সিরাজগঞ্জ , শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শাহজাদপুরে সরিষার হলুদ ফুলের বিস্তীর্ণ মাঠ থেকে আহরণ হবে ২৭ হাজার কেজি মধু!

প্রবাহমান যমুনা, করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর নদীর পলি মিশ্রিত মাটির বিস্তীর্ণ মাঠ এখন গাঢ় হলুদের স্বর্গরাজ্য। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা সিঁথিকাটা নদীগুলো শাহজাদপুরকে ধুয়ে দিয়ে পরম যত্নে বিছিয়ে দেয় পলিমাটি। আর এই নরম পলিতে কৃষকের হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ সঞ্চারিত হয়ে বিরাট অঞ্চল সেজে ওঠে নানা রঙে নানা ঢংয়ে।
সুতোর মতো বিছিয়ে থাকা নদী বেষ্টিত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ এখন হলুদের স্বর্গরাজ্য। সরিষার হলুদ ফুল মাঠ জুড়ে দোল খাচ্ছে পৌষের হিমেল বাতাসে। মৃদু বাতাসে তিরতির করে কেঁপে ওঠা হলুদ ফুলে প্রজাপতি আর মৌমাছিদের অবিরাম খেলায় গ্রামীণ জনপদকে করেছে আরো মনমুগ্ধকর।
দিন দিন ভোজ্য তেলের চাহিদা বৃদ্ধি এবং শাহজাদপুরের বিস্তির্ণ ফসলের মাঠ সরিষা আবাদের উপযোগী হওয়ায় উপজেলা জুড়েই বৃদ্ধি পেয়েছে সরিষার চাষ। সরিষার আবাদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মৌসুমী মৌমাছিদের তৎপরতা। পাশাপাশি সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে মৌচাষিরা। সরিষা ক্ষেতের পাশে পোষা মৌমাছি দিয়ে শত শত বাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন তারা। ওই সব বাক্স থেকে পোষা মৌমাছিগুলো উড়ে গিয়ে মধু সংগ্রহের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে সরিষার হলুদ ফুলে। ফুল থেকে ফুলে উড়ে গিয়ে মধু সংগ্রহ করে ফিরে এসে সরিষা ক্ষেতের পাশে খোলা জায়গায় রাখা চাক ভরা বাক্সে মধু রাখছে মৌমাছিরা। আর এসব মৌচাক থেকেই মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলার ১টি পৌরসভা, ১৩টি ইউনিয়নে ১৬ হাজার ৫ শত হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩০০ হেক্টর জমিতে বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা। উপজেলার কায়েমপুর, জুগ্নীদহ, পারকোলা, টেটিয়ারকান্দা, করশালিকা, চরধুনাইলসহ বিভিন্ন সরিষা ক্ষেত ঘুরে এবং মৌচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর শাহজাদপুর সহ পাবনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও জামালপুর থেকে ১৮ জন মৌচাষি সরিষা ক্ষেতের পাশে ২ হাজার মৌ-বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে সরিষা ক্ষেতের পাশে সারি সারি বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন তারা।
উপজেলার নরিনা ইউনিয়নের পারকোলা সরিষার খেতে মৌচাষি মোঃ মমিন মধু সংগ্রহের জন্য ১০০টি বাক্স বসিয়েছেন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মধু সংগ্রহের জন্য স্টিল ও কাঠ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা হয় বাক্স। বাক্সের ভেতরে কাঠের তৈরি সাতটি ফ্রেমের সঙ্গে মোম দিয়ে বানানো বিশেষ কায়দায় লাগানো থাকে এক ধরনের সিট। বাক্সগুলো কালো পলিথিন ও চট দিয়ে মোড়ানো থাকে। সরিষা ক্ষেতের পাশে বাক্সগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। ওই বাক্সেগুলোতে রাখা হয় রানী মৌমাছি। এসব বাক্সে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে হাজারো পুরুষ মৌমাছি ভীড় জমায়। এভাবেই সরিষা ফুল থেকে বিশেষভাবে তৈরি মৌবাক্সের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করে মৌচাষিরা। তারা জানান ৮ থেকে ১০ দিন পর পর বাক্স থেকে মধু আহরণ করা হয়। ভাল রোদ হলে সপ্তাহে দু’বার হারভেস্ট করা যায়।
মৌচাষী মমিন আরও জানান, চলতি মৌসুমে সরিষার ফুল থেকে ইতোমধ্যেই ৫ মন মধু সংগ্রহ করেছেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে মধু সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে। আবহাওয়া ভালো হলে এখান থেকেই তিনি ২০/২২ মণ মধু সংগ্রহ করবেন। আর আবহাওয়া যদি অনুকূলে না আসে তবে মোটা অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২০২৫- ২৬ অর্থবছরে শাহজাদপুর উপজেলায় ১৬ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। এসব জমির মধ্যে ১৮ জন মৌচাষি ২হাজার মৌবাক্স স্থাপন করে মধু আহরন করছেন। চলতি বছর উপজেলায় মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৭ হাজার কেজি। বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেও ইতোমধ্যেই ৩ হাজার ৯শত ৪১ কেজি মধু আহরণ করেছে মৌয়ালরা। আবওহাওয়া অনুকূলে থাকলে জানুয়ারি মাসের মধ্যেই মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে তিনি আশা করেন। তিনি আরও জানান, মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মৌয়ালদের সার্বক্ষণিক কারিগরি সহায়তা প্রদানসহ সার্বক্ষণিক সবধরনের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
84
Created on
আপনার মতামত দিন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে ক্ষমতায় দেখতে চান ?

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শাহজাদপুরে সরিষার হলুদ ফুলের বিস্তীর্ণ মাঠ থেকে আহরণ হবে ২৭ হাজার কেজি মধু!

আপডেট টাইম : ০৫:০৮:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
প্রবাহমান যমুনা, করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর নদীর পলি মিশ্রিত মাটির বিস্তীর্ণ মাঠ এখন গাঢ় হলুদের স্বর্গরাজ্য। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা সিঁথিকাটা নদীগুলো শাহজাদপুরকে ধুয়ে দিয়ে পরম যত্নে বিছিয়ে দেয় পলিমাটি। আর এই নরম পলিতে কৃষকের হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ সঞ্চারিত হয়ে বিরাট অঞ্চল সেজে ওঠে নানা রঙে নানা ঢংয়ে।
সুতোর মতো বিছিয়ে থাকা নদী বেষ্টিত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ এখন হলুদের স্বর্গরাজ্য। সরিষার হলুদ ফুল মাঠ জুড়ে দোল খাচ্ছে পৌষের হিমেল বাতাসে। মৃদু বাতাসে তিরতির করে কেঁপে ওঠা হলুদ ফুলে প্রজাপতি আর মৌমাছিদের অবিরাম খেলায় গ্রামীণ জনপদকে করেছে আরো মনমুগ্ধকর।
দিন দিন ভোজ্য তেলের চাহিদা বৃদ্ধি এবং শাহজাদপুরের বিস্তির্ণ ফসলের মাঠ সরিষা আবাদের উপযোগী হওয়ায় উপজেলা জুড়েই বৃদ্ধি পেয়েছে সরিষার চাষ। সরিষার আবাদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মৌসুমী মৌমাছিদের তৎপরতা। পাশাপাশি সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে মৌচাষিরা। সরিষা ক্ষেতের পাশে পোষা মৌমাছি দিয়ে শত শত বাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন তারা। ওই সব বাক্স থেকে পোষা মৌমাছিগুলো উড়ে গিয়ে মধু সংগ্রহের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে সরিষার হলুদ ফুলে। ফুল থেকে ফুলে উড়ে গিয়ে মধু সংগ্রহ করে ফিরে এসে সরিষা ক্ষেতের পাশে খোলা জায়গায় রাখা চাক ভরা বাক্সে মধু রাখছে মৌমাছিরা। আর এসব মৌচাক থেকেই মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলার ১টি পৌরসভা, ১৩টি ইউনিয়নে ১৬ হাজার ৫ শত হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩০০ হেক্টর জমিতে বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা। উপজেলার কায়েমপুর, জুগ্নীদহ, পারকোলা, টেটিয়ারকান্দা, করশালিকা, চরধুনাইলসহ বিভিন্ন সরিষা ক্ষেত ঘুরে এবং মৌচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর শাহজাদপুর সহ পাবনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও জামালপুর থেকে ১৮ জন মৌচাষি সরিষা ক্ষেতের পাশে ২ হাজার মৌ-বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে সরিষা ক্ষেতের পাশে সারি সারি বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন তারা।
উপজেলার নরিনা ইউনিয়নের পারকোলা সরিষার খেতে মৌচাষি মোঃ মমিন মধু সংগ্রহের জন্য ১০০টি বাক্স বসিয়েছেন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মধু সংগ্রহের জন্য স্টিল ও কাঠ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা হয় বাক্স। বাক্সের ভেতরে কাঠের তৈরি সাতটি ফ্রেমের সঙ্গে মোম দিয়ে বানানো বিশেষ কায়দায় লাগানো থাকে এক ধরনের সিট। বাক্সগুলো কালো পলিথিন ও চট দিয়ে মোড়ানো থাকে। সরিষা ক্ষেতের পাশে বাক্সগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। ওই বাক্সেগুলোতে রাখা হয় রানী মৌমাছি। এসব বাক্সে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে হাজারো পুরুষ মৌমাছি ভীড় জমায়। এভাবেই সরিষা ফুল থেকে বিশেষভাবে তৈরি মৌবাক্সের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করে মৌচাষিরা। তারা জানান ৮ থেকে ১০ দিন পর পর বাক্স থেকে মধু আহরণ করা হয়। ভাল রোদ হলে সপ্তাহে দু’বার হারভেস্ট করা যায়।
মৌচাষী মমিন আরও জানান, চলতি মৌসুমে সরিষার ফুল থেকে ইতোমধ্যেই ৫ মন মধু সংগ্রহ করেছেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে মধু সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে। আবহাওয়া ভালো হলে এখান থেকেই তিনি ২০/২২ মণ মধু সংগ্রহ করবেন। আর আবহাওয়া যদি অনুকূলে না আসে তবে মোটা অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২০২৫- ২৬ অর্থবছরে শাহজাদপুর উপজেলায় ১৬ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। এসব জমির মধ্যে ১৮ জন মৌচাষি ২হাজার মৌবাক্স স্থাপন করে মধু আহরন করছেন। চলতি বছর উপজেলায় মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৭ হাজার কেজি। বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেও ইতোমধ্যেই ৩ হাজার ৯শত ৪১ কেজি মধু আহরণ করেছে মৌয়ালরা। আবওহাওয়া অনুকূলে থাকলে জানুয়ারি মাসের মধ্যেই মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে তিনি আশা করেন। তিনি আরও জানান, মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মৌয়ালদের সার্বক্ষণিক কারিগরি সহায়তা প্রদানসহ সার্বক্ষণিক সবধরনের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।