবায়ন না করে রাজপথ ছাড়বো না।
আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে কর্মসূচিতে অংশ নিলেন কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতা:
শিক্ষার্থীদের সংহতি প্রকাশ করে রোববার হাটিকুমরুল এলাকায় ঢাকা-উত্তরবঙ্গ সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেন জামায়াত ইসলামের কেন্দ্রীয় সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মওলানা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদি সরকার ক্যাম্পাসটা নির্মাণ করে নাই। এখন চলনবিলের সাথে সম্পৃক্ততার কথা বলে বাঁধা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু শাহজাদপুর উপজেলার সাথে চলনবিলের সম্পৃক্ততা নেই। আমরা সরকারকে জানাতে চাই পরিবেশের কথা বলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ থেকে বিরত থাকার কোন সুযোগ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য:
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।ভাড়া নেওয়া অস্থায়ী ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় মহাসড়কে নবীন বরণ কর্মসূচি করতে বাধ্য হয়েছে শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনিক কার্যালয়ের একেকটি ভবন এক এক প্রান্তে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন ভাড়া নিয়ে চলছে ক্লাস। এতে আমাদেরসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার অনুকল পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অংশীজন ডিপিপি দ্রুত অনুমোদনের জন্য সরকারের সুনজর কামনা করছি।
ক্ষুব্ধ উপাচার্য্য ড. এস. এম হাসান তালুকদার :
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য ড. এস. এম হাসান তালুকদার বলেন, প্রকল্পটি কি কারণে একনেক সভার এজেন্ডাভুক্ত হলো না, সেটা আমাদের অফিসিয়ালি জাননো হয়নি। শুনেছি পরিবেশ সংক্রান্ত আপত্তি রয়েছে। চলনবিলের পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রমাণ করে দিয়েছি, চলনবিলের ৯টি উপজেলার মধ্যে শাহজাদপুর নেই। আর চলনবিলের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রকল্প এলাকার দূরুত্ব ৬৮ কিলোমিটার। তাছাড়া প্রকল্পের প্রস্তাবিত জমি বিল শ্রেণীভুক্ত নয়। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১৯ সালেই ছাড়পত্র দিয়েছে। সেখানে তারা ৩৩ একর জায়গা বনায়নের শর্ত দেয়। ডিপিপিতে আমরা সেটা রেখেছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড দুইটা লেক ও তিনটা পুকুর রাখার শর্ত দিলে সেটা আমরা ডিপিপিতে রেখেছি। তারাও ছাড়পত্র দিয়েছে। ছাড়পত্র দিয়েছে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর আর ভূমি মন্ত্রণালয় বলেছে, এটা অকৃষি, খাস এবং পতিত জমি। এখানে ভিটেবাড়ি উচ্ছেদ করা বা জলাশয় ভরাটের প্রশ্ন আসবে না।
উপাচার্য্য আরও বলেন, তিনটা দপ্তরের শর্ত পূরণ করতে আমরা ৩৩ একর জায়গা বনায়নের জন্য, ১৬ একর লেকের জন্য, সাড়ে ৬ একর পুকুর ও ২ একর পার্কের জন্য রেখেছি। ৪১ একর জায়গা রাখা হয়েছে খেলার মাঠ, রাস্তা ও অবকাঠামোর জন্য। এর চেয়ে পরিবেশ বান্ধব প্রজেক্ট আর কি হতে পারে প্রশ্ন রাখেন তিনি। পরিবেশের কথা যেটা বলা হচ্ছে সেটা উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য আমরা হবো বাংলাদেশের জন্য ভ্যানগার্ড।
উপাচার্য্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটা ক্লাসের শেষ না হতেই আরেকটা ক্লাস করার জন্য শিক্ষার্থীদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। একটা ছোট রুমের ভেতরে ৭/৮জন শিক্ষক থাকে। এভাবে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। আমি বারবার বলেছি, হয় বরাদ্দ দিন নয়তো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিন। সন্তান জন্ম দিতে পারবেন ভরণপোষন দেবেন না এটা হয় না। একটা বিশ্ববিদ্যালয় ৮ বছর এভাবে থাকতে পারে। এর চেয়ে অমানবিক অমর্যাদকর কি হতে পারে। প্রজেক্টটা কোন বিতর্কিত ব্যক্তির নামে নয়। একজন জাতীয় সঙ্গীত রচিয়তা, একজন নোবেল লরিয়েটের নামে। সেই প্রকল্পের ডিপিপি ৮ বছর ধরে ঘুরছে। এমন কোন ডিপিপি দেখান যেটা ৮ বছর ধরে পড়ে আছে?
তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় চরমভাব অবহেলিত ছিল রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। সাড়ে ৭ বছরে ডিপিপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গন্ডি পার হতে পারে নেই। আমি আসার পর তিনটা স্টেজ পার করেছি। এখন ফাইনাল স্টেজে আছি। চারটা স্তর পার হতে ৮ বার সংশোধন করা হয়েছে। আর কি থাকতে পারে। প্রজেক্ট ছিল ৯ হাজার ২শ কোটি টাকা। সেখান থেকে ৯৪ শতাংশ কমিয়ে মাত্র ৬ শতাংশ করে ৫১৯ কোটি টাকায় নিয়ে এসেছি।
ডিপিপি অনুমোদনের আশ্বাস পরিকল্পনা কমিশনের:
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সচিব ড. কাইয়ুম আরা বেগম বলেছেন, ইনশাল্লাহ আগামী একনেক সভায় প্রকল্পটি পাশ হবে।

রিপোর্টার: 



















