কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত গাড়ির হর্নের পাশাপাশি বিভিন্ন যানবাহনের সামনে-পেছনে মাইক বেঁধে উচ্চ শব্দে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারের প্রচার, বৈদ্যুতিক মালামালসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির জন্য মাইকে উচ্চ শব্দে প্রচারণার কারণে দিন দিন বাড়ছে শব্দদূষণ। এতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
রাস্তায় চলাচলের সময় অতিরিক্ত হর্ন ও মাইকের শব্দে অনেককে কানে হাত দিয়ে চলতে হচ্ছে। এমনকি অতিরিক্ত শব্দের কারণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেও সমস্যায় পড়ছেন পথচারী ও ব্যবসায়ীরা।
স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও থানা এলাকাকে নীরব এলাকা ঘোষণা করা হলেও তাড়াইলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এর যথাযথ বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
অকারণে হর্ন বাজানো ও উচ্চ শব্দের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন ব্যবসায়ী, স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, হাসপাতালের রোগী ও চিকিৎসক, মসজিদের মুসল্লি, পথচারী এবং সড়কের পাশের বাসাবাড়ির বাসিন্দারা।
এদিকে উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ডের আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট-বড় ওয়ার্কশপ ও কারখানার মেশিনের বিকট শব্দেও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয়রা। দিন-রাত সমানতালে চলা এসব মেশিনের শব্দে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। পাশাপাশি শিশু ও বয়স্কদের ঘুমেও বিঘ্ন ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের আইন না মানার প্রবণতার পাশাপাশি এর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বাসস্ট্যান্ড ও বাঁকযুক্ত সড়কের মোড়গুলোতে ওভারটেকিং কিংবা বাঁক নেওয়ার সময় অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও ফাঁকা সড়ক পেলেই চালকদের মধ্যে উচ্চ শব্দের হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতাও দেখা যায়।
স্থানীয় পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শব্দের সহনীয় মাত্রা অতিক্রম করে তাড়াইলে প্রতিনিয়ত শব্দদূষণ হচ্ছে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, মাথাব্যথা, মানসিক অস্থিরতাসহ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। অথচ শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও এর প্রয়োগ সম্পর্কে অনেক চালক ও সাধারণ মানুষই অবগত নন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাড়াইলে এ আইনের প্রয়োগও খুব একটা দেখা যায় না।
গতকাল রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে যানজটের মধ্যে অপ্রয়োজনে হর্ন বাজাতে দেখা যায় এক মাইক্রোবাসচালককে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হর্ন না বাজালে গাড়ি সরে না।’ অকারণে হর্ন বাজালে আইন লঙ্ঘন এবং জরিমানার বিধান রয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান।
একইভাবে তাড়াইল থানার সামনের সড়কে হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো সাইফুল মিয়া বলেন, ‘সবাই হর্ন বাজায়, তাই আমিও বাজাই। হর্ন না বাজালে অনেক সময় গাড়ি সরতে চায় না।’
তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অতীশ দাস রাজিব বলেন, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শব্দদূষণের মধ্যে থাকলে মানুষের শ্রবণশক্তি ধীরে ধীরে কমে গিয়ে বধিরতাও হতে পারে। অসহনীয় মাত্রার শব্দ কানে প্রবেশ করলে স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পালস ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। এতে অস্বস্তি, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, খিটখিটে মেজাজ এবং কখনো কখনো নিদ্রাহীনতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত শব্দদূষণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, তাড়াইলের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, অপ্রয়োজনীয় হর্ন ও হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার বন্ধ এবং যানবাহনে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে শব্দদূষণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

রুহুল আমিন, তাড়াইল (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি। জনতার কণ্ঠ.কম 




















