বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্রে যখন একের পর এক বন্দর যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতায় ধাক্কা খাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর দেখিয়েছে ভিন্ন এক গল্প। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার চাপকে অতিক্রম করে কনটেইনার হ্যান্ডলিং, কার্গো পরিবহন, জাহাজ পরিচালনা এবং রাজস্ব আয়ে একযোগে রেকর্ড গড়ে বন্দরটি প্রমাণ করেছে- দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন থাকলে সংকটও হতে পারে সাফল্যের সুযোগ।
বিশ্বের অনেক আঞ্চলিক বন্দরে যেখানে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে, সেখানে চট্টগ্রাম বন্দর শুধু প্রবৃদ্ধিই অর্জন করেনি; বরং ইতিহাসের সর্বোচ্চ কনটেইনার হ্যান্ডলিং, সর্বোচ্চ জাহাজ পরিচালনা এবং সর্বোচ্চ রাজস্ব উদ্বৃত্তের রেকর্ড গড়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক বছরে বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং লজিস্টিক সমন্বয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের চাপ বাড়লেও কার্যকর পরিকল্পনা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কারণে সার্বিক কার্যক্রমে গতি বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
বন্দর সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের ফলে জাহাজ ঘোরাঘুরি সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে যেখানে একাধিক দিন জাহাজের গড় অবস্থান সময় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল, যা বন্দরের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অপারেশনাল সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পর উৎপাদনশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড দায়িত্ব নেওয়ার পর কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বন্দর সূত্রে জানা গেছে। একই সময়ে ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের ফলে ধারণ ক্ষমতাও আগের তুলনায় বেড়েছে।
কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বাল্ক কার্গোর পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এক বছরে বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১৩ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা শিল্প ও আমদানি খাতে চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করছে।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সময়ে বন্দরের মোট আয় ছিল ৪ হাজার ৯৫২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। একই সময়ের পরবর্তী অর্থবছরে (২০২৫-২৬ জুলাই থেকে মে) আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বন্দরের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। একইসঙ্গে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে রাজস্ব উদ্বৃত্ত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই সময়ে বন্দরটির রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। কর, ভ্যাট ও অন্যান্য সরকারি ব্যয় পরিশোধের পর নিট উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও এমন প্রবৃদ্ধি বন্দরের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নীতি-নির্ধারণের প্রতিফলন।
গত পাঁচ বছরের আর্থিক পরিসংখ্যানেও ধারাবাহিক উন্নতির চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ওই বছর রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৪ সালে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, ২০২৩ সালে ২ হাজার ১৪৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা রাজস্ব উদ্বৃত্ত অর্জিত হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাসের ফলে গত দুই বছরে রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যয় প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ছিল ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। এর বিপরীতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
বন্দর সূত্র আরও জানায়, গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর সরকারি কোষাগারে মোট ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। এরমধ্যে কর হিসেবে ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮ লাখ টাকা, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হিসেবে ৩ হাজার ৪২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং কর-বহির্ভূত আয় (এনটিআর) হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এটি জাতীয় রাজস্ব আহরণেও বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতিফলন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। ২০২৪ সালে ছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউস। এক বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২ টিইইউস, প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। এটি বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ কনটেইনার হ্যান্ডলিং রেকর্ড।
একই বছরে আমদানি-রপ্তানি কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ৩৯ হাজার ৮৩ হাজার ১৪ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন বেশি পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বিস্তৃতি নির্দেশ করে।
জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রেও রেকর্ড তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে মোট ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ পরিচালনা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৫৭টি। অর্থাৎ এক বছরে ৪০৬টি জাহাজ বেশি পরিচালিত হয়েছে, প্রবৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ। কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ- তিনটি ক্ষেত্রেই এটি বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে অনলাইন ই-মুট পাস, অনলাইন বিল জেনারেশন এবং ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এতে কার্যক্রমে গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদিনেই সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৬১টি ই-মুট পাস ইস্যু করা হয়, যা ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার একটি নতুন রেকর্ড।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ইউএস কোস্ট গার্ডের পরিদর্শনে ইতিবাচক স্বীকৃতি পাওয়ায় বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৭০ হাজার বর্গমিটার ইয়ার্ড নির্মাণ, আধুনিক হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট সংযোজন এবং লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলমান রয়েছে। এসব উদ্যোগ বন্দরের ধারণক্ষমতা ও দ্রুত সেবা প্রদানের সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প এবং ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বে-টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অংশীজনদের সহযোগিতার ফলে বন্দরের কার্যক্রমে এই রেকর্ড অর্জিত হয়েছে। টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমানো, বার্থ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি বন্দরের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে। বন্দর, কাস্টমস, শিপিং এজেন্ট, টার্মিনাল অপারেটর এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও সেবার মানে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষকরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সাফল্যের গুরুত্ব বোঝার জন্য বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের বেশ কয়েকটি বন্দর রেড সি সংকট ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নে কার্যক্রমে চাপের মুখে পড়ে। এশিয়ার বহু বন্দরে জাহাজজট ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। এমন বাস্তবতায় চট্টগ্রাম বন্দর জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমিয়ে, ইয়ার্ড সক্ষমতা বাড়িয়ে এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে উল্টো উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে ৩৪ লাখের বেশি টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর এখন দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর কাতারে আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর ও বে-টার্মিনাল বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্রই নয়, বরং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাবেও পরিণত হতে পারে।

ন্যাশনাল ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম। 


















