সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পাচারচক্রের ভয়ংকর প্রতারণায় অনিশ্চিত জীবনের পথে অসংখ্য যুবক

লিবিয়ায় গেমঘরে এভাবেই রাখা হয় শ্রমিকদের। বামে গেমঘরের ছবি।

রঙিন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ইতালির পথে রওনা হয়েছিলেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার রাকিব হোসেন স্বাধীন (২৩)। কয়েক মাস চেন্নাই, দুবাই, শ্রীলংকা ও মিশর হয়ে লিবিয়া যান তিনি। এরপর থেকেই তার কোন সন্ধান পায়নি পরিবার।

 

দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে এভাবে নিখোঁজ হয়েছেন উল্লাপাড়া উপজেলার বড়হর ইউনিয়নের ইসলামপুর ভুতগাছা গ্রামের গোলাম কিবরিয়া ফিরোজের ছেলে রাকিব হোসেন স্বাধীন। স্বজনদের দাবী তাকে হত্যা করে ভুমধ্যসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। জীবিত না হলেও লাশ ফিরে পেতে আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন স্বাধীনের বাবা।

 

এদিকে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় একই উপজেলার পূর্নিমাগাঁতি ইউনিয়নের ঘিয়ালা গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ, তার মেয়ে সোনিয়া খাতুন ও মেয়েজামাই মোন্নাফ প্রামানিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদেও স্বাধীনের খোঁজ জানতে পারেনি।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, উল্লাপাড়া উপজেলার বড়হর, হাটিকুমরুল, পূর্ণিমাগাঁতী, কয়ড়া, বাঙালা, পঞ্চক্রোশী ও সলঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তানদের প্রলোভন দেখিয়ে ইতালি পাঠানোর নাম করে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। এ অঞ্চলের শত শত যুবক এমন ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদে মারাত্বক জীবন ঝুঁকিতে রয়েছেন।

 

যেভাবে নিখোঁজ স্বাধীন:

স্বাধীনের বাবা গোলাম কিবরিয়া ফিরোজ বলেন, দালাল আবুল কালাম আজাদের ছেলে সাদ্দাম আগে থেকেই ইতালি রয়েছে। তার ছোট ভাই জাকারিয়ার সঙ্গে আমার ছেলে স্বাধীনের বন্ধুত্ব ছিল। সেই সূত্রে আবুল কালাম তার ছেলের সঙ্গে আমার ছেলেকেও ইতালি পাঠানোর প্রস্তাব দেন। আমি রাজি হলে আমার সঙ্গে কালামের দুই মেয়ের জামাই  ইউনুস আলী ও মোন্নাফ আলীর কথা হয়। এরপর কালামকে আমি ২৫ লাখ টাকা দেই। চলতি বছরের ২২ মে কালামের ছেলে জাকারিয়া ও আমার ছেলে স্বাধীন ইতালির পথে রওয়ানা হয়।

 

প্রথমে ভারতের চেন্নাই, পরে দুবাই হয়ে শ্রীলংকা পৌঁছার পর জাকারিয়াকে আমার ছেলের কাছ থেকে আলাদা করা হয়। এরপর মিশর ও সর্বশেষ লিবিয়া নিয়ে যায় স্বাধীনকে। এর মাঝে স্বাধীন আটক হয়েছে এবং কারাগারে আছে এমন কথা বলে দুই দফায় আরো ১০ লাখ টাকা নেয় কালাম।

 

ফিরোজ বলেন, আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি গত ১২ নভেম্বর ১২২ জনকে একটি ট্রলারে করে লিবিয়া থেকে সাগর পথে ইতালি পাঠানোর চেষ্টা করে দালালরা। কিছুদুর যাওয়ার পর ট্রলারটি আংশিক ডুবে গেলে ট্রলারে থাকা ৯৭ জনকে হত্যা করে সাগরে ভাসিয়ে দেয় তারা। বিষয়টি জানার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, নিহতদের মধ্যে আমার ছেলে স্বাধীনও রয়েছে। বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে মাদারীপুরের ৭ জন গত ১৮ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন। ওইদিন বিমানবন্দরে তাদের কাছে স্বাধীন নিহতের বিষয় নিশ্চিত হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছি।

 

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উল্লাপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুমন মাহমুদ বলেন, নিখোঁজ স্বাধীনের বাবা বাদী হয়ে ৮জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৩/৪জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তারা স্বাধীন কোথায় আছে সে বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এরা মূলত রুট লেবেলের দালাল। এদের উপরে বেশ কয়েক স্তরের দালাল রয়েছে।

 

আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তথ্য উদঘাটন করা সম্ভভ হবে।

 

 

ভুক্তভোগী অপর ব্যক্তির অভিজ্ঞতা:

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক ভুক্তভোগী বলেন, বড়হর ইউনিয়নের গুয়াগাঁতী গ্রামের শফিকুল ইসলামের সঙ্গে ১৯ লাখ টাকায় চুক্তিতে ইতালি যেতে রাজি হই। প্রথমে ১০ লাখ টাকা শফিকুলের স্ত্রীকে দেওয়া হয়। পরে ওমরাহ ভিসার আঁড়ালে আমাকে সৌদি আরব পাঠানো হয়। সেখানে চার দিন থাকার পর মিশর হয়ে লিবিয়ার বেনিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানো হয়। লিবিয়ায় শফিকুল আমাদের সবাইকে তার বাসায় রাখে। ১৫ দিন পর নিয়ে যায় বেনগাতি এলাকায় একটি ঘরে, যাকে তারা ‘গেমঘর’ বলে। ৪০ ফিট দৈর্ঘ্যের সেই ঘরে ১৭০ জন যাত্রীকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। ওজন কমানোর জন্য প্রতিদিন এক বেলা অল্প খাবার দেওয়া হতো, সাত দিন পর পর গোসলের অনুমতি মিলতো। অন্ধকারের মধ্যে এক মাস সেখানে ছিলাম। অসুস্থ্য হলেও চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা ছিল না।

 

তিনি আরও জানান, অবশেষে ভুমধ্যসাগর পারি দিতে আমাদের ১৭০ জনকে একটি স্পিডবোটে তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ইতালিয়ান কোস্টগার্ড অসুস্থ অবস্থায় আমাদের উদ্ধার করে। ইতালি পর্যন্ত পৌঁছাতে তার ১৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, যা পুরোটা দেওয়া হয়েছে উল্লাপাড়ার দালাল শফিকুলের বাড়িতে।

 

গুয়াগাঁতী গ্রামের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শফিকুল আগে গরুর ব্যবসা করতেন। চার বছর আগে ঋণগ্রস্ত হয়ে লিবিয়া গেছে। এখন সে মানুষকে ইতালি পাঠায়। তার গ্রামে মাধ্যমে অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ লিবিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছেছেন বলে জানান অনেকেই।

 

এদিকে উপজেলার রানীনগর গ্রামের দালাল সাদ্দাম দীর্ঘদিন ধরেই শতাধিক যুবককে অবৈধভাবে সাগর পথে ইতালি পাঠিয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। সাদ্দাম এখনো লিবিয়াতেই অবস্থান করছেন।

 

তার মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার পথে বর্তমানে গেমঘরে রয়েছেন কুমারগাঁতী গ্রামের আশিক ও শুভ নামে দুইজন, চৌবিলা গ্রামের ইমাম হোসেন এবং পাটধারী গ্রামের শুভ নামে এক যুবক।

 

সিরাজগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারি পরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, বাংলাদেশ ওভারসীজ এমপ্লয়মেন্ট এন্ড সার্ভিসেস লি. (বইয়েসেল) কিংবা সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ছাড়া অন্য যে কোন উপায়ে ইতালি গমন অবৈধ। বৈধভাবে কাজের ভিসা নিয়ে ইতালি গমনে অবশ্যই বিএমইটি (ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট এন্ড ট্রেনিং) এর ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়।

 

সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সান্তু বলেন, বিদেশে প্রতারণার মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এ বিষয়ে আমরা জনসচেতনতা তৈরি করার পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

 

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি নিজেই নতুন।  আপনি ইউএনওর সঙ্গে কথা বলুন। আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব।

 

75
Created on
আপনার মতামত দিন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে ক্ষমতায় দেখতে চান ?

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পাচারচক্রের ভয়ংকর প্রতারণায় অনিশ্চিত জীবনের পথে অসংখ্য যুবক

আপডেট টাইম : ০৮:৩৬:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫

রঙিন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ইতালির পথে রওনা হয়েছিলেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার রাকিব হোসেন স্বাধীন (২৩)। কয়েক মাস চেন্নাই, দুবাই, শ্রীলংকা ও মিশর হয়ে লিবিয়া যান তিনি। এরপর থেকেই তার কোন সন্ধান পায়নি পরিবার।

 

দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে এভাবে নিখোঁজ হয়েছেন উল্লাপাড়া উপজেলার বড়হর ইউনিয়নের ইসলামপুর ভুতগাছা গ্রামের গোলাম কিবরিয়া ফিরোজের ছেলে রাকিব হোসেন স্বাধীন। স্বজনদের দাবী তাকে হত্যা করে ভুমধ্যসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। জীবিত না হলেও লাশ ফিরে পেতে আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন স্বাধীনের বাবা।

 

এদিকে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় একই উপজেলার পূর্নিমাগাঁতি ইউনিয়নের ঘিয়ালা গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ, তার মেয়ে সোনিয়া খাতুন ও মেয়েজামাই মোন্নাফ প্রামানিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদেও স্বাধীনের খোঁজ জানতে পারেনি।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, উল্লাপাড়া উপজেলার বড়হর, হাটিকুমরুল, পূর্ণিমাগাঁতী, কয়ড়া, বাঙালা, পঞ্চক্রোশী ও সলঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তানদের প্রলোভন দেখিয়ে ইতালি পাঠানোর নাম করে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। এ অঞ্চলের শত শত যুবক এমন ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদে মারাত্বক জীবন ঝুঁকিতে রয়েছেন।

 

যেভাবে নিখোঁজ স্বাধীন:

স্বাধীনের বাবা গোলাম কিবরিয়া ফিরোজ বলেন, দালাল আবুল কালাম আজাদের ছেলে সাদ্দাম আগে থেকেই ইতালি রয়েছে। তার ছোট ভাই জাকারিয়ার সঙ্গে আমার ছেলে স্বাধীনের বন্ধুত্ব ছিল। সেই সূত্রে আবুল কালাম তার ছেলের সঙ্গে আমার ছেলেকেও ইতালি পাঠানোর প্রস্তাব দেন। আমি রাজি হলে আমার সঙ্গে কালামের দুই মেয়ের জামাই  ইউনুস আলী ও মোন্নাফ আলীর কথা হয়। এরপর কালামকে আমি ২৫ লাখ টাকা দেই। চলতি বছরের ২২ মে কালামের ছেলে জাকারিয়া ও আমার ছেলে স্বাধীন ইতালির পথে রওয়ানা হয়।

 

প্রথমে ভারতের চেন্নাই, পরে দুবাই হয়ে শ্রীলংকা পৌঁছার পর জাকারিয়াকে আমার ছেলের কাছ থেকে আলাদা করা হয়। এরপর মিশর ও সর্বশেষ লিবিয়া নিয়ে যায় স্বাধীনকে। এর মাঝে স্বাধীন আটক হয়েছে এবং কারাগারে আছে এমন কথা বলে দুই দফায় আরো ১০ লাখ টাকা নেয় কালাম।

 

ফিরোজ বলেন, আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি গত ১২ নভেম্বর ১২২ জনকে একটি ট্রলারে করে লিবিয়া থেকে সাগর পথে ইতালি পাঠানোর চেষ্টা করে দালালরা। কিছুদুর যাওয়ার পর ট্রলারটি আংশিক ডুবে গেলে ট্রলারে থাকা ৯৭ জনকে হত্যা করে সাগরে ভাসিয়ে দেয় তারা। বিষয়টি জানার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, নিহতদের মধ্যে আমার ছেলে স্বাধীনও রয়েছে। বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে মাদারীপুরের ৭ জন গত ১৮ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন। ওইদিন বিমানবন্দরে তাদের কাছে স্বাধীন নিহতের বিষয় নিশ্চিত হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছি।

 

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উল্লাপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুমন মাহমুদ বলেন, নিখোঁজ স্বাধীনের বাবা বাদী হয়ে ৮জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৩/৪জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তারা স্বাধীন কোথায় আছে সে বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এরা মূলত রুট লেবেলের দালাল। এদের উপরে বেশ কয়েক স্তরের দালাল রয়েছে।

 

আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তথ্য উদঘাটন করা সম্ভভ হবে।

 

 

ভুক্তভোগী অপর ব্যক্তির অভিজ্ঞতা:

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক ভুক্তভোগী বলেন, বড়হর ইউনিয়নের গুয়াগাঁতী গ্রামের শফিকুল ইসলামের সঙ্গে ১৯ লাখ টাকায় চুক্তিতে ইতালি যেতে রাজি হই। প্রথমে ১০ লাখ টাকা শফিকুলের স্ত্রীকে দেওয়া হয়। পরে ওমরাহ ভিসার আঁড়ালে আমাকে সৌদি আরব পাঠানো হয়। সেখানে চার দিন থাকার পর মিশর হয়ে লিবিয়ার বেনিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানো হয়। লিবিয়ায় শফিকুল আমাদের সবাইকে তার বাসায় রাখে। ১৫ দিন পর নিয়ে যায় বেনগাতি এলাকায় একটি ঘরে, যাকে তারা ‘গেমঘর’ বলে। ৪০ ফিট দৈর্ঘ্যের সেই ঘরে ১৭০ জন যাত্রীকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। ওজন কমানোর জন্য প্রতিদিন এক বেলা অল্প খাবার দেওয়া হতো, সাত দিন পর পর গোসলের অনুমতি মিলতো। অন্ধকারের মধ্যে এক মাস সেখানে ছিলাম। অসুস্থ্য হলেও চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা ছিল না।

 

তিনি আরও জানান, অবশেষে ভুমধ্যসাগর পারি দিতে আমাদের ১৭০ জনকে একটি স্পিডবোটে তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ইতালিয়ান কোস্টগার্ড অসুস্থ অবস্থায় আমাদের উদ্ধার করে। ইতালি পর্যন্ত পৌঁছাতে তার ১৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, যা পুরোটা দেওয়া হয়েছে উল্লাপাড়ার দালাল শফিকুলের বাড়িতে।

 

গুয়াগাঁতী গ্রামের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শফিকুল আগে গরুর ব্যবসা করতেন। চার বছর আগে ঋণগ্রস্ত হয়ে লিবিয়া গেছে। এখন সে মানুষকে ইতালি পাঠায়। তার গ্রামে মাধ্যমে অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ লিবিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছেছেন বলে জানান অনেকেই।

 

এদিকে উপজেলার রানীনগর গ্রামের দালাল সাদ্দাম দীর্ঘদিন ধরেই শতাধিক যুবককে অবৈধভাবে সাগর পথে ইতালি পাঠিয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। সাদ্দাম এখনো লিবিয়াতেই অবস্থান করছেন।

 

তার মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার পথে বর্তমানে গেমঘরে রয়েছেন কুমারগাঁতী গ্রামের আশিক ও শুভ নামে দুইজন, চৌবিলা গ্রামের ইমাম হোসেন এবং পাটধারী গ্রামের শুভ নামে এক যুবক।

 

সিরাজগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারি পরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, বাংলাদেশ ওভারসীজ এমপ্লয়মেন্ট এন্ড সার্ভিসেস লি. (বইয়েসেল) কিংবা সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ছাড়া অন্য যে কোন উপায়ে ইতালি গমন অবৈধ। বৈধভাবে কাজের ভিসা নিয়ে ইতালি গমনে অবশ্যই বিএমইটি (ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট এন্ড ট্রেনিং) এর ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়।

 

সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সান্তু বলেন, বিদেশে প্রতারণার মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এ বিষয়ে আমরা জনসচেতনতা তৈরি করার পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

 

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি নিজেই নতুন।  আপনি ইউএনওর সঙ্গে কথা বলুন। আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব।