সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তিন বছর ধরে চলছে মৎস্য আড়ত: প্রতিদিন লেনদেন দুই কোটি

সরকারি পেরিফেরি ছাড়াই তিন বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার কুতুবের চর মৎস্য আড়ত। আড়তটি থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হলেও সরকারের ঘরে এক কানাকড়ি রাজস্বও জমা হচ্ছে না। এদিকে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক ও সলঙ্গা আঞ্চলিক সড়কের পাশেই গড়ে ওঠা মৎস্য আড়তটি নানা দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানজট, দুর্ঘটনা আর দুর্গন্ধের শিকার ভুক্তভোগীরা আড়তটি উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন।

 

 

 

সম্প্রতি জনদুর্ভোগ লাঘবে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকার সচিব ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার বরাবর লিখিত আবেদনে আড়তটি উচ্ছেদের দাবি জানানো হয়েছে।

 

 

 

সরেজমিনে অভিযোগকারী ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন বছর আগে পতিত আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুল হাই, ধুবিল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান রাসেল, আব্দুল মোন্নাফ, মাহবুব, সুলতান মেম্বর, লঙ্কেশ্বর হালদার, আব্দুল হান্নান, হাফিজুল ইসলাম, সাধন হালদার, কালা হালদার, শোভন ও নুরুসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা এই আড়তটি গড়ে তোলে। আড়তটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে।

 

 

 

তিন একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত আড়তটিতে ১৩৫-১৪০টি কাঁটা বসানো হয়। প্রতিটি কাটা থেকে ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। ৮-৯টি বরফকল স্থাপনে প্রতিটি থেকে ১৫-২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এককালীন প্রায় ৬-৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই চক্রটি।

 

 

 

২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও আব্দুল হাই ও মিজানুর রহমান রাসেল গং এই আড়তটি পরিচালনা করে। পরবর্তীতে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর উল্লেখিত আওয়ামী লীগ নেতারা অন্তরালে থেকে ফজলার রহমান ও আল-আমিন নামে দুজনকে সভাপতি-সেক্রেটারি বানিয়ে মূলত তারাই আড়তটি পরিচালনা করছে।

 

 

 

অভিযোগকারী মো. আক্তারুজ্জামান, ইসমাইল হোসেন, নূর মোহাম্মদ, লাভলু তালুকদার ও আমজাদ হোসেন সহ স্থানীয় অনেকেই জানান, মহাসড়ক ও সলঙ্গা আঞ্চলিক সড়কের পাশে জনবহুল এলাকায় এই আড়ত বসানোর ফলে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

 

 

 

নজরুল ইসলাম বলেন, সলঙ্গা ডিগ্রি কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীরা যাতায়াত করে। ঐতিহ্যবাহী সলঙ্গা হাটেও এ পথেই যাতায়াত করতে হয়। রাস্তার পাশে আড়তের কারণে অসংখ্য শ্যালো ইঞ্জিন চালিত নসিমন, ট্রাক-পিকআপ, দুই ধারে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ফলে নিয়মিত যানজট লেগে থাকে রাস্তায়। এছাড়া মাঝে মধ্যেই ছোটবড় দুর্ঘটনা ঘটে। রাস্তাটির বিভিন্ন স্থানে ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। অপরদিকে মৎস্য আড়তের বর্জ্যে সারাদিনই ভয়াবহ দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী।

 

 

সলঙ্গা ইসলামিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতেমা, তাবাসসুম ও সাব্বির, জানায়, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি মাছের গাড়ী রাখা হয়। ফলে স্কুলে যেতে প্রতিদিনই যানজটে পড়তে হয়। অনেকদিন সঠিক সময়ে ক্লাসে ঢুকতে পারি না।

 

 

 

জাকারিয়া হোসেন নামে এক ব্যক্তি বলেন, সলঙ্গা বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গাড়ুদহ নদীটিও মৎস্য আড়তের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে। নদীর পানিতে মানুষ কিংবা গবাদিপশুকেও গোসল করানো যায় না।

 

 

 

অভিযোগকারীরা আরও বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে আড়তটিকে সরকারি পেরিফেরিভুক্ত না করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে লুটপাট করে খাচ্ছে এই চক্রটি। প্রতিদিনই মাছের ট্রাক প্রতি ৫শ ও ভুডভুডি বা অটোভ্যান প্রতি ২শ টাকা করে খাজনা আদায় হচ্ছে। কাটা প্রতিও নেওয়া হচ্ছে দুই হাজার করে টাকা। মৎস্য সমবায় সমিতির নাম দিয়ে এভাবে প্রতি মাসে ৩০-৩২ লাখ টাকা আদায় করে পকেটে পুড়ছে চক্রটি।

 

 

 

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুতুবের চর মৎস্য আড়ত কমিটির সভাপতি ফজলার রহমান ও সাধারণ সম্পাদক নুরনবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোন কথা বলতে রাজি হননি।

 

 

 

এসব বিষয় সাংবাদিকরা আড়তে গিয়ে কথা বলতে চাইলে সেখানকার মৎস্য সমবায় সমিতির লোকজন বাকবিতন্ডা শুরু করে।

 

 

 

রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে এলাকাবাসী কোন অভিযোগ দেয়নি। তবে এটি যেহেতু জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা সরেজমিনে গিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আড়তটি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট চলমান রয়েছে। এ কারণে পেরিফেরির বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি না।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রেস ব্রিফিংয়ে মুখোমুখি ফাইটাররা, প্রশ্নোত্তরের পাশাপাশি দেখালেন বক্সিং পোজ

রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তিন বছর ধরে চলছে মৎস্য আড়ত: প্রতিদিন লেনদেন দুই কোটি

আপডেট টাইম : ০৬:১৯:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

সরকারি পেরিফেরি ছাড়াই তিন বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার কুতুবের চর মৎস্য আড়ত। আড়তটি থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হলেও সরকারের ঘরে এক কানাকড়ি রাজস্বও জমা হচ্ছে না। এদিকে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক ও সলঙ্গা আঞ্চলিক সড়কের পাশেই গড়ে ওঠা মৎস্য আড়তটি নানা দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানজট, দুর্ঘটনা আর দুর্গন্ধের শিকার ভুক্তভোগীরা আড়তটি উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন।

 

 

 

সম্প্রতি জনদুর্ভোগ লাঘবে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকার সচিব ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার বরাবর লিখিত আবেদনে আড়তটি উচ্ছেদের দাবি জানানো হয়েছে।

 

 

 

সরেজমিনে অভিযোগকারী ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন বছর আগে পতিত আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুল হাই, ধুবিল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান রাসেল, আব্দুল মোন্নাফ, মাহবুব, সুলতান মেম্বর, লঙ্কেশ্বর হালদার, আব্দুল হান্নান, হাফিজুল ইসলাম, সাধন হালদার, কালা হালদার, শোভন ও নুরুসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা এই আড়তটি গড়ে তোলে। আড়তটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে।

 

 

 

তিন একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত আড়তটিতে ১৩৫-১৪০টি কাঁটা বসানো হয়। প্রতিটি কাটা থেকে ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। ৮-৯টি বরফকল স্থাপনে প্রতিটি থেকে ১৫-২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এককালীন প্রায় ৬-৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই চক্রটি।

 

 

 

২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও আব্দুল হাই ও মিজানুর রহমান রাসেল গং এই আড়তটি পরিচালনা করে। পরবর্তীতে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর উল্লেখিত আওয়ামী লীগ নেতারা অন্তরালে থেকে ফজলার রহমান ও আল-আমিন নামে দুজনকে সভাপতি-সেক্রেটারি বানিয়ে মূলত তারাই আড়তটি পরিচালনা করছে।

 

 

 

অভিযোগকারী মো. আক্তারুজ্জামান, ইসমাইল হোসেন, নূর মোহাম্মদ, লাভলু তালুকদার ও আমজাদ হোসেন সহ স্থানীয় অনেকেই জানান, মহাসড়ক ও সলঙ্গা আঞ্চলিক সড়কের পাশে জনবহুল এলাকায় এই আড়ত বসানোর ফলে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

 

 

 

নজরুল ইসলাম বলেন, সলঙ্গা ডিগ্রি কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীরা যাতায়াত করে। ঐতিহ্যবাহী সলঙ্গা হাটেও এ পথেই যাতায়াত করতে হয়। রাস্তার পাশে আড়তের কারণে অসংখ্য শ্যালো ইঞ্জিন চালিত নসিমন, ট্রাক-পিকআপ, দুই ধারে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ফলে নিয়মিত যানজট লেগে থাকে রাস্তায়। এছাড়া মাঝে মধ্যেই ছোটবড় দুর্ঘটনা ঘটে। রাস্তাটির বিভিন্ন স্থানে ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। অপরদিকে মৎস্য আড়তের বর্জ্যে সারাদিনই ভয়াবহ দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী।

 

 

সলঙ্গা ইসলামিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতেমা, তাবাসসুম ও সাব্বির, জানায়, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি মাছের গাড়ী রাখা হয়। ফলে স্কুলে যেতে প্রতিদিনই যানজটে পড়তে হয়। অনেকদিন সঠিক সময়ে ক্লাসে ঢুকতে পারি না।

 

 

 

জাকারিয়া হোসেন নামে এক ব্যক্তি বলেন, সলঙ্গা বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গাড়ুদহ নদীটিও মৎস্য আড়তের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে। নদীর পানিতে মানুষ কিংবা গবাদিপশুকেও গোসল করানো যায় না।

 

 

 

অভিযোগকারীরা আরও বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে আড়তটিকে সরকারি পেরিফেরিভুক্ত না করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে লুটপাট করে খাচ্ছে এই চক্রটি। প্রতিদিনই মাছের ট্রাক প্রতি ৫শ ও ভুডভুডি বা অটোভ্যান প্রতি ২শ টাকা করে খাজনা আদায় হচ্ছে। কাটা প্রতিও নেওয়া হচ্ছে দুই হাজার করে টাকা। মৎস্য সমবায় সমিতির নাম দিয়ে এভাবে প্রতি মাসে ৩০-৩২ লাখ টাকা আদায় করে পকেটে পুড়ছে চক্রটি।

 

 

 

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুতুবের চর মৎস্য আড়ত কমিটির সভাপতি ফজলার রহমান ও সাধারণ সম্পাদক নুরনবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোন কথা বলতে রাজি হননি।

 

 

 

এসব বিষয় সাংবাদিকরা আড়তে গিয়ে কথা বলতে চাইলে সেখানকার মৎস্য সমবায় সমিতির লোকজন বাকবিতন্ডা শুরু করে।

 

 

 

রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে এলাকাবাসী কোন অভিযোগ দেয়নি। তবে এটি যেহেতু জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা সরেজমিনে গিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আড়তটি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট চলমান রয়েছে। এ কারণে পেরিফেরির বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি না।