সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

ফুলজোড় নদীতে অষ্টমী পুণ্যস্নান: সনাতন ধর্মালম্বীদের মিলনমেলা

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ভুইয়াগাতি এলাকায় প্রবাহিত ফুলজোড় নদীতে বুধবার (২৬ মার্চ) অনুষ্ঠিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় আচার ‘অষ্টমী পুণ্যস্নান’। ভোরের আলো ফুটতেই নদীর ঘাটজুড়ে নেমে আসে হাজারো পুণ্যার্থীর ঢল—স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও ভক্তরা অংশ নেন এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে।
সনাতন ধর্ম মতে, চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পবিত্র নদীতে স্নান করলে জীবনের পাপক্ষয় হয় এবং আত্মার পবিত্রতা লাভ ঘটে। এই বিশ্বাস বহু শতাব্দী ধরে বাংলার গ্রামীণ জনপদে প্রচলিত। বিশেষ করে নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও লোকজ সংস্কৃতি। ফুলজোড় নদীর তীরেও সেই প্রাচীন ধারারই প্রতিফলন দেখা যায়।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ভুইয়াগাতি ঘাটে অষ্টমী স্নানের এই আয়োজন কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। একসময় এটি ছিল ছোট পরিসরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যা কালের প্রবাহে আজ রূপ নিয়েছে বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
অষ্টমী স্নানকে ঘিরে নদীতীরবর্তী এলাকায় বসে গ্রামীণ মেলা, যা এই অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মেলায় পাওয়া যায় মিষ্টান্ন, খেলনা, চুড়ি, প্রসাধনীসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, দোলনা ও বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন উৎসবে যোগ করেছে বাড়তি আনন্দ।
এ ধরনের মেলা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই সময়টিকে ঘিরে বাড়তি আয়ের সুযোগ পান, আর সাধারণ মানুষ পান বিনোদনের একটি উপলক্ষ।
উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রাম সরকার বিপ্লব বলেন, “এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, আমাদের সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক। সবাই একসাথে স্নান করে, পূজা-অর্চনায় অংশ নেয়।”
মেলায় অংশ নেওয়া পুণ্যার্থী ভজন চন্দ্র জানান, “পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে আসা এক ধরনের আনন্দের। সবাইকে একসাথে দেখতে ভালো লাগে, মনে হয় যেন এক বিশাল পরিবারের মিলনমেলা।”
পুণ্যস্নান উপলক্ষে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা নদীতে নামা ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন জনসমাগমে শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় নজরদারি জোরদার করে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, “নিরাপদ স্নান ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
রায়গঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আহসানুজ্জামান জানান, “কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেছে।”
ফুলজোড় নদীর অষ্টমী পুণ্যস্নান শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়—এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির এক অপূর্ব সম্মিলন। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এটি গ্রামীণ জীবনের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে নিয়ে যায় বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির ধারাকে।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অদম্য পলি রানী: পা দিয়ে লিখেই দিচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা

ফুলজোড় নদীতে অষ্টমী পুণ্যস্নান: সনাতন ধর্মালম্বীদের মিলনমেলা

আপডেট টাইম : ০১:২০:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ভুইয়াগাতি এলাকায় প্রবাহিত ফুলজোড় নদীতে বুধবার (২৬ মার্চ) অনুষ্ঠিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় আচার ‘অষ্টমী পুণ্যস্নান’। ভোরের আলো ফুটতেই নদীর ঘাটজুড়ে নেমে আসে হাজারো পুণ্যার্থীর ঢল—স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও ভক্তরা অংশ নেন এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে।
সনাতন ধর্ম মতে, চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পবিত্র নদীতে স্নান করলে জীবনের পাপক্ষয় হয় এবং আত্মার পবিত্রতা লাভ ঘটে। এই বিশ্বাস বহু শতাব্দী ধরে বাংলার গ্রামীণ জনপদে প্রচলিত। বিশেষ করে নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও লোকজ সংস্কৃতি। ফুলজোড় নদীর তীরেও সেই প্রাচীন ধারারই প্রতিফলন দেখা যায়।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ভুইয়াগাতি ঘাটে অষ্টমী স্নানের এই আয়োজন কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। একসময় এটি ছিল ছোট পরিসরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যা কালের প্রবাহে আজ রূপ নিয়েছে বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
অষ্টমী স্নানকে ঘিরে নদীতীরবর্তী এলাকায় বসে গ্রামীণ মেলা, যা এই অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মেলায় পাওয়া যায় মিষ্টান্ন, খেলনা, চুড়ি, প্রসাধনীসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, দোলনা ও বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন উৎসবে যোগ করেছে বাড়তি আনন্দ।
এ ধরনের মেলা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই সময়টিকে ঘিরে বাড়তি আয়ের সুযোগ পান, আর সাধারণ মানুষ পান বিনোদনের একটি উপলক্ষ।
উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রাম সরকার বিপ্লব বলেন, “এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, আমাদের সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক। সবাই একসাথে স্নান করে, পূজা-অর্চনায় অংশ নেয়।”
মেলায় অংশ নেওয়া পুণ্যার্থী ভজন চন্দ্র জানান, “পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে আসা এক ধরনের আনন্দের। সবাইকে একসাথে দেখতে ভালো লাগে, মনে হয় যেন এক বিশাল পরিবারের মিলনমেলা।”
পুণ্যস্নান উপলক্ষে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা নদীতে নামা ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন জনসমাগমে শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় নজরদারি জোরদার করে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, “নিরাপদ স্নান ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
রায়গঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আহসানুজ্জামান জানান, “কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেছে।”
ফুলজোড় নদীর অষ্টমী পুণ্যস্নান শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়—এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির এক অপূর্ব সম্মিলন। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এটি গ্রামীণ জীবনের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে নিয়ে যায় বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির ধারাকে।