নওগাঁর রাণীনগরে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানিসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে রফিকুল ইসলাম নামের এক সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে। খারিজের জন্য অন্যকে ঘুষ দিয়েছে এমন সন্দেহ থেকে তিনি সেবাগ্রহীতাকে হয়রানি ও হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ। সেই সাথে মানসিক চাপে ফেলে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ ওঠা রফিকুল ইসলাম উপজেলা ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন।
সম্প্রতি উপজেলার ভান্ডারপুর এলাকার গুঠুনিয়া গোবিন্দপুর গ্রামের উত্তম সাহা নামের এক সেবাগ্রহীতার সাথে এমনই ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার (৮জানুয়ারি) উপজেলা ভূমি অফিসে উত্তম সাহাকে মানসিক চাপে ফেলে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠে। ওই দিন খারিজ কেসের শুনাতিতে আসার পর স্বাক্ষর নেওয়ার ব্যবস্থা করেন ওই সার্ভেয়ার। এঘটনায় রোববার (১১জানুয়ারি) ভুক্তভোগী উত্তম সাহার পক্ষে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি প্রতিবাদ জানাতে আসলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাবিলা ইয়াসমিনের হস্তক্ষেপে বিষয়টি আর বেশি দুর এগোয়নি এবং প্রাথমিক সমাধান হয়। এবং তাঁর আন্তরিক সহযোগিতায় উত্তম সাহার ৪৬৯২ নং কেসের আবেদনের খারিজ পাস করে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে উপজেলার কামতা এলাকার মুসা মাঝি নামের এক সেবাগ্রহীতাকে মাসের পর মাস হয়রানির অভিযোগ উঠে সার্ভেয়ার রফিকুলের বিরুদ্ধে। মুসা গত ৪-৫ মাস আগে শিবলী নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে অনলাইনে আবেদন করে জমা দিলে তার আবেদন বিভিন্ন অজুহাতে বাতিল করা হয়। পরে সঠিক ভাবে দিলেও ৩২২৫ নং কেসের আবেদন বাতিল করে দেওয়া হয়। এরপর আবারও আবেদন জমা দেন মুসা। অবশেষে ৪২৪৫ নং কেসের শুনানি গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর হলে আজও মুসার খারিজ সম্পন্ন হয়নি।
মুল কথা সরাসরি রফিকুলের সাথে যোগাযোগ না করে অন্যের দোকানে অনলাইন করে আবেদন জমা দিলেই হয়রানির সম্মুখীন হতে হয় বলে একাধিক ভুক্তভোগীসহ স্থানীয়দের অভিযোগ।
ভুক্তভোগী উত্তম কুমার সাহা বলেন, আমি খারিজের শুনানির জন্য গিয়েছিলাম ভূমি অফিসে। এরপর এতোবড় খারিজের জন্য দালালকে কতো টাকা দিয়েছি জানতে চায় রফিকুল। যদি না বলি, তাহলে এই খারিজ পাস করবে না। সে ইচ্ছে করলে বাতিল করে দিবে। এছাড়া বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিয়ে মানসিক চাপে ফেলে। একসময় বলতে বাধ্য হই শিবলীর কাছ অনলাইন আবেদন ও খতিয়ান উত্তোলন বাবদ দুই হাজার টাকা প্রদান করি।
এছাড়া শিবলী আমাকে (খাজনা, ডিসিআর ও অনলাইন) বাবদ ৬-৮ হাজার খরচ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিল। এটা বলা মাত্রই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আমরা অফিসে কাজ করবো আর অন্যকে টাকা দিবেন? বলেই সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে বলে। আমি না চাইলে তিনি বিভিন্ন কথা বলে ৮ হাজার টাকা দিয়েছি এই মর্মে স্বাক্ষর নিতে চায়।
তিনি আরও বলেন, একসময় এসিল্যান্ড স্যারের কাছে নিয়ে যাওয়া মাত্রই আমাকে দেখে তারাতাড়ি ছেড়ে দিতে বলেন তিনি। তখন সার্ভেয়ার দালালকে ৮হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছি এমন কথা বলে বসে। অবশেষে শিবলীর বিরুদ্ধে লেখা কাগজে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হই।
আরেক ভুক্তভোগী মুসা মাঝি বলেন, আমি শিবলীর ওখান থেকে অনলাইন করে ভূমি অফিসে আবেদন জমা দিয়েছিলাম প্রায় ৪-৫মাস আগে। আবেদন এলোমেলো বলে বাতিল করে দেওয়া হয়। এরপর আবারও আবেদন জমা দিলে সেটিও বিভিন্ন অজুহাতে বাতিল করে দেন সার্ভেয়ার। পরে আবারও আবেদন করেছি। সেটার শুনানি হয়ে গেছে। আজ দিব কাল দিব বলে আজও খারিজ করে দিচ্ছে না রফিকুল। তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ না করার কারণেই তিনি এভাবে হয়রানি করে থাকেন।
এদিকে অফিসে সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে লিখিত কোনো কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া যায় কিনা সেটা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। অপরদিকে সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে তদন্ত করার দাবি জনিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগীসহ অনেকে। আর সবশেষে দালাল মুক্ত থাকুক ভুমি অফিস এমনটাই প্রত্যাশা সচেতন মহলসহ স্থানীয়দের।
এদিকে জানা যায়, এই উত্তম সাহার খারিজের সুপারিশ করতে গিয়েছিল হারুন নামের এক ব্যক্তি।
কেন গিয়েছিল জানতে চাইলে হারুন নামের ওই ব্যক্তি বলেন, উত্তম সাহা একজন কন্যা দায়গ্রস্ত ব্যক্তি। এলাকার এক জনপ্রতিনিধির কারণে আমি ভুমি অফিসে গিয়ে খারিজটি দ্রুত করে দেওয়ার জন্য বলে আসি। পরবর্তীতে শুনতে পাই সার্ভেয়ারের সাথে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সেটার একটা সমাধান হয়েছে।
অভিযোগ ওঠা শিবলী নামের ব্যক্তি বলেন, উত্তম সাহা আমার বন্ধু। তাকে আমি অনলাইনসহ বিভিন্ন কাজ করে দিয়েছি। আর সেটা জমা দিয়ে খারিজ করতে চেয়েছিল উত্তম সাহা। মূলত আমার কাছে অনলাইন করার কারণেই ক্ষোভ থেকে রফিকুল সার্ভেয়ার উত্তমের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। এবং আমার বিরুদ্ধে জোর করে অভিযোগ পত্রে স্বাক্ষর নিয়েছে। এর মূল কারণ আমার কাছে না এসে সরাসরি রফিকুলের কাছে গেলে কিছুই হতো না। এছাড়া মুসা মাঝি নামের এক ব্যক্তিকেও হয়রানির উপর রেখেছে এই রফিকুল। মুসার তিন দফা আবেদন বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। সঠিক ভাবে আবেদন করার পরও বিভিন্ন অজুহাতে বাতিল করে দেয় সার্ভেয়ার রফিকুল।
জানতে চাইলে দায়সারা জবাব দেন সার্ভেয়ার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, উত্তম সাহা কন্যা দায়গ্রস্ত হওয়ায় ৮হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে সে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এটা স্যারের সামনে মুখ ফসকে বের হওয়ার কারণে তার কাছ থেকে লিখিত অভিযোগে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এখানে জোর বা হেনস্তা করার কোনো ঘটনা ঘটেনি। আর মুসার সাথে আমার তেমন পরিচয় নেই। সেবাগ্রহীতাকে হয়রানি ও হেনস্তা করার অভিযোগ মিথ্যে।
জানতে চাইলে সার্ভেয়ারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানালেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাবিলা ইয়াসমিন। আর সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে নেওয়া অভিযোগের বিষয়ে উর্দ্ধতন স্যারের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়া নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে ব্যস্ত থাকায় একটু ধীরগতি হচ্ছে।

রাণীনগর( নওগাঁ) প্রতিনিধি । জনতার কণ্ঠ.কম 




















