রোববার (২৩ নভেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সম্মিলিত ইমাম-খতিব জাতীয় সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
ন্যাশনাল ডেস্ক, জনতার কণ্ঠ
রোববার (২৩ নভেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সম্মিলিত ইমাম-খতিব জাতীয় সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
একইসঙ্গে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আর্থিকভাবে আরও স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্টকে শক্তিশালী করে বহুমুখী প্রকল্প গ্রহণ করার চিন্তাভাবনাও বিএনপির রয়েছে বলে জানান তিনি।
‘একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি মনে করে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং মহানবীর শান ও মান সমুন্নত রেখে ইসলাম নিয়ে গবেষণায় নিঃসন্দেহে কোনো বাধা নেই।’
‘ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে বিএনপি এমন একটি কল্যাণমূলক সমাজ, সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে, যে রাষ্ট্র ও সমাজে মুসলমানরা নিঃসঙ্কোচে কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন। সবাই নির্ভয়ে-নিরাপদে ইবাদত বন্দেগি করতে পারবে। একইভাবে অন্য ধর্মের মানুষরাও নিরাপদে নিশ্চিন্তে যার যার ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করতে সক্ষম হবে।’
তিনি বলেন, পতিত পলাতক স্বৈরাচারের দল, যারা স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসে নিজেদের ইচ্ছেমতো সংবিধান রচনা করেছিল, সে সংবিধানে অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন তখন ঘটেনি। পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সংবিধানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। বর্তমানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থা কথাটি এভাবে রাখা হয়নি। কেন এভাবে রাখা হয়নি, এই প্রশ্নটি আজ আমি আপনাদের সামনে রেখে গেলাম।
বিএনপি বরাবরই ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, পতিত পলাতক স্বৈরাচার ইসলাম-মুসলমান এবং ইসলামী সংস্কৃতিকে রাষ্ট্র এবং সমাজে নানাভাবে হেয়-প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করেছিল। আপনারা এখানে যারা উপস্থিত আছেন, আপনাদের অনেকেরই হয়তো মনে আছে, ২০২৪ সালে পবিত্র রমজান মাসে হঠাৎ করেই মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ইফতার মাহফিল আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, এটা ছিল বাংলাদেশে ইসলাম বিরোধী, ইসলামী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। সেসময় বিএনপি এই অপতৎপরতার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
২০১৩ সালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর হানাদার বাহিনীর মতো ক্র্যাকডাউন (দমনাভিযান) চালানো হয়েছিল উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এই গণহত্যার প্রতিবাদে এবং হেফাজতে ইসলামের সমর্থনে বিএনপি সারাদেশে দুইদিন হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি তখন পালন করেছে।
যেকোনো পেশা কিংবা চাকরির ক্ষেত্রে সার্টিফিকেটের গুরুত্ব বিবেচনা করে কওমি মাদরাসার ছাত্রদের সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিস অর্থাৎ তাকমিল সনদকে ২০০৬ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলেই মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশে বর্তমানে কওমি এবং আলিয়া সরকারি-বেসরকারি কিংবা নিবন্ধিত বা অনিবন্ধিত সব মিলিয়ে ৫০ হাজারের বেশি মাদরাসা রয়েছে। এসব মাদরাসায় লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। দেশের সরকারি কিংবা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সারা দেশে সব মিলিয়ে মসজিদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ বা আরও তারও কিছু বেশি হতে পারে। এই মসজিদগুলোতে কম বেশি প্রায় ১৭ লক্ষ ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিন ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করছেন। লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদরাসা, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও মাদরাসা শিক্ষার্থীকে রাষ্ট্রীয় অগ্রপন্থীমূলক কার্যক্রমের বাইরে রেখে দেশে কখনো টেকসই উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতাকে বিএনপি আগামী দিনের কর্মসূচিতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, এই সম্মেলনে আপনারা আলেম-ওলামা, ইমাম-খতিব ও মুয়াজ্জিনদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করেছেন। আপনাদের উপস্থাপিত দাবিগুলোর বেশ কয়েকটি দাবি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পূরণ করার সব রকম সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। আপনারা ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিনদের জন্য সার্ভিস রুল প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। আপনাদের এই দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক। অনেক মসজিদে মসজিদ কমিটির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরি নির্ভর করে। আমি মনে করি, এটা হওয়া উচিত নয়, এটা হতে পারে না। এটাকে আমি ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বিরুদ্ধে অন্যায্য আচরণ বলে মনে করি। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে, সার্ভিস রুল প্রণয়নের ব্যাপারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।
উপস্থাপিত অন্যান্য দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর উদ্যোগ বিএনপি সরকার অবশ্যই নেবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি দাবি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করে আপনারা নিজেদের উদ্যোগে এক বা একাধিক কমিটি গঠন করে প্রতিটি দাবির বিপরীতে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তৈরি করে আমাদের দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকারের সময় দেশে প্রথমবারের মতো মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্প চালু করা হয়েছিল স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এর পাশাপাশি আগামী দিনে দুর্যোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমসহ দেশের সব জেলা-উপজেলা ও স্থানীয় ভিত্তিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায়—এ বিষয়টি নিয়েও আমাদের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। কর্মজীবনে যিনি যে পেশায় নিয়োজিত হতে চান অথবা যে চাকরি করতে চান, এর জন্য প্রয়োজন—সততা, সক্ষমতা, যোগ্যতা ও দক্ষতা। দেশের লক্ষ লক্ষ মসজিদকে কেন্দ্র করে আরও কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায়, এ ব্যাপারে আপনাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং সুপারিশ আমরা আশা করছি।
তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ দেড় দশকের তাঁবিদারি শাসন-শোষণের মাধ্যমে আরও একবার প্রমাণিত হয়েছে- ঈমান, ইসলাম এবং দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে ঐক্যের বিকল্প নেই।
দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা সুসমুন্নত করার জন্য আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বিএনপির এই নেতা বলেন, আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় আমাদের মহানবীকে যারা অপছন্দ করতো, তারাও কিন্তু মহানবীর (সা.) ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে জানতো, মানতো এবং বিশ্বাস করতো। মহানবীর ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে মুসলমান, অমুসলমান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী—কারও মধ্যেই কোনো সংশয় ছিল না। মহানবীর সেই ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শকে সমুন্নত রেখে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় বিএনপির মূল মন্ত্র হবে- ন্যায়পরায়ণতা। মহানবীর ন্যায়পরায়ণতা-আদর্শে উজ্জীবিত একটি ইনসাফ ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আগামী নির্বাচনে বিএনপি দেশের সব সম্মানিত ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিন, আলেম-ওলামা-পীর মাশায়েখদের দোয়া, সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করছে।