সিরাজগঞ্জ , বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৮১৫ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে, বাড়তে পারে গুড় উৎপাদন

রোগ-পোকার আক্রমণেও সিরাজগঞ্জে আখের বাম্পার ফলনের আশা

মাঠজুড়ে সবুজ আখের সমারোহ। কোথাও কোমরসমান, কোথাও তারও বেশি উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আখের গাছ। ভালো ফলনের আশায় দিন গুনছেন সিরাজগঞ্জের কৃষকরা। তবে এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকায় মিলিবাগ, হোয়াইট ফ্লাই ও ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমণ দেখা দেওয়ায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

 

 

 

তবে রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণে কৃষকদের তৎপরতা এবং কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে জেলায় আখের ভালো ফলন এবং এর সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী গুড় উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

 

 

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জে ৮১৫ হেক্টর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। জেলার সদর, কামারখন্দ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, বেলকুচি, কাজীপুর ও চৌহালী উপজেলায় আখ চাষ হয়েছে।

 

 

 

 

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, অধিকাংশ জমিতে আখের বৃদ্ধি সন্তোষজনক। তবে কয়েকটি এলাকায় মিলিবাগ, হোয়াইট ফ্লাই ও ছত্রাকজনিত রোগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আক্রান্ত জমিতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

 

 

 

 

উল্লাপাড়ার আখচাষি সেলিম রেজা বলেন, ‘এবার চার বিঘা জমিতে আখ চাষ করেছি। প্রথম দিকে গাছের বৃদ্ধি খুব ভালো ছিল। পরে কিছু গাছে মিলিবাগ দেখা দেয়। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করেছি। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।’

 

 

 

 

শাহজাদপুরের কৃষক মো. শরিফ সেখ বলেন, ‘কয়েকটি জমিতে হোয়াইট ফ্লাইয়ের সমস্যা দেখা দিয়েছে। নিয়মিত পরিচর্যা করছি। আখের দাম ভালো থাকলে এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছি।’

 

 

 

 

সিরাজগঞ্জে আখ শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ। জেলার উৎপাদিত আখের উল্লেখযোগ্য অংশ গুড় তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আখ কাটার মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে গুড় তৈরির অস্থায়ী ভাটা। এসব ভাটাকে কেন্দ্র করে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও গুড় ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

 

 

 

 

ফলে আখের উৎপাদন কমে গেলে শুধু কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, এর প্রভাব পড়ে গুড় উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারেও।

 

 

 

 

আখ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে এবার প্রথমবারের মতো বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি উন্নত জাতের আখ চাষ, আধুনিক পরিচর্যা এবং রোগ-পোকা দমনে কৃষকদের মাঠপর্যায়ে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

 

 

 

 

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, ‘কয়েকটি এলাকায় মিলিবাগ, হোয়াইট ফ্লাই ও ছত্রাকজনিত রোগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে এগুলো ব্যাপক আকার ধারণ করেনি। সঠিক পরিচর্যা ও অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

 

 

 

 

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আখের প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যাবে।’

 

 

 

 

সিরাজগঞ্জে গুড় তৈরির পাশাপাশি চিবিয়ে খাওয়ার জন্য জনপ্রিয় ‘রং বিলাস’ জাতের আখের চাষও হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে এ জাতের আখের চাহিদা থাকায় কৃষকরা ভালো দামের প্রত্যাশা করছেন।

 

 

 

 

কৃষকদের দাবি, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে আখ চাষ আরও বাড়বে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি সমৃদ্ধ হবে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গুড় শিল্প।

 

 

 

 

সব মিলিয়ে রোগ-পোকার আক্রমণে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও তা এখনো বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে আখের ভালো ফলন হবে—এমন প্রত্যাশায় রয়েছেন কৃষকরা। আর সেই আখকে ঘিরে শীত মৌসুমে আবারও সরগরম হয়ে উঠবে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গুড়ের ভাটাগুলো।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৮১৫ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে, বাড়তে পারে গুড় উৎপাদন

রোগ-পোকার আক্রমণেও সিরাজগঞ্জে আখের বাম্পার ফলনের আশা

আপডেট টাইম : ০৭:০৩:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

মাঠজুড়ে সবুজ আখের সমারোহ। কোথাও কোমরসমান, কোথাও তারও বেশি উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আখের গাছ। ভালো ফলনের আশায় দিন গুনছেন সিরাজগঞ্জের কৃষকরা। তবে এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকায় মিলিবাগ, হোয়াইট ফ্লাই ও ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমণ দেখা দেওয়ায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

 

 

 

তবে রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণে কৃষকদের তৎপরতা এবং কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে জেলায় আখের ভালো ফলন এবং এর সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী গুড় উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

 

 

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জে ৮১৫ হেক্টর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। জেলার সদর, কামারখন্দ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, বেলকুচি, কাজীপুর ও চৌহালী উপজেলায় আখ চাষ হয়েছে।

 

 

 

 

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, অধিকাংশ জমিতে আখের বৃদ্ধি সন্তোষজনক। তবে কয়েকটি এলাকায় মিলিবাগ, হোয়াইট ফ্লাই ও ছত্রাকজনিত রোগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আক্রান্ত জমিতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

 

 

 

 

উল্লাপাড়ার আখচাষি সেলিম রেজা বলেন, ‘এবার চার বিঘা জমিতে আখ চাষ করেছি। প্রথম দিকে গাছের বৃদ্ধি খুব ভালো ছিল। পরে কিছু গাছে মিলিবাগ দেখা দেয়। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করেছি। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।’

 

 

 

 

শাহজাদপুরের কৃষক মো. শরিফ সেখ বলেন, ‘কয়েকটি জমিতে হোয়াইট ফ্লাইয়ের সমস্যা দেখা দিয়েছে। নিয়মিত পরিচর্যা করছি। আখের দাম ভালো থাকলে এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছি।’

 

 

 

 

সিরাজগঞ্জে আখ শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ। জেলার উৎপাদিত আখের উল্লেখযোগ্য অংশ গুড় তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আখ কাটার মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে গুড় তৈরির অস্থায়ী ভাটা। এসব ভাটাকে কেন্দ্র করে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও গুড় ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

 

 

 

 

ফলে আখের উৎপাদন কমে গেলে শুধু কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, এর প্রভাব পড়ে গুড় উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারেও।

 

 

 

 

আখ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে এবার প্রথমবারের মতো বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি উন্নত জাতের আখ চাষ, আধুনিক পরিচর্যা এবং রোগ-পোকা দমনে কৃষকদের মাঠপর্যায়ে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

 

 

 

 

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, ‘কয়েকটি এলাকায় মিলিবাগ, হোয়াইট ফ্লাই ও ছত্রাকজনিত রোগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে এগুলো ব্যাপক আকার ধারণ করেনি। সঠিক পরিচর্যা ও অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

 

 

 

 

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আখের প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যাবে।’

 

 

 

 

সিরাজগঞ্জে গুড় তৈরির পাশাপাশি চিবিয়ে খাওয়ার জন্য জনপ্রিয় ‘রং বিলাস’ জাতের আখের চাষও হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে এ জাতের আখের চাহিদা থাকায় কৃষকরা ভালো দামের প্রত্যাশা করছেন।

 

 

 

 

কৃষকদের দাবি, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে আখ চাষ আরও বাড়বে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি সমৃদ্ধ হবে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গুড় শিল্প।

 

 

 

 

সব মিলিয়ে রোগ-পোকার আক্রমণে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও তা এখনো বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে আখের ভালো ফলন হবে—এমন প্রত্যাশায় রয়েছেন কৃষকরা। আর সেই আখকে ঘিরে শীত মৌসুমে আবারও সরগরম হয়ে উঠবে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গুড়ের ভাটাগুলো।