মন্তব্য প্রতিবেদন
মো. জুয়েল হোসেন
(বিভাগীয় প্রধান, রাজশাহী অঞ্চল, আই নিউজ বিডি)
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। শহরের গলির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল একজন স্থানীয় সাংবাদিক—ক্যামেরা হাতে। একটি দুর্নীতির খবরের তথ্য সংগ্রহ করেই ফিরছিলেন বাসায়। হঠাৎ তিনজন অচেনা যুবক তার পথ রোধ করল, হাতে লোহার রড।
— “ক্যামেরাটা দাও। এই ভিডিও যদি প্রকাশ পায়, জানো তো কী হবে?”
শরীরে লোহার আঘাতের ব্যথা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। থানায় অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু মামলা হয়নি।
এমন ঘটনা কোনো ব্যতিক্রম নয়। ঢাকা, গাজীপুর, খুলনা বা সিরাজগঞ্জ—প্রতিদিন কোথাও না কোথাও সাংবাদিকরা খবর সংগ্রহের পথে হুমকি, হামলা বা মিথ্যা মামলার মুখে পড়ছেন। এই বাস্তবতাই সরকারের সামনে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে।
নতুন আইন—আশার আলো?
‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রস্তাব করছে—
* সাংবাদিকের ওপর সহিংসতা, হুমকি বা হয়রানির সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছরের জেল
* ন্যূনতম ১ লাখ টাকা জরিমানা, যা ক্ষতিপূরণ হিসেবে সাংবাদিককে দেওয়া হবে
* তথ্যসূত্র প্রকাশে বাধ্য করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা
* যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ উদ্যোগ
* কর্মস্থলের ভেতরে মালিকপক্ষের সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি হবে সাংবাদিকদের জন্য প্রথম কাঠামোবদ্ধ আইনি সুরক্ষা, যেখানে মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ব্যবস্থা থাকবে।
রাকিবুল ইসলাম, একটি আঞ্চলিক দৈনিকের রিপোর্টার, বললেন— “আইন কাগজে ভালো শোনায়। কিন্তু থানায় গিয়ে যদি মামলা না নিতে চায়, তাহলে এই আইনের শাস্তির ধারা কাজে লাগবে কিভাবে? প্রয়োগ না হলে আমরা আগের মতোই অসহায়।”
শাহিন আক্তার, টেলিভিশনের ক্রাইম রিপোর্টার, বললেন— “যৌন হয়রানির শিকার অনেক নারী সাংবাদিক কথা বলতেই ভয় পান। যদি এই আইন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তবে তা বড় পরিবর্তন হবে।”
বাংলাদেশে বহু আইন আছে, কিন্তু সেগুলোর প্রয়োগে দুর্বলতা সুপরিচিত।
* থানায় জিডি বা মামলা না নেওয়া
* প্রভাবশালী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্তে বিলম্ব
* সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা
এমন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকলে সাংবাদিকদের সুরক্ষার আইনও একই পরিণতি বরণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মিডিয়া অধিকার কর্মীরা।
নরওয়ে, কানাডা, সুইডেনে সাংবাদিকের ওপর হামলা রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয়। দ্রুত বিচার ও ক্ষতিপূরণ সেখানে বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের নতুন আইন এই মডেলের কাছাকাছি হলেও, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রয়োগ হবে কিনা, সেটিই মূল প্রশ্ন।
ইতিবাচক দিক—
* স্পষ্টভাবে সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে
* সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা সাংবিধানিক অধিকারের সাথে মিলিয়ে পুনর্নিশ্চিত করা হয়েছে
* কোম্পানি দায়ী হলে বিনিয়োগকারী-পরিচালকও অভিযুক্ত হবেন, যা করপোরেট দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে
কিন্তু কিছু ঝুঁকিও আছে—
* মিথ্যা অভিযোগের ধারা হয়রানির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে
* রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হলে অভিযোগের নিষ্পত্তি দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে যাবে
* মাঠ পর্যায়ে পুলিশ ও প্রশাসনের মনোভাব যদি না বদলায়, তাহলে আইন কেবল কাগুজে থাকবে
এই আইন যদি সত্যিকারের সুরক্ষা দিতে চায়, তবে শুধু ধারা-উপধারা নয়—প্রয়োগের মেকানিজম, নজরদারি ও জবাবদিহি শক্ত করতে হবে। আইনকে সাংবাদিকদের ঢাল বানাতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বাধীন তদন্ত ও দ্রুত বিচার অপরিহার্য। নইলে হয়তো আরেক সাংবাদিক রাতের গলিতে দাঁড়িয়ে আবারও শুনবেন— “এই ভিডিও যদি প্রকাশ পায়, জানো তো কী হবে?”

রিপোর্টার: 






















