সিরাজগঞ্জ , মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo বিয়ে নিয়ে জটিলতার পরদিন গাছে মিলল কলেজছাত্রীর মরদেহ Logo আবুধাবিতে রাশিয়া-ইউক্রেন বৈঠকের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের Logo কর্মক্ষম মানুষের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছে না বাংলাদেশ Logo গ্রীষ্মের আগেই ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে: প্রধানমন্ত্রী Logo শাহরুখকে জন্মদিনের শুভেচ্ছায় কারিনার বিশেষ বার্তা Logo এভারেস্টে অবতরণের সময় দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ভারতীয় পর্যটক Logo মুক্তি পেয়েই জামায়াত আমিরের বাসায় আখতারুজ্জামান Logo খুলনায় নদীর চরে মিলল দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ Logo ঘুষ লেনদেনের সময় আটক লালবাগ সার্কেলের সার্ভেয়ার Logo শ্রমিক সেজে নাশকতার চেষ্টা, আ.লীগের ৩৩ জন গ্রেপ্তার

উল্লাপাড়ায় ছাগলের খামার গড়ে স্বাবলম্বী তৃতীয় লিঙ্গের স্বপ্না

ছোটবেলায় বাবা-মা নাম রেখেছিলেন স্বপন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছেন। তবে জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বপন থেকে আজ তিনি স্বপ্না। সমাজের অবহেলা, কটূক্তি ও নানা প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে শুরু করেন ছাগল পালন। মাত্র দুটি ছাগল দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন তাঁর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। ছাগল পালন করেই সংসার চালানোর পাশাপাশি খামারটি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন তৃতীয় লিঙ্গের স্বপ্না।

 

 

 

 

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর মিলপাড়া এলাকায় রেলওয়ের জায়গায় বসবাস করেন স্বপ্না (২৩)। তাঁর বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা নুরজাহান বেগম। আর্থিক অনটন ও সামাজিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের চেষ্টায় স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি।

 

 

 

 

স্বপ্না জানান, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হওয়ায় জীবিকার তাগিদে একসময় তাঁকে অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে হতো। এ সময় নানা ধরনের কটূক্তি ও নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজেই কিছু করবেন। সেই চিন্তা থেকেই ছাগল পালনের উদ্যোগ নেন তিনি।

 

 

 

 

প্রথমে বাবা-মায়ের কাছ থেকে দুটি ছাগল নিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করেন স্বপ্না। তাঁর মা নুরজাহান বেগম জানান, তাঁদের নিজস্ব কোনো জমিজমা নেই। রেলওয়ের জায়গায় বসবাস করেন তাঁরা। সংসার চালাতেও নানা কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। পাশের বাড়ির একজনকে ছাগল পালন করতে দেখে স্বপ্নারও ছাগল কেনার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে তাঁর বাবা ১৩ হাজার ও ১৪ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনে দেন। সেই দুটি ছাগল দিয়েই শুরু হয় স্বপ্নার খামার।

 

 

 

 

শুরুতে অল্প কয়েকটি ছাগল নিয়ে পালন শুরু করলেও ধীরে ধীরে খামার বড় করার চেষ্টা করেন তিনি। একপর্যায়ে ছাগলের সংখ্যা ১২টিতে উন্নীত হয়। কিন্তু হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে ছয়টি ছাগল মারা যায়। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি ছাগল মারা যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাঁকে। তবে সব প্রতিকূলতা সামলে আবারও ঘুরে দাঁড়ান স্বপ্না। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। এসব ছাগলের মধ্যে তোতা, হরিয়ানা, বিটল, যমুনাপাড়ি ও ব্ল্যাক বেঙ্গলসহ বিভিন্ন জাত রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতিটি ছাগলের বাজারমূল্য ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।

 

 

 

 

 

স্বপ্নার ভাষ্য, খামারের ছাগলের পাঠা প্রজননের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। এ ছাড়া বছর শেষে বিক্রির উপযোগী ছাগল বিক্রি করেও ভালো অর্থ পাওয়া যায়। গত বছর চট্টগ্রামে বিভিন্ন পূজা উপলক্ষে ১০টি ছাগল বিক্রি করে মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

 

 

 

 

স্বপ্না বলেন, “আমি চাই না, জীবিকার জন্য আর কারও কাছে হাত পাততে হোক। এই খামার দিয়েই আমার সংসার চলে। অনেক কষ্ট করে খামারটি দাঁড় করিয়েছি। মাঝেমধ্যে ছাগল মারা যাওয়ায় লোকসানও হয়েছে। তারপরও হাল ছাড়িনি। আমার স্বপ্ন, খামারটিকে আরও বড় করা। সরকার যদি আমাকে সহযোগিতা করে, তাহলে আরও উন্নতভাবে ছাগল পালন করতে পারব। স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও উদাহরণ তৈরি করতে চাই।”

 

 

 

 

সমাজের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্নার এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে সীমিত সামর্থ্য নিয়েও জীবিকার পথ তৈরি করা সম্ভব। তাঁর প্রত্যাশা, সরকারি সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে খামারটি আরও সম্প্রসারণ করতে পারবেন। এতে নিজের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্নও পূরণ হবে।

 

 

 

জনতার কণ্ঠ/জেডএইচ

 

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিয়ে নিয়ে জটিলতার পরদিন গাছে মিলল কলেজছাত্রীর মরদেহ

উল্লাপাড়ায় ছাগলের খামার গড়ে স্বাবলম্বী তৃতীয় লিঙ্গের স্বপ্না

আপডেট টাইম : ১১:৫৩:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ছোটবেলায় বাবা-মা নাম রেখেছিলেন স্বপন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছেন। তবে জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বপন থেকে আজ তিনি স্বপ্না। সমাজের অবহেলা, কটূক্তি ও নানা প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে শুরু করেন ছাগল পালন। মাত্র দুটি ছাগল দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন তাঁর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। ছাগল পালন করেই সংসার চালানোর পাশাপাশি খামারটি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন তৃতীয় লিঙ্গের স্বপ্না।

 

 

 

 

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর মিলপাড়া এলাকায় রেলওয়ের জায়গায় বসবাস করেন স্বপ্না (২৩)। তাঁর বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা নুরজাহান বেগম। আর্থিক অনটন ও সামাজিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের চেষ্টায় স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি।

 

 

 

 

স্বপ্না জানান, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হওয়ায় জীবিকার তাগিদে একসময় তাঁকে অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে হতো। এ সময় নানা ধরনের কটূক্তি ও নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজেই কিছু করবেন। সেই চিন্তা থেকেই ছাগল পালনের উদ্যোগ নেন তিনি।

 

 

 

 

প্রথমে বাবা-মায়ের কাছ থেকে দুটি ছাগল নিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করেন স্বপ্না। তাঁর মা নুরজাহান বেগম জানান, তাঁদের নিজস্ব কোনো জমিজমা নেই। রেলওয়ের জায়গায় বসবাস করেন তাঁরা। সংসার চালাতেও নানা কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। পাশের বাড়ির একজনকে ছাগল পালন করতে দেখে স্বপ্নারও ছাগল কেনার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে তাঁর বাবা ১৩ হাজার ও ১৪ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনে দেন। সেই দুটি ছাগল দিয়েই শুরু হয় স্বপ্নার খামার।

 

 

 

 

শুরুতে অল্প কয়েকটি ছাগল নিয়ে পালন শুরু করলেও ধীরে ধীরে খামার বড় করার চেষ্টা করেন তিনি। একপর্যায়ে ছাগলের সংখ্যা ১২টিতে উন্নীত হয়। কিন্তু হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে ছয়টি ছাগল মারা যায়। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি ছাগল মারা যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাঁকে। তবে সব প্রতিকূলতা সামলে আবারও ঘুরে দাঁড়ান স্বপ্না। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। এসব ছাগলের মধ্যে তোতা, হরিয়ানা, বিটল, যমুনাপাড়ি ও ব্ল্যাক বেঙ্গলসহ বিভিন্ন জাত রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতিটি ছাগলের বাজারমূল্য ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।

 

 

 

 

 

স্বপ্নার ভাষ্য, খামারের ছাগলের পাঠা প্রজননের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। এ ছাড়া বছর শেষে বিক্রির উপযোগী ছাগল বিক্রি করেও ভালো অর্থ পাওয়া যায়। গত বছর চট্টগ্রামে বিভিন্ন পূজা উপলক্ষে ১০টি ছাগল বিক্রি করে মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

 

 

 

 

স্বপ্না বলেন, “আমি চাই না, জীবিকার জন্য আর কারও কাছে হাত পাততে হোক। এই খামার দিয়েই আমার সংসার চলে। অনেক কষ্ট করে খামারটি দাঁড় করিয়েছি। মাঝেমধ্যে ছাগল মারা যাওয়ায় লোকসানও হয়েছে। তারপরও হাল ছাড়িনি। আমার স্বপ্ন, খামারটিকে আরও বড় করা। সরকার যদি আমাকে সহযোগিতা করে, তাহলে আরও উন্নতভাবে ছাগল পালন করতে পারব। স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও উদাহরণ তৈরি করতে চাই।”

 

 

 

 

সমাজের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্নার এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে সীমিত সামর্থ্য নিয়েও জীবিকার পথ তৈরি করা সম্ভব। তাঁর প্রত্যাশা, সরকারি সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে খামারটি আরও সম্প্রসারণ করতে পারবেন। এতে নিজের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্নও পূরণ হবে।

 

 

 

জনতার কণ্ঠ/জেডএইচ