‘আইফোন ডুও’ বিক্রির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ফোল্ডেবল ফোনের বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ অ্যাপলের দখলে যেতে পারে বলে ধারণা করেছে ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশন (আইডিসি)। পাশাপাশি এই ফোন বিক্রি থেকে তৈরি হওয়া মোট বাজারমূল্যের অর্ধেকেরও বেশি পেতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
গত অর্থবছরে আইফোন থেকে অ্যাপলের আয় হয়েছে ২০৯.৬ বিলিয়ন ডলার। কোম্পানিটির মোট বিক্রির অর্ধেকেরও বেশি এসেছে আইফোন থেকে।
বিশ্লেষক পাওলো পেসকাতো বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, নতুন এই পণ্যের মাধ্যমে অ্যাপল প্রিমিয়াম পণ্যের একটি নতুন বাজার তৈরি করেছে। একইসঙ্গে আয়ের নতুন পথ খুলেছে এবং আইফোন ব্যবসায় নতুন গতি এনেছে।
তবে পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠান চলার সময় অ্যাপলের শেয়ারের দাম ১% কমে যায়। অনুষ্ঠান শেষে পতনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১.৮%।
এর আগে, বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশন (আইডিসি) পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি ফোল্ডেবল আইফোন বিক্রি হতে পারে। এতে অ্যাপলের আয় ৪৫.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে।
আইডিসির গবেষণা পরিচালক নাবিলা পোপাল ম্যাশেবলকে বলেন, ‘ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে অ্যাপলের প্রবেশ শুধু এই খাতের প্রবৃদ্ধিই বাড়াবে না, পুরো বাজারের গতিপথও বদলে দিতে পারে।’
আইডিসির হিসাবে, বিশ্বব্যাপী ফোল্ডেবল ফোনের বাজারের প্রায় ৪০% অ্যাপলের দখলে যেতে পারে। পাশাপাশি এই ফোন বিক্রি থেকে মোট বাজারমূল্যের অর্ধেকেরও বেশি পেতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
আইফোন ডুও বাজারে আসার পর ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে দীর্ঘদিনের দুই বড় প্রতিদ্বন্দ্বী স্যামসাং ও হুয়াওয়ের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামবে অ্যাপল।
এর আগে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে ‘আইফোন ডুও’ নামে ফোল্ডেবল আইফোন উন্মোচন করে অ্যাপল। ক্যালিফোর্নিয়ার কুপারটিনোয় অ্যাপলের সদর দপ্তরের স্টিভ জবস থিয়েটারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এটি উন্মোচন করা হয়।
অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী (সিইও) হিসেবে প্রথমবারের মতো পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে নতুন এই ফোনের ঘোষণা দেন জন টার্নাস।
সরাসরি সম্প্রচারকৃত অনুষ্ঠানে টার্নাস বলেন, ‘অন্যরা এমন ফোল্ডেবল ফোন তৈরি করেছে, যেগুলো পাশাপাশি জোড়া লাগানো দুটি ফোনের মতোই অস্বস্তিকর মনে হয়। বড় ডিসপ্লের এমন একটি ডিভাইস তৈরি করাই অ্যাপলের লক্ষ্য, যা ব্যবহারকারীদের আইপ্যাডের মতোই স্বাভাবিক ও সহজাত অনুভূতি দেবে।’
‘আইফোন ডুও’র নকশা অনেকটা পাসপোর্টের মতো। এর চারপাশের প্রান্ত গোলাকার। ভাঁজ খুললে সামনে পাওয়া যাবে ৭.৬ ইঞ্চির, অর্থাৎ ১৯ সেন্টিমিটারের বড় পর্দা। অ্যাপলের দাবি, পুরোপুরি খোলা অবস্থায় এটিই তাদের সবচেয়ে পাতলা আইফোন।
ফোনটির নকশায় রয়েছে বিশেষভাবে তৈরি হিঞ্জ, একই অনুপাতের দুটি পর্দা এবং নতুন টাইটানিয়ামের বডি। টার্নাসের ভাষ্য, ‘এটি একেবারেই নতুন, আবার একইসঙ্গে বেশ পরিচিত। আকারে এটি আপনার পাসপোর্টের কাছাকাছি। হাতে ধরতে পরিচিত লাগে এবং এক হাতেও আরামে ব্যবহার করা যায়।’
আইফোন ডুওতে ব্যবহার করা হয়েছে ২ ন্যানোমিটারের ‘এ২০ প্রো চিপ’। এতে রয়েছে ৬ কোরের সিপিইউ, ৭ কোরের জিপিইউ এবং দুটি ১৬ কোরের নিউরাল ইঞ্জিন। ফোনটি দীর্ঘ সময় ব্যবহারের সময় যাতে অতিরিক্ত গরম না হয়, সেজন্য দেওয়া হয়েছে বিশেষ ভ্যাপার-চেম্বার কুলিং ব্যবস্থা।
অ্যাপলের দাবি, ফলে দীর্ঘ সময় কাজ করার ক্ষেত্রে আইফোন ১৭ প্রোর তুলনায় আইফোন ডুও সর্বোচ্চ ৩৫% বেশি গতিতে চলতে পারবে। এতে অ্যাপলের নতুন ‘সি২ সেলুলার মডেম চিপ’ও রয়েছে। ওয়্যারলেস ডেটা সংযোগের ক্ষেত্রে কোয়ালকমের চিপের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই মডেম তৈরি করেছে অ্যাপল।
ফোল্ডেবল নকশার সুবিধা কাজে লাগিয়ে আইওএস ২৭-এ বেশ কিছু নতুন মাল্টিটাস্কিং সুবিধাও রয়েছে। ‘স্প্লিট ভিউ’ দিয়ে পাশাপাশি দুটি অ্যাপ চালানো যাবে। একই অ্যাপের দুটি উইন্ডো একসঙ্গে খোলার সুযোগও থাকছে।
নিয়মিত ব্যবহৃত দুটি অ্যাপ একসঙ্গে সংরক্ষণ করা যাবে। আবার একটি অ্যাপ ব্যবহার করার সময়ও এআই সিরির সঙ্গে কথা বলা যাবে। বড় ফোল্ডেবল পর্দার সঙ্গে মানিয়ে নিতে নেটফ্লিক্স, জুম ও স্ল্যাকের মতো অ্যাপগুলোও কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছে অ্যাপল।
আইফোন ডুওতে রয়েছে ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন মেইন ক্যামেরা। সঙ্গে থাকছে ২x অপটিক্যাল-মানের টেলিফটো সুবিধা এবং ৪৮ মেগাপিক্সেলের আল্ট্রা-ওয়াইড ক্যামেরা।
পেছনের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার সময় বাইরের পর্দায় ছবির প্রিভিউ দেখা যাবে। ‘ডুও প্রিভিউ’ সুবিধার কারণে ক্যামেরার সামনে থাকা ব্যক্তিরাও ছবি তোলার সময় নিজেদের অবস্থান দেখে নিতে পারবেন। ভিডিওর ক্ষেত্রে ডলবি ভিশনে সর্বোচ্চ ১২০ ফ্রেম প্রতি সেকেন্ডে ৪কে ভিডিও ধারণ করা যাবে।
আইফোন ডুওতে দুই পাশে দুটি ব্যাটারি রাখা হয়েছে। অ্যাপলের হিসাবে, ভেতরের পর্দা ব্যবহার করে টানা সর্বোচ্চ ৩১ ঘণ্টা ভিডিও দেখা যাবে। শুধু বাইরের পর্দা ব্যবহার করলে এই সময় ৪৪ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে।
দুই পর্দা সমানভাবে ব্যবহার করলে স্বাভাবিক ব্যবহারে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা ব্যাটারি ব্যাকআপ পাওয়া যাবে। তারযুক্ত চার্জিংয়ে প্রায় ২০ মিনিটেই ব্যাটারি ৫০% পর্যন্ত চার্জ করা যাবে।
ফোনটিতে বিশ্বজুড়ে শুধু ই-সিম ব্যবহারের সুবিধা থাকবে। ফলে এতে প্রচলিত ফিজিক্যাল সিম কার্ড ব্যবহার করা যাবে না। সংযোগের জন্য রয়েছে অ্যাপলের এন-১ নেটওয়ার্কিং চিপ। এটি ওয়াই-ফাই-৭, ব্লুটুথ-৬ ও থ্রেড সমর্থন করবে।
আইফোন ডুও পাওয়া যাবে ‘স্টার হোয়াইট’ ও ‘নাইট স্কাই’- দুই রঙে। স্টোরেজের ক্ষেত্রে থাকছে ২৫৬ জিবি, ৫১২ জিবি, ১ টেরাবাইট ও ২ টেরাবাইটের সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্রে ফোনটির দাম শুরু হবে ১ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে।
১৬ অক্টোবর থেকে আইফোন ডুওর প্রি-অর্ডার নেওয়া হবে। ২৩ অক্টোবর থেকে ৭০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে বিক্রি শুরু হবে। ফোনটিতে থাকবে আইওএস ২৭.১।
আইফোনকে ব্যক্তিগত এআই ব্যবহারের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছেন টার্নাস। পাশাপাশি ব্যবহারকারীর তথ্যের গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে তার বক্তব্যে।
টার্নাস জানান, ব্যবহারকারীর তথ্য যখন আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখন আস্থারও একটি সীমা তৈরি হয়। এ কারণে যতটা সম্ভব অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স সরাসরি ডিভাইসেই কাজ করে বলে জানান তিনি।
অ্যাপলের এআই পণ্য বিভাগের দায়িত্বে থাকা লিলিয়ান রিনকন নতুন সিরির বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাজারে আসার সময়ই নতুন সিরি ৩ লাখ অ্যাপের সঙ্গে কাজ করতে পারবে। চলতি বছরের শুরুতে গুগল থেকে অ্যাপলে যোগ দেন রিনকন।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 





















One thought on “ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে ৪০% দখলের সম্ভাবনা আইফোন ডুওর”