সিরাজগঞ্জ , শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
আজ বিশ্ব ডাক দিবস:

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কমেছে ডাক বিভাগের গুরুত্ব

  • রিপোর্টার:
  • আপডেট টাইম : ০২:১০:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫
  • ৬২ জন দেখেছেন

সিরাজগঞ্জ প্রধান ডাকঘর। ছবি: জনতার কণ্ঠ

প্রধান প্রতিবেদক। জনতার কণ্ঠ.কম

এক সময় “এই যে এ বাড়িতে চিঠি আছে” মাস শেষ হলেই ডাক পিয়নের এমন ডাকের জন্য অধীর হয়ে বসে থাকতো শহর বা গ্রামের মানুষগুলো। দূরে চাকরী বা অধ্যয়নরত সন্তানের চিঠির জন্য মা-বাবা, স্বামী কিংবা বাবার বাড়ির চিঠির জন্য অপেক্ষা করতো গাঁয়ের বধু। ভালোবাসার মানুষের ছন্দময় প্রেমপত্রের অপেক্ষা করে নাই এমন প্রেমিক-প্রেমিকার সংখ্যা কমই রয়েছে। তখন পোস্ট মাস্টার, ডাকপিয়ন, ডাক হরকরা, রানার শব্দগুলো মানুষের মুখে মুখে ছিল।

কালের বিবর্তণে চিঠি এখন এসএমএস, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসএপ চ্যাটিংয়ে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত চিঠি আদান-প্রদান একেবারেই কমেছে। রানার বা ডাক হরকরার নামও শোনেনি নতুন প্রজন্ম। তবে গ্রামাঞ্চলে কমলেও শহরে এখনো ডাকঘরের গুরুত্ব রয়েছে। ব্যক্তিগত চিঠি না থাকলেও আদালত, ব্যাংক, বীমাসহ বিভিন্ন অফিসিয়াল গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পৌঁছানোর কাজ করে যাচ্ছে ডাক বিভাগ।

সিরাজগঞ্জ প্রধান ডাকঘরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখানে প্রচুর অফিসিয়াল চিঠি আদান-প্রদান হয়। এ অফিসের অধিনের ২১৫টি ডাকঘরের মাধ্যমে বিদেশে চিঠি পৌঁছানোর জন্য এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস (ইএমএস), ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিঠি বিলি করতে গ্রান্টেড এক্সপ্রেস পোস্ট সার্ভিস (জিইপি), রেজিষ্ট্রার্ড পার্সেল, ইলেকট্রিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস, পোস্টাল লাইফ ইন্সুরেন্সসহ নানাবিধ সেবা দেওয়া হয়। এছাড়াও রয়েছে ফিক্স ডিপোজিট বা সেভিংস শাখা রয়েছে।

এদিকে গ্রামাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বেশিরভাগ ডাকঘর। শাখা ডাকঘরগুলোতে দুই থেকে তিনজন করে স্বল্প বেতনের কর্মচারি রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করে না। আবার কোন কোন ডাকঘরে মাসে ১০/১২টাও চিঠি লেনদেনের নেই।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাগবাটি ইউনিয়নের রাজীবপুর-ইছামতি শাখা ডাকঘরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ঘর থাকলেও পোস্টবাক্স নেই। ডাকঘরের ভেতরে একটি কক্ষে কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার ও অপরটিতে একজন উদ্যোক্তা মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দোকান খুলে বসে আছেন।

ওই কক্ষের একপাশের চেয়ারে বসে রয়েছেন পোস্ট মাস্টার হুসনেয়ারা খাতুন আঁখি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আর আগের মতো চিঠি লেনদেন হয় না। এখান থেকে মাসে সর্বোচ্চ ৪/৫টা চিঠি পাঠানো হয়। তবে ব্যাংক, আদালতসহ বিভিন্ন অফিসের চিঠি আসে। তিনি মাত্র ৪ হাজার ৪৬০ টাকা বেতনে চাকরী করেন বলে জানান। রানার কৃষ্ণ চন্দ্র সরকার বলেন, তিনি মাত্র ৪১৭৭ টাকা বেতনে চাকরী করেন।

২০১৮ সালে অবসর নেওয়া ৭০ বছর বয়সী রানার মো. আবু সাঈদ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, আমাদের সময়ে চাকরীর প্রতি মহাব্বত ছিল। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৪০ কেজি ওজনের চিঠির বস্তা কাঁধে নিয়ে ৬ মাইল পথ হেঁটে গিয়ে পৌঁছে দিয়েছি। তখন রাস্তাঘাট ছিল না, ধানক্ষেত, পাটক্ষেতের আইল দিয়ে যেতে হয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে অনেক সময় নদীতে নৌকা পাওয়া যেত না, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চিঠির আমাকে পৌঁছাতেই হবে। তাই এক হাতে চিঠির বস্তা ভাসিয়ে নদী সাঁতরিয়ে পার হয়েছি। পরে রাস্তাঘাট হলে কিছুদিন সাইকেল ব্যবহার করেছি। আমার শ্বশুর যখন ডাক হরকরা ছিলেন তখন তাকে বল্লম ও হেরিকেন দেওয়া হয়। আমরা সেটা পাই নি। তবে আমাদের পোশাক দেওয়া হয়েছিল।

শহরের বড় বাজার ডাকঘরের পোস্ট মাস্টার মো. মাসুদ রানা রিপন বলেন, ডাক হরকরা আর রানার একই শব্দ। এদের কাজ ছিল, এক অফিসের চিঠি অন্য অফিসে পৌঁছে দিত। তখনকার দিনে জীবজন্তুর হাত থেকে বাঁচার জন্য বল্লম দেওয়া হতো এবং রাতে যাতায়াত নিরাপদ করতে হারিকেন আর ঘুন্টি দেওয়া হতো। সময়ের বিবর্তণে রাস্তাঘাট উন্নত হওয়ার পর তারা সাইকেল পরবর্তীতে মোটর সাইকেল ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত পর্যাপ্ত চিঠি আমরা পেয়েছি। আমাদের সিরাজগঞ্জ শহরে ১৪ জন পোস্টম্যান চিঠি বিতরণ করতে হয়রান হয়ে যেত। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের যুগ আসার পর  ব্যক্তিগত চিঠি একেবারেই কম। তবে অফিসিয়াল চিঠির সংখ্যা বেড়েছে।

সিরাজগঞ্জ প্রধান ডাকঘরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা কমে গেলেও চিঠির গুরুত্ব আছে। আমরা যেসব চিঠি পাই তার বেশিরভাগই আদালতের চিঠি, বানিজ্যিক চিঠি। এসব চিঠি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আমাদের সিরাজগঞ্জ প্রধান ডাকঘরের অধিনে প্রথম শ্রেণীর একটি, টাউন সাব পোস্ট অফিস ৫টি, সাব পোস্ট অফিস একটা ও শাখা অফিস মিলে ২১৬ টি রয়েছে। বাকীগুলো পাবনা ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলের অধিনে রয়েছে।

78
Created on
আপনার মতামত দিন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে ক্ষমতায় দেখতে চান ?

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আজ বিশ্ব ডাক দিবস:

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কমেছে ডাক বিভাগের গুরুত্ব

আপডেট টাইম : ০২:১০:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫

প্রধান প্রতিবেদক। জনতার কণ্ঠ.কম

এক সময় “এই যে এ বাড়িতে চিঠি আছে” মাস শেষ হলেই ডাক পিয়নের এমন ডাকের জন্য অধীর হয়ে বসে থাকতো শহর বা গ্রামের মানুষগুলো। দূরে চাকরী বা অধ্যয়নরত সন্তানের চিঠির জন্য মা-বাবা, স্বামী কিংবা বাবার বাড়ির চিঠির জন্য অপেক্ষা করতো গাঁয়ের বধু। ভালোবাসার মানুষের ছন্দময় প্রেমপত্রের অপেক্ষা করে নাই এমন প্রেমিক-প্রেমিকার সংখ্যা কমই রয়েছে। তখন পোস্ট মাস্টার, ডাকপিয়ন, ডাক হরকরা, রানার শব্দগুলো মানুষের মুখে মুখে ছিল।

কালের বিবর্তণে চিঠি এখন এসএমএস, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসএপ চ্যাটিংয়ে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত চিঠি আদান-প্রদান একেবারেই কমেছে। রানার বা ডাক হরকরার নামও শোনেনি নতুন প্রজন্ম। তবে গ্রামাঞ্চলে কমলেও শহরে এখনো ডাকঘরের গুরুত্ব রয়েছে। ব্যক্তিগত চিঠি না থাকলেও আদালত, ব্যাংক, বীমাসহ বিভিন্ন অফিসিয়াল গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পৌঁছানোর কাজ করে যাচ্ছে ডাক বিভাগ।

সিরাজগঞ্জ প্রধান ডাকঘরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখানে প্রচুর অফিসিয়াল চিঠি আদান-প্রদান হয়। এ অফিসের অধিনের ২১৫টি ডাকঘরের মাধ্যমে বিদেশে চিঠি পৌঁছানোর জন্য এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস (ইএমএস), ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিঠি বিলি করতে গ্রান্টেড এক্সপ্রেস পোস্ট সার্ভিস (জিইপি), রেজিষ্ট্রার্ড পার্সেল, ইলেকট্রিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস, পোস্টাল লাইফ ইন্সুরেন্সসহ নানাবিধ সেবা দেওয়া হয়। এছাড়াও রয়েছে ফিক্স ডিপোজিট বা সেভিংস শাখা রয়েছে।

এদিকে গ্রামাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বেশিরভাগ ডাকঘর। শাখা ডাকঘরগুলোতে দুই থেকে তিনজন করে স্বল্প বেতনের কর্মচারি রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করে না। আবার কোন কোন ডাকঘরে মাসে ১০/১২টাও চিঠি লেনদেনের নেই।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাগবাটি ইউনিয়নের রাজীবপুর-ইছামতি শাখা ডাকঘরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ঘর থাকলেও পোস্টবাক্স নেই। ডাকঘরের ভেতরে একটি কক্ষে কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার ও অপরটিতে একজন উদ্যোক্তা মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দোকান খুলে বসে আছেন।

ওই কক্ষের একপাশের চেয়ারে বসে রয়েছেন পোস্ট মাস্টার হুসনেয়ারা খাতুন আঁখি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আর আগের মতো চিঠি লেনদেন হয় না। এখান থেকে মাসে সর্বোচ্চ ৪/৫টা চিঠি পাঠানো হয়। তবে ব্যাংক, আদালতসহ বিভিন্ন অফিসের চিঠি আসে। তিনি মাত্র ৪ হাজার ৪৬০ টাকা বেতনে চাকরী করেন বলে জানান। রানার কৃষ্ণ চন্দ্র সরকার বলেন, তিনি মাত্র ৪১৭৭ টাকা বেতনে চাকরী করেন।

২০১৮ সালে অবসর নেওয়া ৭০ বছর বয়সী রানার মো. আবু সাঈদ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, আমাদের সময়ে চাকরীর প্রতি মহাব্বত ছিল। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৪০ কেজি ওজনের চিঠির বস্তা কাঁধে নিয়ে ৬ মাইল পথ হেঁটে গিয়ে পৌঁছে দিয়েছি। তখন রাস্তাঘাট ছিল না, ধানক্ষেত, পাটক্ষেতের আইল দিয়ে যেতে হয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে অনেক সময় নদীতে নৌকা পাওয়া যেত না, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চিঠির আমাকে পৌঁছাতেই হবে। তাই এক হাতে চিঠির বস্তা ভাসিয়ে নদী সাঁতরিয়ে পার হয়েছি। পরে রাস্তাঘাট হলে কিছুদিন সাইকেল ব্যবহার করেছি। আমার শ্বশুর যখন ডাক হরকরা ছিলেন তখন তাকে বল্লম ও হেরিকেন দেওয়া হয়। আমরা সেটা পাই নি। তবে আমাদের পোশাক দেওয়া হয়েছিল।

শহরের বড় বাজার ডাকঘরের পোস্ট মাস্টার মো. মাসুদ রানা রিপন বলেন, ডাক হরকরা আর রানার একই শব্দ। এদের কাজ ছিল, এক অফিসের চিঠি অন্য অফিসে পৌঁছে দিত। তখনকার দিনে জীবজন্তুর হাত থেকে বাঁচার জন্য বল্লম দেওয়া হতো এবং রাতে যাতায়াত নিরাপদ করতে হারিকেন আর ঘুন্টি দেওয়া হতো। সময়ের বিবর্তণে রাস্তাঘাট উন্নত হওয়ার পর তারা সাইকেল পরবর্তীতে মোটর সাইকেল ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত পর্যাপ্ত চিঠি আমরা পেয়েছি। আমাদের সিরাজগঞ্জ শহরে ১৪ জন পোস্টম্যান চিঠি বিতরণ করতে হয়রান হয়ে যেত। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের যুগ আসার পর  ব্যক্তিগত চিঠি একেবারেই কম। তবে অফিসিয়াল চিঠির সংখ্যা বেড়েছে।

সিরাজগঞ্জ প্রধান ডাকঘরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা কমে গেলেও চিঠির গুরুত্ব আছে। আমরা যেসব চিঠি পাই তার বেশিরভাগই আদালতের চিঠি, বানিজ্যিক চিঠি। এসব চিঠি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আমাদের সিরাজগঞ্জ প্রধান ডাকঘরের অধিনে প্রথম শ্রেণীর একটি, টাউন সাব পোস্ট অফিস ৫টি, সাব পোস্ট অফিস একটা ও শাখা অফিস মিলে ২১৬ টি রয়েছে। বাকীগুলো পাবনা ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলের অধিনে রয়েছে।