সিরাজগঞ্জ , শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কৌশলে হাটের ইজারা বাতিল করে খাস আদায়ের নামে হরিলুট

প্রতি বছরই সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সোহাগপুর হাটটি ইজারা নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন ইজারাদাররা। অথচ চলতি বছর হাটটির দরপত্র ডাকে অংশ নেননি কোন ইজারাদার। অভিযোগ উঠেছে, পৌর কর্তৃপক্ষ বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হাজী আলতাফের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে কৌশলে ইজারা বাতিল করে খাস আদায়ের নামে হরিলুট চালিয়ে যাচ্ছে। খাজনা আদায়ে মানা হচ্ছে না পৌরসভার চার্ট। ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপর জুলুম করে নির্ধারিত খাজনার কয়েকগুণ বেশি আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

 

 

জানা যায়, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সোহাগপুর হাটটি জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী হাট। সপ্তাহে তিনদিন এই হাটটি বসে। গরু-ছাগল, ফার্নিচার, তাঁতের লুঙ্গী-শাড়ী, থান কাপর, খাদ্যসামগ্রীসহ সকল ধরণের পণ্য কেনাবেচা হয় এই হাঁটটিতে। সিরাজগঞ্জ ও আশপাশের জেলা  থেকে হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার কেনাবেচার জন্য হাটে আসে।

 

বেলকুচি পৌরসভার আওতাধীন এই হাটটির প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ১৪৩০ সালে ২ কোটি ৩৭ লাখ ও ১৪৩১ সালে ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু চলতি ১৪৩২ সালে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফর রহমান ও স্থানীয় বিএনপি নেতা হাজী আলতাফ সিন্ডিকেট করে কাউকে ইজারায় অংশ নিতে দেননি। ইজারা বাতিল করে খাস আদায়ের নামে এই হাট-বাজারটির বিভিন্ন পট্টি মোটা অংকের টাকা নিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে সাব ইজারা দেওয়া হয়েছে।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, কাঠপট্টি ১১ লাখ, কাপড়ের গাট্টি পট্টি ১১ লাখ, ট্র পট্টি ১৩ লাখ, গেঞ্জি পট্টি সাড়ে ৮ লাখ, ভূষাল পট্টি সাড়ে ৭ লাখ, ঝুড়ি-মুড়ি পট্টি সাড়ে ৬ লাখ, মাছ পট্টি সাড়ে ৪ লাখ টাকাসহ প্রতিটি পট্টি সাব ইজারা দেওয়া হয়েছে।

 

এদিকে সাব ইজারাদারেরা খাজনা আদায়ের নামে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপর জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে। পৌরসভার চাটে নির্ধারিত খাজনার ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।

 

সরেজমিনে সোহাগপুর হাটে গেলে ব্যবসায়ীদের উপর চলা অতিরিক্ত খাজনার খড়্গ দেখা যায়। একজন মুড়ি বিক্রেতার কাছ থেকেও ২ থেকে আড়াইশো টাকা নেওয়া হচ্ছে। ফুটপাতের ছোট দোকানগুলো থেকেও নেওয়া হচ্ছে থেকে এক-দেড়শো টাকা।

 

ফুটপাথের বিক্রেতারা বলেন, আগে খাজনা ১শ টাকা করে ছিলো এখন আড়াইশো করে দিতে হয়। হকারের কাছ থেকেই ২শ টাকা করে খাজনা নেওয়া হচ্ছে।

 

পৌরসভার চাটে ছাগলের খাজনা ৬০ টাকা করে ধরা থাকলেও হাটে গিয়ে দেখা যায় ২৫০ থেকে ৩শ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। গরুর খাজনা ৪৫০ টাকার স্থলে ৬শ থেকে ৭শ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে গরু-ছাগলের খাজনার রশিদে টাকার পরিমাণটা লেখা হচ্ছে না।

 

শাল কাঠপট্টির একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের কাছে সন্ত্রাসীর মতো করে টাকা নিচ্ছে। হাটের ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে জিম্মি। অতিরিক্ত ইজারা নেওয়ার প্রতিবাদ করলে বলে, না পোষালে হাটে আসবেন না।

 

হাজী মো. ইয়াকুব আলী নামে এক কাঠ ব্যবসায়ী বলেন, পৌরসভার চাটে প্রতি সেফটি কাঠে ৪ টাকা খাজনার জায়গায় নেওয়া হচ্ছে ৪০ টাকা। খাট, দরজার খাজনা চাটে ২৫ টাকা থাকলেও ২শ থেকে আড়াইশো টাকা করে নিচ্ছে। ইজারাদারদের কাছে ব্যবসায়ীরা আর ক্রেতারা জিম্মি।

 

অপর কাঠ ব্যবসায়ী সেলিম সরকার বলেন, এরা চাট দেখে খাজনা নেয় না। আবার খাজনা নিয়ে রশিদও দেয় না।

 

কথা হয় শাল কাঠপট্টি সাব ইজারা নেওয়া হরমুজ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, হাটটা যারা পৌরসভা থেকে নিয়ে আসছে। তারা তো কম টাকা নেয় নাই। এই পট্টিটা আমরা আলতাফ হাজীর কাছ থেকে ১১ লাখ টাকায় কিনে নিয়েছি। এই টাকা তোলার জন্য অতিরিক্ত খাজনা নিতে হচ্ছে। পৌরসভার চাট অনুযায়ী খাজনা নিলে আমাদের সব টাকাই রেখে যেতে হবে।

 

সাব ইজারাদার খলিল বলেন, পৌরসভার মাধ্যম দিয়ে পট্টিগুলো বিক্রি করা হয়। আমি এবং শাকিল হাজী আলতাফের মাধ্যম টাকা দিয়ে টেবিল পট্টি দেড় লাখ ও টিন পট্টি দুই লাখ টাকায় সাব ইজারা নিয়েছি।

 

ফলপট্টির ইজারা নেওয়া পান্না বলেন, একেক পট্টি একেক রকম রেট আছে। আগের ইজারাদারের যে রেট ছিল আমরা ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় ফলপট্টি নিয়েছি। পৌরসভার মাধ্যমে আলতাফ হাজী ওই টাকা নিয়েছে। আমরা পৌরসভার চাট দেখে টাকা তুলি না।

 

পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, ” ইজারা না হলে খাস আদায়ের বিধান সরকারিভাবে। মনিটরিং কমিটি পরিদর্শন করে। প্রতি হাটে ছাগল প্রতি ১০০ টাকা, গরু প্রতি ৪৫০ টাকা টোল নেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেউতো অভিযোগ দেয়নি।’

 

বেলকুচি পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি আলতাব হোসেনের দাবি,’ আমি ইজারাদার নই। পৌর কর্তৃপক্ষই টোল আদায় করছে। মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করি। এর বেশি কিছু জানতে হলে সরাসরি সাক্ষাত করুন।”

 

বেলকুচি পৌর প্রশাসক ও ইউএনও আফরিন জাহান বলেন, হাটের আয়-ব্যয়ের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

78
Created on
আপনার মতামত দিন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে ক্ষমতায় দেখতে চান ?

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কৌশলে হাটের ইজারা বাতিল করে খাস আদায়ের নামে হরিলুট

আপডেট টাইম : ০১:৫৮:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫

প্রতি বছরই সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সোহাগপুর হাটটি ইজারা নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন ইজারাদাররা। অথচ চলতি বছর হাটটির দরপত্র ডাকে অংশ নেননি কোন ইজারাদার। অভিযোগ উঠেছে, পৌর কর্তৃপক্ষ বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হাজী আলতাফের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে কৌশলে ইজারা বাতিল করে খাস আদায়ের নামে হরিলুট চালিয়ে যাচ্ছে। খাজনা আদায়ে মানা হচ্ছে না পৌরসভার চার্ট। ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপর জুলুম করে নির্ধারিত খাজনার কয়েকগুণ বেশি আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

 

 

জানা যায়, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সোহাগপুর হাটটি জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী হাট। সপ্তাহে তিনদিন এই হাটটি বসে। গরু-ছাগল, ফার্নিচার, তাঁতের লুঙ্গী-শাড়ী, থান কাপর, খাদ্যসামগ্রীসহ সকল ধরণের পণ্য কেনাবেচা হয় এই হাঁটটিতে। সিরাজগঞ্জ ও আশপাশের জেলা  থেকে হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার কেনাবেচার জন্য হাটে আসে।

 

বেলকুচি পৌরসভার আওতাধীন এই হাটটির প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ১৪৩০ সালে ২ কোটি ৩৭ লাখ ও ১৪৩১ সালে ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু চলতি ১৪৩২ সালে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফর রহমান ও স্থানীয় বিএনপি নেতা হাজী আলতাফ সিন্ডিকেট করে কাউকে ইজারায় অংশ নিতে দেননি। ইজারা বাতিল করে খাস আদায়ের নামে এই হাট-বাজারটির বিভিন্ন পট্টি মোটা অংকের টাকা নিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে সাব ইজারা দেওয়া হয়েছে।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, কাঠপট্টি ১১ লাখ, কাপড়ের গাট্টি পট্টি ১১ লাখ, ট্র পট্টি ১৩ লাখ, গেঞ্জি পট্টি সাড়ে ৮ লাখ, ভূষাল পট্টি সাড়ে ৭ লাখ, ঝুড়ি-মুড়ি পট্টি সাড়ে ৬ লাখ, মাছ পট্টি সাড়ে ৪ লাখ টাকাসহ প্রতিটি পট্টি সাব ইজারা দেওয়া হয়েছে।

 

এদিকে সাব ইজারাদারেরা খাজনা আদায়ের নামে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপর জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে। পৌরসভার চাটে নির্ধারিত খাজনার ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।

 

সরেজমিনে সোহাগপুর হাটে গেলে ব্যবসায়ীদের উপর চলা অতিরিক্ত খাজনার খড়্গ দেখা যায়। একজন মুড়ি বিক্রেতার কাছ থেকেও ২ থেকে আড়াইশো টাকা নেওয়া হচ্ছে। ফুটপাতের ছোট দোকানগুলো থেকেও নেওয়া হচ্ছে থেকে এক-দেড়শো টাকা।

 

ফুটপাথের বিক্রেতারা বলেন, আগে খাজনা ১শ টাকা করে ছিলো এখন আড়াইশো করে দিতে হয়। হকারের কাছ থেকেই ২শ টাকা করে খাজনা নেওয়া হচ্ছে।

 

পৌরসভার চাটে ছাগলের খাজনা ৬০ টাকা করে ধরা থাকলেও হাটে গিয়ে দেখা যায় ২৫০ থেকে ৩শ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। গরুর খাজনা ৪৫০ টাকার স্থলে ৬শ থেকে ৭শ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে গরু-ছাগলের খাজনার রশিদে টাকার পরিমাণটা লেখা হচ্ছে না।

 

শাল কাঠপট্টির একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের কাছে সন্ত্রাসীর মতো করে টাকা নিচ্ছে। হাটের ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে জিম্মি। অতিরিক্ত ইজারা নেওয়ার প্রতিবাদ করলে বলে, না পোষালে হাটে আসবেন না।

 

হাজী মো. ইয়াকুব আলী নামে এক কাঠ ব্যবসায়ী বলেন, পৌরসভার চাটে প্রতি সেফটি কাঠে ৪ টাকা খাজনার জায়গায় নেওয়া হচ্ছে ৪০ টাকা। খাট, দরজার খাজনা চাটে ২৫ টাকা থাকলেও ২শ থেকে আড়াইশো টাকা করে নিচ্ছে। ইজারাদারদের কাছে ব্যবসায়ীরা আর ক্রেতারা জিম্মি।

 

অপর কাঠ ব্যবসায়ী সেলিম সরকার বলেন, এরা চাট দেখে খাজনা নেয় না। আবার খাজনা নিয়ে রশিদও দেয় না।

 

কথা হয় শাল কাঠপট্টি সাব ইজারা নেওয়া হরমুজ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, হাটটা যারা পৌরসভা থেকে নিয়ে আসছে। তারা তো কম টাকা নেয় নাই। এই পট্টিটা আমরা আলতাফ হাজীর কাছ থেকে ১১ লাখ টাকায় কিনে নিয়েছি। এই টাকা তোলার জন্য অতিরিক্ত খাজনা নিতে হচ্ছে। পৌরসভার চাট অনুযায়ী খাজনা নিলে আমাদের সব টাকাই রেখে যেতে হবে।

 

সাব ইজারাদার খলিল বলেন, পৌরসভার মাধ্যম দিয়ে পট্টিগুলো বিক্রি করা হয়। আমি এবং শাকিল হাজী আলতাফের মাধ্যম টাকা দিয়ে টেবিল পট্টি দেড় লাখ ও টিন পট্টি দুই লাখ টাকায় সাব ইজারা নিয়েছি।

 

ফলপট্টির ইজারা নেওয়া পান্না বলেন, একেক পট্টি একেক রকম রেট আছে। আগের ইজারাদারের যে রেট ছিল আমরা ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় ফলপট্টি নিয়েছি। পৌরসভার মাধ্যমে আলতাফ হাজী ওই টাকা নিয়েছে। আমরা পৌরসভার চাট দেখে টাকা তুলি না।

 

পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, ” ইজারা না হলে খাস আদায়ের বিধান সরকারিভাবে। মনিটরিং কমিটি পরিদর্শন করে। প্রতি হাটে ছাগল প্রতি ১০০ টাকা, গরু প্রতি ৪৫০ টাকা টোল নেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেউতো অভিযোগ দেয়নি।’

 

বেলকুচি পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি আলতাব হোসেনের দাবি,’ আমি ইজারাদার নই। পৌর কর্তৃপক্ষই টোল আদায় করছে। মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করি। এর বেশি কিছু জানতে হলে সরাসরি সাক্ষাত করুন।”

 

বেলকুচি পৌর প্রশাসক ও ইউএনও আফরিন জাহান বলেন, হাটের আয়-ব্যয়ের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।