ডারউইনে বাংলাদেশ লিখে ফেলল নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের উজ্জ্বল পাতা—টেস্ট ক্রিকেটের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে ৯ উইকেটে হারিয়ে। চার দিনের এই লড়াইয়ে বাংলাদেশ রীতিমতো দাপট দেখিয়ে জিতেছে দলগত নৈপুণ্য দিয়ে। টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া অস্ট্রেলিয়া প্রথম দিনেই ধসে পড়ে ১৯৮ রানে, হাসান মাহমুদ ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রক চরিত্র হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ করে ৪২৬ রান। তানজিদ হাসানের অভিষেক শতরান, অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ আর মেহেদী হাসান মিরাজের লড়াকু ৬৫ রান দলকে বড় লিড এনে দেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ক্যামেরন গ্রিনের সেঞ্চুরিতে লড়াই করলেও মিরাজের ঘূর্ণিতে ২৮৪ রানেই থামতে হয়। ৫৭ রানের লক্ষ্য বাংলাদেশ ছুঁয়ে ফেলে অনায়াসে।
এই জয়ের নায়ক একাধিক। হাসান মাহমুদ ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন। মেহেদী হাসান মিরাজ ব্যাট-বলে সমান দক্ষতা দেখিয়ে নিয়েছেন টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৫তম ফাইফার, যা বিদেশের মাটিতে তৃতীয়। তানজিদ হাসান দ্বিতীয় টেস্টেই পেলেন অভিষেক শতরান। তাইজুল ইসলাম আঙুলের চোট নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ফিরিয়েছেন মারনাস লাবুশেনকে।
জয়ের পর অধিনায়ক শান্তর কণ্ঠে ছিল স্পষ্ট গর্ব, ‘এটাই বাংলাদেশের যে কোনো সংস্করণে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয়।’ পুরো দলকে ম্যাচসেরার কৃতিত্ব দিয়ে শান্ত বলেন, ‘পুরো বাংলাদেশ দলকেই ম্যাচসেরার পুরস্কার দেওয়া উচিত। প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে অবদান রেখেছেন।’ পেস আক্রমণের বিবর্তন নিয়ে তিনি যোগ করেন, ‘পাঁচ বছর আগেও পেসাররা টেস্ট খেলতে চাইতেন না। কিন্তু এখন আমরা অনেক বেশি টেস্ট খেলছি, আর তারা এই সংস্করণটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা খেলতে চান, ভালো করতে চান, বিশ্বমানের হতে চান।’
ম্যাচসেরা হাসান মাহমুদ নিজের সাফল্যের রহস্য জানিয়ে বলেন, ‘ম্যাচের আগে অনুশীলনে প্রতি মুহূর্তে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, ফলাফল নিয়ে না ভেবেই নিজেদের ওপর বিশ্বাস রেখেছি।’ মেহেদী হাসান মিরাজের কণ্ঠেও ছিল একই সুর, ‘আমাদের প্রদর্শনী ছিল দুর্দান্ত। অনেকদিন পর আমরা এখানে এসেছি, দলগতভাবে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছি। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বমানের দল, তাদের হারাতে পারলে দেশের জন্য খুব ভালো হবে—এ বিশ্বাসটাই আমাদের ছিল।’
এই জয়ের মাহাত্ম্য বুঝতে ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের পাতায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের জন্য ভারতকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৩০ বছর, ১২ টেস্ট আর তিনটি সিরিজ ধরে। পাকিস্তানের লেগেছিল ১২ বছর, ৭ টেস্ট। শ্রীলঙ্কা তো সাত সিরিজে ১৫ টেস্ট খেলেও কখনো জিততে পারেনি। সেখানে বাংলাদেশ মাত্র তৃতীয় টেস্টেই, ২৩ বছরের বিরতির পর ফিরে এসে জিতল। ইংল্যান্ডের পর ইতিহাসের দ্রুততম সফরকারী দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়া জয়ের কীর্তি গড়ল।
অস্ট্রেলিয়া শিবিরে ছিল হতাশা আর আত্মজিজ্ঞাসা। অধিনায়ক প্যাট কামিন্স অকপটে স্বীকার করেন হারের কারণ, ‘আমাদের প্রস্তুতি একদম ঠিকঠাক ছিল বলেই মনে করি, তাই কোনো অজুহাত নেই। ওরা (বাংলাদেশ) সত্যিই দারুণ খেলেছে। প্রথম দিনের উইকেটে কিছুটা সহায়তা ছিল; কিন্তু আমাদের আরেকটু লম্বা সময় ব্যাট করার পথ খুঁজতে হতো, বল হাতেও আমরা প্রভাব ফেলতে পারিনি।’ জশ হ্যাজলউডের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘জশ গত কয়েক বছর চোট নিয়ে ভুগেছে; কিন্তু ও সবচেয়ে পরিশ্রমী ক্রিকেটারদের একজন, এই ম্যাচেও নিজের মান দেখিয়েছে, ৬টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়েছে।’ এই ইনিংসেই হ্যাজলউড লাল বলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্পর্শ করেন ৩০০ উইকেটের মাইলফলক। চতুর্থ দিন শুরুর আগে সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং মন্তব্য করেন, ‘দ্বিতীয় টেস্টের আগে অস্ট্রেলিয়া দলে পরিবর্তন অনিবার্য।’ দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে ২২ আগস্ট ম্যাকেতে, যেখানে অস্ট্রেলিয়া বদলা নিতে মরিয়া থাকবে।

ক্রীড়া ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম। 






















