ইয়েমেনের কৌশলগত লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা দখলে নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে বলে সামরিক সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানিয়েছে বিবিসি।
মোখা দখলের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ থেকেও সরকারি বাহিনী সরে গেছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সেনা প্রত্যাহারের পর হুতি যোদ্ধারা দ্বীপটিতে প্রবেশ করেছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এদিকে হুতিরা জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি নয়। তবে সৌদি আরবের জাহাজে হামলা চালানোর হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছে তারা। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। এ পথ দিয়েই এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে জাহাজ চলাচল করে এবং সুয়েজ খালে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এটি।
মোখা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে লোহিত সাগরের জুকার দ্বীপও হুতিরা দখলে নিয়েছে বলে ইয়েমেনের সামরিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে এএফপি। রকেট হামলা ও নৌযানে করে স্থল অভিযান চালিয়ে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

পেরিম দ্বীপে সরকারি বাহিনী সরে যাওয়ার পর হুতিদের নৌযান সেখানে পৌঁছায়। স্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, বাব আল-মান্দেব এলাকা ও প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও হুতিরা সম্পন্ন করেছে। এই অগ্রগতিতে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুতিদের প্রভাব আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বুধবার রাতে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষের পর হুতি যোদ্ধারা মোখায় প্রবেশ করে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। এরপর বহু পরিবার শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়।
এক বাসিন্দা বিবিসি আরবিকে বলেন, কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আহত ব্যক্তিদের রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেলেও তাদের সহায়তায় কেউ এগিয়ে আসেনি বলে জানান তিনি।
আরেক বাসিন্দা জানান, বৃহস্পতিবার হুতি যোদ্ধারা শহরের রাস্তায় টহল দিচ্ছিল। সরকারি কার্যালয় ও দোকানপাট বন্ধ ছিল। বাসিন্দাদের মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মোখা থেকে পালিয়ে যাওয়া বহু পরিবার পূর্ব দিকে এডেনের দিকে যাচ্ছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল ও সরকার এডেনে অবস্থান করছে।
এক নারী বিবিসিকে বলেন, সন্তানদের নিয়ে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সঙ্গে কোনো বিছানা, ঘরের জিনিসপত্র বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিতে পারেননি। এক ঘণ্টার মধ্যে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট পশ্চিম ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে হুতিরা দক্ষিণ সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় তাইজ, হুদায়দা, মারিব ও জাওফ প্রদেশে সৌদি যুদ্ধবিমান ৬৪টি হামলা চালিয়েছে। সৌদি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে মঙ্গলবার দক্ষিণ সৌদি আরবে কয়েক ডজন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে হুতিরা। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব হামলায় ৭৩ জন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হন এবং কয়েকটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। এতে সাময়িকভাবে কয়েকটি স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।
হুতিরা বলেছে, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি অবরোধ এবং সানা বিমানবন্দরে সৌদি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা এসব হামলা চালিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
বাব আল-মান্দেব ঘিরে সংঘাত বাড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট একই সময়ে চাপের মুখে পড়েছে।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি আরব দেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইয়েমেনের উপকূল রক্ষায় সহায়তা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে হুতিদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিষদ বলেছে, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব ও জলসীমা রক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে তারা বলেছে, লোহিত সাগরে নৌ চলাচল নিরাপদ রয়েছে।
তবে হুতিদের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র জানিয়েছে, সৌদি জাহাজের ওপর তাদের আরোপ করা সামুদ্রিক অবরোধ বহাল থাকবে।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হুতিদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। প্রায় চার বছর ধরে চলা অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি জুলাইয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করে। এরপর হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে এবং দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে।
সূত্র : বিবিসি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 





















One thought on “মোখা বন্দর হুতিদের নিয়ন্ত্রণে, বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব”