সিরাজগঞ্জ , রবিবার, ১০ মে ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

স্বদেশে ফিরেও শোকের সাগরে তারেক রহমান

স্বদেশে ফিরেও শোকের সাগরে

ঢাকা: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর দেশে ফিরেছেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনদিনের প্রাথমিক মিশন শেষ করেছেন তিনি।

 

মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। একদিকে তার জন্য দেশের মাটি ছুঁয়ে দেখা যেমন আনন্দের, তেমনি ক্ষণে ক্ষণে কষ্টও তাকে তাড়া করে ফিরছে।

তারেক রহমান দেশ ছেড়েছিলেন, তখন বিএনপির রাজনীতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল মায়ের হাতেই। জীবিত ছিলেন তার খেলার সাথী ছোট ভাই। যখন তিনি দেশে ফিরেছেন, তখন সেই ভাই আর নেই। ভাইয়ের স্ত্রী বিধবা এবং সন্তানরা বাবা হারা, এতিম।

 

অপরদিকে মা অন্তিম শয্যাশায়ী। তাই দেশে ফেরার আনন্দের চেয়ে যেন শোকের সাগরে ভাসছেন তিনি। 

ওয়ান-ইলেভেনে জরুরি অবস্থা জারির পর ২০০৭ সালের ৭ মার্চ দুর্নীতির অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করা হয় তারেক রহমানকে। তার বিরুদ্ধে ডজন খানেক মামলা করে দুদক।

এরপর কারাগারে থাকাবস্থায় তাকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে চিকিৎসক দল তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। সেখানে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়ার কথা উঠে এলে তারেক রহমানকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

এ অবস্থায় কারাগার থেকেই নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আলোচনার জন্য শর্ত হিসেবে দুই ছেলের মুক্তি দাবি করেন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের ৩ মার্চ খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাকালেই জামিনে ‍মুক্তি দেওয়া হয় তারেক রহমানকে।

 

পরে ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে ছেলেকে হাসপাতালে দেখতে যান। ওইদিনই তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন পাঠানো হয়। 

যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা শেষে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর দেশটিতে অবস্থান করেন তিনি। যার অবসান ঘটে চলতি বছর ২৫ ডিসেম্বর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এ সময়ে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করেন শেখ হাসিনা। তার এ শাসনকালে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম-খুনের অসংখ্য ঘটনা ঘটে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেই গত এক যুগ বিদেশ থেকে দল পরিচালনা করেন। ২০১৮ সালে জানুয়ারিতে খালেদা জিয়াকে একটি মামলায় দণ্ড দিয়ে কারাগারে নেওয়া হলে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই থেকে প্রায় এককভাবে দলটি নিজে পরিচালনা করে আসছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ সময়ে দলের নেতাকর্মীদের তিনি আগলে রাখেন। যে কারণে শত নির্যাতনের পরও বিএনপির ঐক্য বিনষ্ট হয়নি বা দল দুর্বল হয়নি।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনের অবসান হয়। দেড় হাজারের মতো ছাত্র জনতাকে হত্যা করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ক্ষমতা ছেড়ে ভারত পালিয়ে যান তিনি। এরপর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর থেকেই তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার সূচনা হয়। কয়েকবার সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেও তার দেশে ফেরা হয়নি।

 

বিশেষ করে নভেম্বরে খালেদা জিয়া যখন এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন থেকে মায়ের শয্যা পাশে ছেলের অনুপস্থিতি নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় নানা কথা ওঠে। একপর্যায়ে গত ২৯ নভেম্বর মায়ের অসুস্থতা নিয়ে তারেক রহমান ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেন, ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ–স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়ামাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।’

 

এরপর থেকেই নানামুখী আলোচনা শুরু হয়। সরকারের দিক থেকে তারেক রহমানের ফেরা নিয়ে বাঁধা আছে কিনা, সেই আলোচনা সামনে আসে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাঁধা নেই। তিনি ট্রাভেল পাস নিয়ে যে কোনো মুহূর্তে দেশে আসতে পারেন। সবশেষ গত ১২ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা করেন, তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন। গত ১৯ ডিসেম্বর ট্রাভেল পাস হাতে পাওয়ার কথা জানানো হয়। সেই ট্রাভেল পাস নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে করে ২৫ ডিসেম্বর দেশে আসেন তিনি।

 

দেশে ফিরে তারেক রহমান প্রথমেই পূর্বাচলের ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে (তিনশ’ ফিট) এলাকার রাস্তায় বিএনপির পক্ষ থেকে আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যান।

 

স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জনসভায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ নিয়ে একটি পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। মাকে দেখতে যাওয়ার আগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থেকে সবার কাছে দোয়াও চান তিনি।

 

এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে তারেক রহমান বলেন, এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাব। একটি মানুষ যে মানুষটি এই দেশের মাটি, এই দেশের মানুষকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবেসেছেন, তার সাথে কি হয়েছে আপনারা প্রত্যেকটি মানুষ সে সম্পর্কে অবগত আছেন। সন্তান হিসাবে আপনাদের কাছে আমি চাইব, আজ আল্লাহর দরবারে আপনারা দোয়া করবেন, যাতে আল্লাহ উনাকে তৌফিক দেন, উনি যাতে সুস্থ হতে পারেন।’

 

‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু সেই মানুষটি যাদের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছে, অর্থাৎ আপনারা, এই মানুষগুলোকে যাদের জন্য দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই মানুষগুলোকে আমি কোনভাবেই ফেলে যেতে পারি না এবং সেজন্যই আজ হাসপাতালে যাবার আগে আপনাদের প্রতি ও টেলিভিশনগুলোর মাধ্যমে যারা সমগ্র বাংলাদেশে আমাকে দেখছেন, আপনাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি আপনাদের সামনে।’

 

এই বক্তব্যের মাধ্যমে অসুস্থ মায়ের প্রতি তার আবেগ ও এতোদিন তার পাশে না থাকার যে বেদনা সেটিই ফুটে ওঠে। এরপর তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মায়ের কাছে যান। সেখানে সময় কাটিয়ে গুলশানের বাসায় যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

 

তবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিনদিন তিনি ব্যস্ত সময় পার করেছেন। বিমান বন্দর থেকে নেমেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।

 

পরদনি জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন।

 

শনিবার জুলাই আন্দোলনের চেনা মুখ শহীদ ওসমান হাদী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারত করেছেন এবং ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আনুষ্ঠানিকতাও শেষ করে পিলখানায় শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একইভাবে পারিবারিক দায়িত্বও পালন করেছেন। শয্যাশায়ী মাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থেকেই। শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে দীর্ঘ ১৯ বছর পর বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেদে ফেলেন তারেক রহমান। সবশেষ শনিবার নিজের ভাইয়ের কবর জিয়ারত করে হয়েছেন আবেগাপ্লুত।

রাজনৈতিক জীবনে তারেক রহমানকে যেমন একটা লম্বা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে, তেমনি পারিবারিক জীবনটাও তার জন্য সুখকর হয়নি। অল্প সময় ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশের চেহারা বদলে দেওয়া বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারিয়েছেন শৈশবেই। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনে মা কারাবারণ করেছেন, বারবার অসুস্থ হয়েও চিকিৎসা পাননি। সেই দৃশ্য তাকে বিদেশ থেকে শুধু দেখতে হয়েছে। এবার শয্যাশায়ী মায়ের কাছে আসা নিয়েও একটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাকে ফিরতে হয়েছে।

 

রাজনীতির জন্য নিজে এবং পরিবারের এতো ত্যাগের পরও জাতির প্রয়োজনে তারেক রহমানকে দেশে আসতে হয়েছে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে শুক্রবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়; এটি দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে।

 

তারেক রহমান দেশে ফিরে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। কোনো ধরনের প্রতিহিংসা মূলক কথা বলেননি। মানুষকে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। সাদামাটা জীবন যাপনের নজির হিসেবে বাসে করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে মানুষের ভালোবাসার জবাব দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে দেশগড়ার পরিকল্পনার কথা নিজেই বলেছেন, উই হ্যাভ এ প্ল্যান।  আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিকল্পনাকে ফেরি করে ফিরেছেন।

 

ভাই হারানোর শোক ও মাকে পাশে না পাওয়ার বেদনা যেমন তাকে ব্যথিত করেছে, আবার মানুষের ভালোবাসা তার নতুন পথের পাথেয়ও হয়েছে। দেশে ফেরার পর দেশবাসী যে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন তার জন্য দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তারেক রহমান।
শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার দিনটা সারা জীবনের জন্য আমার হৃদয়ে অবিস্মরনীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আমি আবার আমার মাতৃভূমির মাটিতে পা রেখেছি। আপনাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা, ঢাকার রাস্তাজুড়ে মানুষের ঢল, আর লাখো মানুষের দোয়া… এই মুহূর্তগুলো আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। সবার প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা।

 

এই ফিরে আসা নিয়ে আমার আর আমার পরিবারের মনে যে ভালোবাসা আর সম্মান কাজ করছে, তা শুধুমাত্র কথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যারা সব প্রতিকূলতার মাঝেও আমাদের পাশে ছিলেন, কখনো আশা হারাননি, আপনাদের সাহস আমাকে প্রতিনিয়ত শক্তি জোগায়।
নাগরিক সমাজের মানুষজন, তরুণরা, পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক… সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের ধন্যবাদ। আপনারাই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়, যখন এদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকে।

 

এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি দায়িত্বশীলতা ও যত্নের সঙ্গে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আর যারা আমার ফিরে আসার সময় নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করেছেন, সেই সাথে দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, সেইসব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সেবার গুরুত্ব অপরিসীম।

 

আমি অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা আমার দেশে ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছেন। গণতন্ত্র, বহুদলীয় সহাবস্থান এবং জনগণের অদম্য ইচ্ছাশক্তির ওপর জোর দেওয়া এসব ভাবনার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর জন্য ধন্যবাদ, একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির আশাবাদ এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বানকেও আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। এসব পরামর্শ আমি বিনয় ও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করছি।
কেআই/এসআই

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চাকরি দিচ্ছে আরএফএল গ্রুপ, থাকছে বাড়তি সুবিধা

স্বদেশে ফিরেও শোকের সাগরে তারেক রহমান

আপডেট টাইম : ০১:১৩:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
ঢাকা: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর দেশে ফিরেছেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনদিনের প্রাথমিক মিশন শেষ করেছেন তিনি।

 

মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। একদিকে তার জন্য দেশের মাটি ছুঁয়ে দেখা যেমন আনন্দের, তেমনি ক্ষণে ক্ষণে কষ্টও তাকে তাড়া করে ফিরছে।

তারেক রহমান দেশ ছেড়েছিলেন, তখন বিএনপির রাজনীতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল মায়ের হাতেই। জীবিত ছিলেন তার খেলার সাথী ছোট ভাই। যখন তিনি দেশে ফিরেছেন, তখন সেই ভাই আর নেই। ভাইয়ের স্ত্রী বিধবা এবং সন্তানরা বাবা হারা, এতিম।

 

অপরদিকে মা অন্তিম শয্যাশায়ী। তাই দেশে ফেরার আনন্দের চেয়ে যেন শোকের সাগরে ভাসছেন তিনি। 

ওয়ান-ইলেভেনে জরুরি অবস্থা জারির পর ২০০৭ সালের ৭ মার্চ দুর্নীতির অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করা হয় তারেক রহমানকে। তার বিরুদ্ধে ডজন খানেক মামলা করে দুদক।

এরপর কারাগারে থাকাবস্থায় তাকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে চিকিৎসক দল তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। সেখানে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়ার কথা উঠে এলে তারেক রহমানকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

এ অবস্থায় কারাগার থেকেই নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আলোচনার জন্য শর্ত হিসেবে দুই ছেলের মুক্তি দাবি করেন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের ৩ মার্চ খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাকালেই জামিনে ‍মুক্তি দেওয়া হয় তারেক রহমানকে।

 

পরে ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে ছেলেকে হাসপাতালে দেখতে যান। ওইদিনই তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন পাঠানো হয়। 

যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা শেষে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর দেশটিতে অবস্থান করেন তিনি। যার অবসান ঘটে চলতি বছর ২৫ ডিসেম্বর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এ সময়ে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করেন শেখ হাসিনা। তার এ শাসনকালে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম-খুনের অসংখ্য ঘটনা ঘটে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেই গত এক যুগ বিদেশ থেকে দল পরিচালনা করেন। ২০১৮ সালে জানুয়ারিতে খালেদা জিয়াকে একটি মামলায় দণ্ড দিয়ে কারাগারে নেওয়া হলে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই থেকে প্রায় এককভাবে দলটি নিজে পরিচালনা করে আসছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ সময়ে দলের নেতাকর্মীদের তিনি আগলে রাখেন। যে কারণে শত নির্যাতনের পরও বিএনপির ঐক্য বিনষ্ট হয়নি বা দল দুর্বল হয়নি।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনের অবসান হয়। দেড় হাজারের মতো ছাত্র জনতাকে হত্যা করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ক্ষমতা ছেড়ে ভারত পালিয়ে যান তিনি। এরপর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর থেকেই তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার সূচনা হয়। কয়েকবার সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেও তার দেশে ফেরা হয়নি।

 

বিশেষ করে নভেম্বরে খালেদা জিয়া যখন এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন থেকে মায়ের শয্যা পাশে ছেলের অনুপস্থিতি নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় নানা কথা ওঠে। একপর্যায়ে গত ২৯ নভেম্বর মায়ের অসুস্থতা নিয়ে তারেক রহমান ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেন, ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ–স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়ামাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।’

 

এরপর থেকেই নানামুখী আলোচনা শুরু হয়। সরকারের দিক থেকে তারেক রহমানের ফেরা নিয়ে বাঁধা আছে কিনা, সেই আলোচনা সামনে আসে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাঁধা নেই। তিনি ট্রাভেল পাস নিয়ে যে কোনো মুহূর্তে দেশে আসতে পারেন। সবশেষ গত ১২ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা করেন, তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন। গত ১৯ ডিসেম্বর ট্রাভেল পাস হাতে পাওয়ার কথা জানানো হয়। সেই ট্রাভেল পাস নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে করে ২৫ ডিসেম্বর দেশে আসেন তিনি।

 

দেশে ফিরে তারেক রহমান প্রথমেই পূর্বাচলের ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে (তিনশ’ ফিট) এলাকার রাস্তায় বিএনপির পক্ষ থেকে আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যান।

 

স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জনসভায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ নিয়ে একটি পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। মাকে দেখতে যাওয়ার আগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থেকে সবার কাছে দোয়াও চান তিনি।

 

এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে তারেক রহমান বলেন, এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাব। একটি মানুষ যে মানুষটি এই দেশের মাটি, এই দেশের মানুষকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবেসেছেন, তার সাথে কি হয়েছে আপনারা প্রত্যেকটি মানুষ সে সম্পর্কে অবগত আছেন। সন্তান হিসাবে আপনাদের কাছে আমি চাইব, আজ আল্লাহর দরবারে আপনারা দোয়া করবেন, যাতে আল্লাহ উনাকে তৌফিক দেন, উনি যাতে সুস্থ হতে পারেন।’

 

‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু সেই মানুষটি যাদের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছে, অর্থাৎ আপনারা, এই মানুষগুলোকে যাদের জন্য দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই মানুষগুলোকে আমি কোনভাবেই ফেলে যেতে পারি না এবং সেজন্যই আজ হাসপাতালে যাবার আগে আপনাদের প্রতি ও টেলিভিশনগুলোর মাধ্যমে যারা সমগ্র বাংলাদেশে আমাকে দেখছেন, আপনাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি আপনাদের সামনে।’

 

এই বক্তব্যের মাধ্যমে অসুস্থ মায়ের প্রতি তার আবেগ ও এতোদিন তার পাশে না থাকার যে বেদনা সেটিই ফুটে ওঠে। এরপর তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মায়ের কাছে যান। সেখানে সময় কাটিয়ে গুলশানের বাসায় যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

 

তবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিনদিন তিনি ব্যস্ত সময় পার করেছেন। বিমান বন্দর থেকে নেমেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।

 

পরদনি জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন।

 

শনিবার জুলাই আন্দোলনের চেনা মুখ শহীদ ওসমান হাদী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারত করেছেন এবং ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আনুষ্ঠানিকতাও শেষ করে পিলখানায় শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একইভাবে পারিবারিক দায়িত্বও পালন করেছেন। শয্যাশায়ী মাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থেকেই। শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে দীর্ঘ ১৯ বছর পর বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেদে ফেলেন তারেক রহমান। সবশেষ শনিবার নিজের ভাইয়ের কবর জিয়ারত করে হয়েছেন আবেগাপ্লুত।

রাজনৈতিক জীবনে তারেক রহমানকে যেমন একটা লম্বা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে, তেমনি পারিবারিক জীবনটাও তার জন্য সুখকর হয়নি। অল্প সময় ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশের চেহারা বদলে দেওয়া বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারিয়েছেন শৈশবেই। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনে মা কারাবারণ করেছেন, বারবার অসুস্থ হয়েও চিকিৎসা পাননি। সেই দৃশ্য তাকে বিদেশ থেকে শুধু দেখতে হয়েছে। এবার শয্যাশায়ী মায়ের কাছে আসা নিয়েও একটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাকে ফিরতে হয়েছে।

 

রাজনীতির জন্য নিজে এবং পরিবারের এতো ত্যাগের পরও জাতির প্রয়োজনে তারেক রহমানকে দেশে আসতে হয়েছে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে শুক্রবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়; এটি দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে।

 

তারেক রহমান দেশে ফিরে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। কোনো ধরনের প্রতিহিংসা মূলক কথা বলেননি। মানুষকে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। সাদামাটা জীবন যাপনের নজির হিসেবে বাসে করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে মানুষের ভালোবাসার জবাব দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে দেশগড়ার পরিকল্পনার কথা নিজেই বলেছেন, উই হ্যাভ এ প্ল্যান।  আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিকল্পনাকে ফেরি করে ফিরেছেন।

 

ভাই হারানোর শোক ও মাকে পাশে না পাওয়ার বেদনা যেমন তাকে ব্যথিত করেছে, আবার মানুষের ভালোবাসা তার নতুন পথের পাথেয়ও হয়েছে। দেশে ফেরার পর দেশবাসী যে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন তার জন্য দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তারেক রহমান।
শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার দিনটা সারা জীবনের জন্য আমার হৃদয়ে অবিস্মরনীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আমি আবার আমার মাতৃভূমির মাটিতে পা রেখেছি। আপনাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা, ঢাকার রাস্তাজুড়ে মানুষের ঢল, আর লাখো মানুষের দোয়া… এই মুহূর্তগুলো আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। সবার প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা।

 

এই ফিরে আসা নিয়ে আমার আর আমার পরিবারের মনে যে ভালোবাসা আর সম্মান কাজ করছে, তা শুধুমাত্র কথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যারা সব প্রতিকূলতার মাঝেও আমাদের পাশে ছিলেন, কখনো আশা হারাননি, আপনাদের সাহস আমাকে প্রতিনিয়ত শক্তি জোগায়।
নাগরিক সমাজের মানুষজন, তরুণরা, পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক… সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের ধন্যবাদ। আপনারাই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়, যখন এদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকে।

 

এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি দায়িত্বশীলতা ও যত্নের সঙ্গে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আর যারা আমার ফিরে আসার সময় নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করেছেন, সেই সাথে দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, সেইসব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সেবার গুরুত্ব অপরিসীম।

 

আমি অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা আমার দেশে ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছেন। গণতন্ত্র, বহুদলীয় সহাবস্থান এবং জনগণের অদম্য ইচ্ছাশক্তির ওপর জোর দেওয়া এসব ভাবনার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর জন্য ধন্যবাদ, একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির আশাবাদ এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বানকেও আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। এসব পরামর্শ আমি বিনয় ও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করছি।
কেআই/এসআই