সিরাজগঞ্জ , শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
নৌকাই শেষ আশ্রয়

বিলের বুকে ভাসমান সংসার : রায়গঞ্জের জামাত–সখিনা দম্পতির

সোনাই ডাঙা বিলের বিশাল জলরাশির ওপর যখন বাতাস ছুঁয়ে যায়, সেই ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে ওঠে আরেকটি গল্প—জীবনযুদ্ধের গল্প। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের বাশুড়িয়া গ্রামের বৃদ্ধ দম্পতি জামাত আলী (৬৫) ও সখিনার। কারও ভিটে নেই, নেই থাকার মতো একটি ঘর। বহু বছর ধরে তাদের একমাত্র ঠিকানা—এক টুকরো পুরনো নৌকা।
 প্রায় ১৩০ একর জুড়ে বিস্তৃত সোনাই ডাঙা বিলই যেন আজ তাদের স্থায়ী বসতভিটে। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত, রোদ–বৃষ্টি–শীত—সব কিছুর সঙ্গী এই নৌকাই। খাওয়া, ঘুম, জীবন—সবই এখানে।
স্থানীয়রা জানান, বহু বছর আগে নিজের বাড়িঘর হারিয়ে জামাত আলী আশ্রয় নেন শ্বশুরবাড়িতে। কিন্তু সেখানেও থেকে যাওয়ার মতো জায়গা ছিল না। শেষ পর্যন্ত পানির ওপর ভেসে থাকা একটি ভাঙা নৌকাই হয় তাদের নতুন ঠিকানা। আর সেই নৌকাতেই শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়—যা আজও চলছে।
দুই কন্যার জনক জামাত আলী জীবনের কষ্ট সহ্য করে সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু নিজের মাথা গোঁজার আশ্রয় জোটেনি। বয়স যখন ঠেকে গেছে বার্ধক্যে, তখনো নৌকার ওপরই চলছে জীবনযুদ্ধ। বর্ষার উন্মত্ত স্রোত, শীতের কামড়, কিংবা হঠাৎ ঝড়—কিছুই তাদের ঠেকাতে পারে না। শুধু টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যান দু’জন।
জামাত–সখিনা দম্পতির চোখে ক্লান্তির স্রোত, তবু কথা বলতে বলতে একধরনের অসহায় দৃঢ়তাও ফুটে ওঠে—
“বিয়ের পর থেকেই ঘর নাই। নৌকাই আমাদের ঘর। কোথায় যাব? এই বিলই আমাদের ঠিকানা। এক বর্ষায় বজ্রপাতের সময় প্রায় মরেই যাচ্ছিলাম। তবু থাকার মতো আর জায়গা কোথায়?”
প্রতিবেশী আব্দুল আলিম বলেন,
“ছোটবেলা থেকে দেখছি—ওদের ঘরবসত এই নৌকাই। খুব কষ্টে দিন যায়।”
স্থানীয় সমাজসেবক কাজল দাস বলেন,
“অনেক বছর ধরেই দেখছি তারা নৌকার ওপর থাকেন। তাদের জীবনটাই সংগ্রামের। সমাজের একটু দৃষ্টি পড়লে হয়তো মানবসম্মতভাবে বাঁচতে পারতেন।”
জানতে চাইলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও ধানগড়া ইউনিয়নের প্রশাসক ইলিয়াস হাসান বলেন,
“বিষয়টি নতুন জানলাম। যদি তাদের বয়স্কভাতা কার্ড না থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা করা হবে। আবেদন করলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।”
বিলের বুকভরা নীরবতার মাঝে ভেসে থাকা এই দম্পতির জীবন যেন সমাজের সামনে এক অপ্রকাশিত প্রশ্ন রাখে—
বৃদ্ধ বয়সে মানুষের মাথা গোঁজার সামান্য আশ্রয় কি সত্যিই এত দুর্লভ হওয়া উচিত?
78
Created on
আপনার মতামত দিন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে ক্ষমতায় দেখতে চান ?

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নৌকাই শেষ আশ্রয়

বিলের বুকে ভাসমান সংসার : রায়গঞ্জের জামাত–সখিনা দম্পতির

আপডেট টাইম : ০৭:৩৫:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
সোনাই ডাঙা বিলের বিশাল জলরাশির ওপর যখন বাতাস ছুঁয়ে যায়, সেই ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে ওঠে আরেকটি গল্প—জীবনযুদ্ধের গল্প। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের বাশুড়িয়া গ্রামের বৃদ্ধ দম্পতি জামাত আলী (৬৫) ও সখিনার। কারও ভিটে নেই, নেই থাকার মতো একটি ঘর। বহু বছর ধরে তাদের একমাত্র ঠিকানা—এক টুকরো পুরনো নৌকা।
 প্রায় ১৩০ একর জুড়ে বিস্তৃত সোনাই ডাঙা বিলই যেন আজ তাদের স্থায়ী বসতভিটে। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত, রোদ–বৃষ্টি–শীত—সব কিছুর সঙ্গী এই নৌকাই। খাওয়া, ঘুম, জীবন—সবই এখানে।
স্থানীয়রা জানান, বহু বছর আগে নিজের বাড়িঘর হারিয়ে জামাত আলী আশ্রয় নেন শ্বশুরবাড়িতে। কিন্তু সেখানেও থেকে যাওয়ার মতো জায়গা ছিল না। শেষ পর্যন্ত পানির ওপর ভেসে থাকা একটি ভাঙা নৌকাই হয় তাদের নতুন ঠিকানা। আর সেই নৌকাতেই শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়—যা আজও চলছে।
দুই কন্যার জনক জামাত আলী জীবনের কষ্ট সহ্য করে সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু নিজের মাথা গোঁজার আশ্রয় জোটেনি। বয়স যখন ঠেকে গেছে বার্ধক্যে, তখনো নৌকার ওপরই চলছে জীবনযুদ্ধ। বর্ষার উন্মত্ত স্রোত, শীতের কামড়, কিংবা হঠাৎ ঝড়—কিছুই তাদের ঠেকাতে পারে না। শুধু টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যান দু’জন।
জামাত–সখিনা দম্পতির চোখে ক্লান্তির স্রোত, তবু কথা বলতে বলতে একধরনের অসহায় দৃঢ়তাও ফুটে ওঠে—
“বিয়ের পর থেকেই ঘর নাই। নৌকাই আমাদের ঘর। কোথায় যাব? এই বিলই আমাদের ঠিকানা। এক বর্ষায় বজ্রপাতের সময় প্রায় মরেই যাচ্ছিলাম। তবু থাকার মতো আর জায়গা কোথায়?”
প্রতিবেশী আব্দুল আলিম বলেন,
“ছোটবেলা থেকে দেখছি—ওদের ঘরবসত এই নৌকাই। খুব কষ্টে দিন যায়।”
স্থানীয় সমাজসেবক কাজল দাস বলেন,
“অনেক বছর ধরেই দেখছি তারা নৌকার ওপর থাকেন। তাদের জীবনটাই সংগ্রামের। সমাজের একটু দৃষ্টি পড়লে হয়তো মানবসম্মতভাবে বাঁচতে পারতেন।”
জানতে চাইলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও ধানগড়া ইউনিয়নের প্রশাসক ইলিয়াস হাসান বলেন,
“বিষয়টি নতুন জানলাম। যদি তাদের বয়স্কভাতা কার্ড না থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা করা হবে। আবেদন করলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।”
বিলের বুকভরা নীরবতার মাঝে ভেসে থাকা এই দম্পতির জীবন যেন সমাজের সামনে এক অপ্রকাশিত প্রশ্ন রাখে—
বৃদ্ধ বয়সে মানুষের মাথা গোঁজার সামান্য আশ্রয় কি সত্যিই এত দুর্লভ হওয়া উচিত?