সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

মেহেদির রং না শুকাতেই বিধবা হলেন নববধূ ইলমা

আলাউদ্দিন ইসলাম টগর ও তার স্ত্রী ইলমা খাতুন। ছবি : সংগৃহীত

মাত্র চার দিন আগে বিয়ে করেছেন আলাউদ্দিন ইসলাম টগর। নববধূ ইলমা খাতুনের হাতের মেহেদির রং এখনো শুকায়নি। কিন্তু দুহাতে আঁকা বিয়ের মেহেদির রং মুছে যাওয়ার আগেই সব স্বপ্ন-আশা যেন চুরমার হয়ে গেল ইলমা খাতুনের। হয়ে গেছেন বিধবা।

 

বিয়ের চার দিনের মাথায় ইলমার স্বামী টগরকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে হত্যা করেছে বাসচালকের সহকারী। তরতাজা এ যুবকের মৃত্যু মেনে নিতে পাড়ছেন না স্বজনরা।

 

গত মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শেষ বিদায় বেলায় টগরের বাড়ির সামনে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিবার, স্বজন এবং নতুন বউ—কেউই মানতে পারছেন না এত অল্প দিনের ব্যবধানে এমন চিরবিদায়।

মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুলপাড়া গ্রামে টগরের বাড়ির সামনে তার মরদেহ খাটিয়ায় শোয়ানো হলে চারপাশে কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে বাতাস। স্বজনদের কাঁধ ধরে নববধূ ইলমা এগিয়ে আসেন শেষবারের মতো স্বামীকে দেখতে। তার সামনে দাঁড়িয়ে টগরের ভাই অসহায় কণ্ঠে বলেন, ‘তুমি টগরকে মাফ করে দাও… মাফ করে দিলা টগরকে?’ এ কথা শোনামাত্রই ইলমা আরও জোরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাকে দেখে আশপাশের মানুষও অশ্রু সামলাতে পারেননি।

নিহত যাত্রী আলাউদ্দিন ইসলাম টগর (৩৫) রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুরের কুলপাড়ার আবু সাইদের ছেলে। তিনি একজন কৃষক ছিলেন।

চার দিন আগেই রাজশাহীর দারুশার তেতলাডাঙ্গায় মেয়েকে দেখতে গিয়ে ইলমাকে পছন্দ করেন টগর। পছন্দ মিলতেই বিয়ের আয়োজন হয়। বিয়ের রাতেই নববধূকে নিয়ে ঘরে ফেরেন তিনি। আত্মীয়-স্বজনের হাসি-আনন্দে ভরে ওঠে বাড়ি। কেউ ভাবতেও পারেনি, এত দ্রুতই সেই আনন্দ ঘন কালো শোকে ঢেকে যাবে।

 

রোববার (৩০ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজশাহীর লিলিহল এলাকার বাঁশের আড্ডায় বোন রুমিকে বাসে তুলে দিতে যান টগর। বাসের হেলপার জানায়—সিট আছে। কিন্তু বাসে উঠে দেখা যায় সিট নেই। এ নিয়ে টগর ও বাসের স্টাফদের মধ্যে তর্ক হয়। স্বজনদের অভিযোগ, ওই তর্কের জের ধরে চলন্ত অবস্থায় টগরকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় হেলপার ও সুপারভাইজার। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও সোমবার (১ ডিসেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে তিনি মারা যান।

 

টগরের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ভিড় করা লোকজনের মধ্যে এক নারী জয়া বলেন, ‘ছেলেটার বিয়ের বয়স এক সপ্তাহও হয়নি। মেয়েটার হাতে মেহেদির রং এখনো শুকায়নি। এই বয়সেই বিধবা হয়ে গেল সে। মৃত্যু সত্যিই সবার নিজের মানুষকে পর করে দেয়।’

 

টগরের বন্ধু সাইদুর রহমান বলেন, ‘সে খুব ভালো মানুষ ছিল। বিয়ের রাতে বউ নিয়ে আসার পর আমরা দেখতে গিয়েছিলাম। ভাবতেও পারিনি এত অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে হারাব।’

 

নিহতের চাচাতো ভাই আল আমীন ভুলু বলেন, ‘চার দিনের বৌ রেখে ছেলেটা চলে গেল। দুই পরিবারই শোকে ভেঙে পড়েছে।’

 

এ ঘটনায় নিহতের ভাই দুলাল হোসেন কাশিয়াডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ বাসটি জব্দ করলেও চালক ও হেলপার এখনো পলাতক। কাশিয়াডাঙ্গা থানার ওসি আজিজুল বারী বলেন, হত্যা মামলা হয়েছে। অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অদম্য পলি রানী: পা দিয়ে লিখেই দিচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা

মেহেদির রং না শুকাতেই বিধবা হলেন নববধূ ইলমা

আপডেট টাইম : ১২:৫৫:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫

মাত্র চার দিন আগে বিয়ে করেছেন আলাউদ্দিন ইসলাম টগর। নববধূ ইলমা খাতুনের হাতের মেহেদির রং এখনো শুকায়নি। কিন্তু দুহাতে আঁকা বিয়ের মেহেদির রং মুছে যাওয়ার আগেই সব স্বপ্ন-আশা যেন চুরমার হয়ে গেল ইলমা খাতুনের। হয়ে গেছেন বিধবা।

 

বিয়ের চার দিনের মাথায় ইলমার স্বামী টগরকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে হত্যা করেছে বাসচালকের সহকারী। তরতাজা এ যুবকের মৃত্যু মেনে নিতে পাড়ছেন না স্বজনরা।

 

গত মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শেষ বিদায় বেলায় টগরের বাড়ির সামনে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিবার, স্বজন এবং নতুন বউ—কেউই মানতে পারছেন না এত অল্প দিনের ব্যবধানে এমন চিরবিদায়।

মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুলপাড়া গ্রামে টগরের বাড়ির সামনে তার মরদেহ খাটিয়ায় শোয়ানো হলে চারপাশে কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে বাতাস। স্বজনদের কাঁধ ধরে নববধূ ইলমা এগিয়ে আসেন শেষবারের মতো স্বামীকে দেখতে। তার সামনে দাঁড়িয়ে টগরের ভাই অসহায় কণ্ঠে বলেন, ‘তুমি টগরকে মাফ করে দাও… মাফ করে দিলা টগরকে?’ এ কথা শোনামাত্রই ইলমা আরও জোরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাকে দেখে আশপাশের মানুষও অশ্রু সামলাতে পারেননি।

নিহত যাত্রী আলাউদ্দিন ইসলাম টগর (৩৫) রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুরের কুলপাড়ার আবু সাইদের ছেলে। তিনি একজন কৃষক ছিলেন।

চার দিন আগেই রাজশাহীর দারুশার তেতলাডাঙ্গায় মেয়েকে দেখতে গিয়ে ইলমাকে পছন্দ করেন টগর। পছন্দ মিলতেই বিয়ের আয়োজন হয়। বিয়ের রাতেই নববধূকে নিয়ে ঘরে ফেরেন তিনি। আত্মীয়-স্বজনের হাসি-আনন্দে ভরে ওঠে বাড়ি। কেউ ভাবতেও পারেনি, এত দ্রুতই সেই আনন্দ ঘন কালো শোকে ঢেকে যাবে।

 

রোববার (৩০ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজশাহীর লিলিহল এলাকার বাঁশের আড্ডায় বোন রুমিকে বাসে তুলে দিতে যান টগর। বাসের হেলপার জানায়—সিট আছে। কিন্তু বাসে উঠে দেখা যায় সিট নেই। এ নিয়ে টগর ও বাসের স্টাফদের মধ্যে তর্ক হয়। স্বজনদের অভিযোগ, ওই তর্কের জের ধরে চলন্ত অবস্থায় টগরকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় হেলপার ও সুপারভাইজার। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও সোমবার (১ ডিসেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে তিনি মারা যান।

 

টগরের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ভিড় করা লোকজনের মধ্যে এক নারী জয়া বলেন, ‘ছেলেটার বিয়ের বয়স এক সপ্তাহও হয়নি। মেয়েটার হাতে মেহেদির রং এখনো শুকায়নি। এই বয়সেই বিধবা হয়ে গেল সে। মৃত্যু সত্যিই সবার নিজের মানুষকে পর করে দেয়।’

 

টগরের বন্ধু সাইদুর রহমান বলেন, ‘সে খুব ভালো মানুষ ছিল। বিয়ের রাতে বউ নিয়ে আসার পর আমরা দেখতে গিয়েছিলাম। ভাবতেও পারিনি এত অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে হারাব।’

 

নিহতের চাচাতো ভাই আল আমীন ভুলু বলেন, ‘চার দিনের বৌ রেখে ছেলেটা চলে গেল। দুই পরিবারই শোকে ভেঙে পড়েছে।’

 

এ ঘটনায় নিহতের ভাই দুলাল হোসেন কাশিয়াডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ বাসটি জব্দ করলেও চালক ও হেলপার এখনো পলাতক। কাশিয়াডাঙ্গা থানার ওসি আজিজুল বারী বলেন, হত্যা মামলা হয়েছে। অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে।