গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন পেয়েই অনিয়মে জড়িয়ে যান কাস্টম হাউস ঢাকার সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান। বিসিএস ৪০ ব্যাচের এই কর্মকর্তা সুবিধা পেলে আইনের তোয়াক্কা না করে যাচাই-বাছাই ছাড়া পণ্য চালান খালাস করেন। সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করে তার এসব কর্মকাণ্ড এখন ওপেন সিক্রেট। সর্বশেষ মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা একটি পণ্য চালান ছেড়ে দেন মাত্র ৩৫ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করে। পরে কাস্টমস হাউস ঢাকা তদন্ত করে দেখে এখানে সরকারের শুল্ক-কর হবে ৭৬ লাখ টাকা। অথচ সহকারী কমিশনার সাকিবের সহায়তায় চালানটি নিয়ে গেছে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ। শুধু এই ঘটনা নয়, একজন শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ৫ দিনে প্রায় ৪০টি বিল অব এন্ট্রি খালাসের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সাকিব আনাম খানের আরও এমন বহু সরকারি রাজস্ব ক্ষতির ঘটনার সাক্ষী ঢাকা কাস্টম হাউস ও তার সাবেক কর্মস্থল রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেট। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ঢাকা কাস্টম হাউসের কুরিয়ার ইউনিট দিয়ে গত ২৩ আগস্ট ফুলএভার বিডি লিমিটেড একটি পণ্য চালান আমদানি করে, যার বিল অব এন্ট্রি নম্বর হলো সি-৯৯২৬২৩। প্রতিষ্ঠানটি কাগজ ঘোষণা দিয়ে আরএফ লেভেল খালাস করে নিয়ে যায়। মাত্র ৩৫ হাজার টাকা শুল্ক-কর নির্ধারণ করে পণ্য চালানটি ছেড়ে দেন কুরিয়ার ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান। কাস্টম হাউসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কানে বিষয়টি গেলে, তারা তদন্ত শুরু করেন। আর তদন্তে বেরিয়ে আসে প্রতিষ্ঠানটি কাগজের আড়ালে আরএফ লেভেল নিয়ে গেছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৭৬ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকির মামলাও করে ঢাকা কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। মজার বিষয় হলো- পণ্য চালানটি সাকিব আনাম খান ছেড়ে দেওয়ার পর এই মামলা করে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ, যার কারণে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কোনো শুল্ক-কর আদায় করতে পারেনি। এ ছাড়া কুরিয়ারের আরও ৩১ চালানে লক দিয়েছে প্রিভেন্টিভ টিম। শুধু এসব ঘটনাই নয়, প্রতিনিয়ত এই ধরণের অনিয়মের ঘটনা ঘটে চলেছে ঢাকা কাস্টম হাউসে। সার্বিক বিষয় নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে কাস্টমস হাউস ঢাকা।
কাস্টম হাউসের কুরিয়ার মূলত নমুনা পণ্যের জন্য নির্ধারণ করা আছে। অর্থাৎ এলসি ছাড়া যেসব নমুনা পণ্য আসে, সেসব পণ্য কুরিয়ার দিয়ে খালাস করার নিয়ম রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সারা বছরে এক ব্যক্তির প্রায় ৫ হাজার ডলারের পণ্য নিয়ে আসার নিয়ম রয়েছে; কিন্তু সাকিব আনাম খান আসার পর কুরিয়ার ইউনিট এখন বাণিজ্যিক আমদানিকারকের হাবে পরিণত হয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে ফ্রেইট থেকে বেশি বিল অব এন্ট্রি পড়ে কুরিয়ারে। অথচ বাণিজ্যিক আমদানিকারকের পণ্য আসার কথা মূলত ফ্রেইট দিয়ে। সুবিধা দিয়ে পণ্য চালান খালাস করার অবাধ সুযোগ রয়েছে বিধায়, নানা ধরনের পণ্য এখন কুরিয়ার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান খোদ কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টমস হাউস ঢাকার কমিশনার রইচ উদ্দিন খান কালবেলাকে বলেন, কুরিয়ার ইউনিটে এক আমদানিকারক মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য চালান খালাস করেছে। পরে কাস্টম হাউসের তদন্তে আরএফ লেভেল পাওয়া গেছে। এতে সরকারের প্রায় ৭৬ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী পণ্য চালান অবজারভেশনে রাখা হয়েছে বলেও জানান এই কমিশনার।
সূত্র আরও জানায়, শুধু ফুলএভার বিডির পণ্য চালানই নয়, প্রতিনিয়ত এরকম বহু পণ্য চালান খালাসের অভিযোগ এই সাকিব আনাম খানের বিরুদ্ধে। ভুয়া এনআইডি ব্যবহারের মাধ্যমে সম্প্রতি পাঁচ দিনে প্রায় ৪০টি পণ্য চালান খালাসের অভিযোগ উঠেছে। ডেল্টা কার্গো মিডিয়ার নামে এসব পণ্য চালান খালাস করা হয়। ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে খালাসের অভিযোগ ওঠা পণ্য চালানগুলোর বিল অব এন্ট্রি নম্বর হলো- ১০৯৯৬৯৫, ১০৯৯৭৫৬, ১০৯৯৭৪৫, ১০৮৮৭৩০, ১০৮৮৭৩০, ১০৮৮৭০২, ১০৮৮৭১২, ১০৮৪৬৪২, ১০৮৪৫৪৮, ১০৮৩৩৪৫, ১০৮৩৩৩৯, ১০৮৩৩৫৪, ১০৮৩৩৫১, ১০৭৯৬৯২, ১০৮০৯৩৭, ১০৭৮৭১৮, ১০৮০৯৮২, ১০৭৯৪৭৮সহ প্রায় চল্লিশটি বিলের পণ্য চালান। সর্বশেষ এসব অনিয়মের দায়ে গত বৃহস্পতিবার সাকিব আনাম খানকে ঢাকা কাস্টমস হাউসের আরেকটি শাখায় বদলি করা হয়েছে। শুধু এসব অনিয়ম নয়, সাকিব আনাম খান কুরিয়ারে পদায়ন পাওয়ার পর থেকে দুটি সিন্ডিকেট ইতোমধ্যে সক্রিয় হয়েছে। তারা বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে সাকিবের মাধ্যমে পণ্য চালান খালাস করে নিয়ে গেছে। বন্ডের ফেব্রিক্স থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক পণ্যও কুরিয়ার দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় খালাসের বিষয়টি ঢাকা কাস্টম হাউসে ওপেন সিক্রেট। কুরিয়ারে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে এক প্রতিষ্ঠান মালিকের নামে কুরিয়ারে আসে নকল সিগারেটের ব্যান্ডরোল। এই ব্যান্ডরোল আটকের পর পরিচয়পত্র দেখে ফাঁকির মামলা করে কাস্টমস হাউস। পরে দেখা যায়, যার নামে এই সিগারেটের ব্যান্ডরোল এসেছে, আসলে তিনি আমদানি করেননি। তার পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হয়েছে। পরে এই প্রতিষ্ঠান মালিক তার নাম ব্যবহার করে অনিয়ম করার জন্য থানায় মামলাও করেন। কুরিয়ারের আগে অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপে থাকাকালীন সময়েও সুবিধা না পেলে প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রেখে হয়রানির বিস্তর অভিযোগও রয়েছে সাকিবের বিরুদ্ধে। এর আগে রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনের সময়ে ইশ্বরদী ইপিজেডে পদায়ন করা হয় সাকিব আনাম খানকে। পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হয়রানি করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ দুই মাসের মাথায় তাকে সরিয়ে দেন তৎকালীন রাজশাহী ভ্যাটের কমিশনার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান ফুলএভার বিডিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি কালবেলাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কম মূল্য ঘোষণা দিয়েছে। যার কারণে শুল্ক ফাঁকির মামলা হয়েছে। এত টাকা শুল্ক কর আদায় করার কথা থাকলেও তিনি কীভাবে ৩৫ হাজার টাকায় পণ্য ছেড়ে দিলেন- এমন প্রশ্ন করা হলে এই বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।
জনতার কন্ঠ/এস এ

ন্যাশনাল ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 

























