সিরাজগঞ্জ , শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
মহাকালের সাক্ষী থেকে ধ্বংসস্তুপ

বিলীনের পথে ৫০০ বছরের ঐতিহাসিক ‘ইমামবাড়ি’

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস গ্রামে অবস্থিত প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘ইমামবাড়ি’ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজ।
একসময় মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই ইমামবাড়ি ছিল ইসলাম প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সুফি-সাধক হজরত শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত কারুকার্যখচিত স্থাপনাটি বর্তমানে অযত্ন, অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে ইয়েমেন থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চলনবিল অধ্যুষিত বারুহাস গ্রামে আগমন করেন সুফি-সাধক হজরত শাহ ইমাম (রহ.)। তিনি এ অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলামের বাণী ও আদর্শ প্রচার করেন। তার আধ্যাত্মিক প্রভাবে বহু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
এরপর চতুর্থ মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর চলনবিল পরগনা পরিদর্শনে এসে হজরত শাহ ইমাম (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইসলাম প্রচারে তার অবদান দেখে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট সেখানে একটি মসজিদ, ইবাদতের জন্য কয়েকটি পাকা ঘর নির্মাণ এবং একটি পুকুর খননের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ইসলাম প্রচারের কাজে সহায়তার জন্য তাকে ৮০ একর করমুক্ত জমি দান করা হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হজরত শাহ ইমাম (রহ.) এই ইমামবাড়িতেই বসবাস করেন। পরে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের পূর্ব-উত্তর পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ইমামবাড়ির একটি মসজিদ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। কেবল গম্বুজসদৃশ একটি ছোট ঘর কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকলেও সেটিও গাছপালা ও লতাপাতায় প্রায় ঢেকে গেছে। কারুকার্যখচিত দেওয়ালগুলো এখন চরমভাবে জরাজীর্ণ, যা স্থাপনাটির ভগ্নদশা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু স্থাপনাই নয়; ইমামবাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শনও দখলের শিকার হচ্ছে। বারুহাস গ্রামের বাসিন্দা মোকাদ্দেস আলী বলেন, ইমামবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সমাধির সামনে প্রায় সাড়ে আট বিঘা আয়তনের একটি পুকুর ছিল, সেটিও এখন স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা ও এর সঙ্গে জড়িত জমি উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছি।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারিভাবে দখলমুক্ত করে ইমামবাড়ির স্থাপনাগুলো পুনঃনির্মাণ ও সংরক্ষণ করা হোক, যাতে হজরত শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতি অম্লান থাকে। তাদের মতে, এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; বরং চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগে ৫০০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক ইমামবাড়িটি সংরক্ষিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুন্ন থাকবে।
89
Created on
আপনার মতামত দিন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে ক্ষমতায় দেখতে চান ?

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মহাকালের সাক্ষী থেকে ধ্বংসস্তুপ

বিলীনের পথে ৫০০ বছরের ঐতিহাসিক ‘ইমামবাড়ি’

আপডেট টাইম : ০৮:৫২:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস গ্রামে অবস্থিত প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘ইমামবাড়ি’ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজ।
একসময় মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই ইমামবাড়ি ছিল ইসলাম প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সুফি-সাধক হজরত শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত কারুকার্যখচিত স্থাপনাটি বর্তমানে অযত্ন, অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে ইয়েমেন থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চলনবিল অধ্যুষিত বারুহাস গ্রামে আগমন করেন সুফি-সাধক হজরত শাহ ইমাম (রহ.)। তিনি এ অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলামের বাণী ও আদর্শ প্রচার করেন। তার আধ্যাত্মিক প্রভাবে বহু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
এরপর চতুর্থ মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর চলনবিল পরগনা পরিদর্শনে এসে হজরত শাহ ইমাম (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইসলাম প্রচারে তার অবদান দেখে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট সেখানে একটি মসজিদ, ইবাদতের জন্য কয়েকটি পাকা ঘর নির্মাণ এবং একটি পুকুর খননের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ইসলাম প্রচারের কাজে সহায়তার জন্য তাকে ৮০ একর করমুক্ত জমি দান করা হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হজরত শাহ ইমাম (রহ.) এই ইমামবাড়িতেই বসবাস করেন। পরে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের পূর্ব-উত্তর পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ইমামবাড়ির একটি মসজিদ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। কেবল গম্বুজসদৃশ একটি ছোট ঘর কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকলেও সেটিও গাছপালা ও লতাপাতায় প্রায় ঢেকে গেছে। কারুকার্যখচিত দেওয়ালগুলো এখন চরমভাবে জরাজীর্ণ, যা স্থাপনাটির ভগ্নদশা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু স্থাপনাই নয়; ইমামবাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শনও দখলের শিকার হচ্ছে। বারুহাস গ্রামের বাসিন্দা মোকাদ্দেস আলী বলেন, ইমামবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সমাধির সামনে প্রায় সাড়ে আট বিঘা আয়তনের একটি পুকুর ছিল, সেটিও এখন স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা ও এর সঙ্গে জড়িত জমি উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছি।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারিভাবে দখলমুক্ত করে ইমামবাড়ির স্থাপনাগুলো পুনঃনির্মাণ ও সংরক্ষণ করা হোক, যাতে হজরত শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতি অম্লান থাকে। তাদের মতে, এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; বরং চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগে ৫০০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক ইমামবাড়িটি সংরক্ষিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুন্ন থাকবে।