আইনের লোক হয়েও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করা এবং সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট অপরাধের প্রমাণ থাকার পরও স্রেফ ‘পুলিশ’ পরিচয়ের ক্ষমতাবলে পার পেয়ে যাওয়ার এক নির্মম ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের বিয়াড়াঘাট এলাকায়।
ঘটনার দীর্ঘ ৫ মাস অতিবাহিত হলেও মামলার প্রধান আসামি, গাজীপুর হাইওয়ে থানায় কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল মো. রুবেলকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো প্রভাব খাটিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার চাপ এবং জামিনে এসে দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়ার কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ৮ ফেব্রুয়ারি রোববার সকালে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে পুলিশ সদস্য মো. রুবেল তার সহযোগীদের নিয়ে ধারালো অস্ত্র, লোহার রড ও লাঠিসোঁটা সহ বিয়াড়াঘাট এলাকার একটি মনোহারী দোকানে অতর্কিত হামলা চালায়।
হামলার পুরো নৃশংস দৃশ্যটি দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ কনস্টেবল রুবেল নিজে তার দলবল নিয়ে দোকানে ঢুকে এলোপাতাড়ি কোপাতে ও মারধর করতে শুরু করে। হামলায় রামগাতী গ্রামের ব্যবসায়ী মো. বাবলু মন্ডল গুরুতর আহত হন, তার মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। ভাইকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে মো. হযরত মন্ডলের হাত ভেঙে দেওয়া হয়। পরিবারের আরও বেশ কয়েকজন সদস্য সেদিন রক্তাক্ত ও আহত হন।
ঘটনার পর মামলা দায়ের এবং সিসিটিভি ফুটেজের মতো অকাট্য প্রমাণ থাকার পরও প্রধান আসামি রুবেলকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। এরই মধ্যে মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রুবেল পুলিশ সদস্য হওয়ায় প্রশাসন তাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।
আদালতে কয়েকবার হাজিরা হলেও, অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আদালত মীমাংসার শর্তে আসামিদের জামিন মঞ্জুর করেন। আর এই জামিনের সুযোগ নিয়ে বাইরে এসে রুবেল ও তার পরিবার আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
আমাদের ওপর অন্যায়ভাবে হামলা হলো, ভাইটার হাত ভেঙে দেওয়া হলো, সিসিটিভি ফুটেজে সব স্পষ্ট। তাও পুলিশ তাকে ধরল না। এখন আদালত মীমাংসার কথা বলে জামিন দিচ্ছে। সেই জামিন পেয়ে তারা বাইরে এসে আমাদের মামলা তুলে নিতে বলছে। টাকার বিনিময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ভাড়া করে আমাদের প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা এখন নিজেদের ঘরেই চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এটি কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয় দাবি করে তারা প্রশ্ন তোলেন, কেন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এই ঘটনায় হস্তক্ষেপ করছে এবং বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
অভিযোগের বিষয়ে রুবেলের পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা হামলার কথা স্বীকার করলেও এর পেছনে পাল্টা মারধরের দাবি তোলেন। তাদের দাবি, গত ৭ ফেব্রুয়ারি সকালে রুবেলের বাবাকে এবং ঘটনার দিন সকালে তার চাচাকে মারধর করা হয়েছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই এই মারধরের ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও এলাকাবাসীর মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন আইনের রক্ষক কি তবে আইনের ঊর্ধ্বে?
একটি মহল বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে একদলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, যা পুরো বিচার ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। টাকার বিনিময়ে অবলীলায় রফাদফার চেষ্টা এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠরোধ করার এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধটুকুও হারিয়ে যাবে।
ভুক্তভোগী পরিবার এবং বিয়াড়াঘাট এলাকার সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে এই প্রভাবশালী পুলিশ সদস্য রুবেল ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আর কোনো আইনের লোক সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করার সাহস না পায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক। জনতার কণ্ঠ.কম। 

















