পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। দুপাশে সবুজের সমারোহ। কোথাও পাহাড়ের ঢালে সারি সারি গাছপালা, কোথাও বাঁশঝাড়। সবুজের আড়াল ভেদ করে কোথাও উঁকি দেয় টিনের ছাউনি কিংবা বাঁশে তৈরি পাহাড়ি বাড়ি। প্রকৃতি ও মানুষের এমন নিবিড় সহাবস্থানে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়নের ওয়াছুর পাহাড়ি সড়ক যেন হয়ে উঠেছে জীবন্ত এক ছবির ক্যানভাস।
এই পথ ধরে চলতে গেলে পাহাড়ি জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার দেখা মেলে। রাস্তার পাশে ছোট টং দোকানে স্থানীয়দের চায়ের আড্ডা, কোথাও ছক্কা-গুটির খেলায় মেতে আছেন কয়েকজন, আবার খোলা জায়গায় দল বেঁধে ফুটবল খেলায় ব্যস্ত কিশোর-তরুণরা। ব্যস্ত নগরজীবন থেকে দূরে এসব দৃশ্য যেন তুলে ধরে পাহাড়ি জনপদের সহজ-সরল জীবন।
তবে এসব চেনা দৃশ্যের মাঝেই পথচারীদের চোখ আটকে যাচ্ছে ভিন্ন এক সৌন্দর্যে। সবুজ পাতার ফাঁক গলে ফুটে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তিম ফুল। উজ্জ্বল লাল রঙের ফুলগুলো পাহাড়ি সবুজের বুকজুড়ে যেন ছড়িয়ে দিয়েছে আগুনরাঙা সৌন্দর্য। স্থানীয়ভাবে ‘লালভান্ডি’ নামে পরিচিত এ ফুল ‘প্যাগোডা ফুল’ নামেও পরিচিত।
মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়নের ওয়াছুর এলাকার বাসিন্দা তাহের মিয়ার বাড়ির সামনে দেখা গেছে এমন একটি ফুলগাছ। একইভাবে ওয়াছুরের রাম্রাচাইয়ের বাড়ির আঙিনাতেও রয়েছে লালভান্ডির গাছ। স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকার আরও কয়েকটি বাড়ির আঙিনায় দেখা যায় দৃষ্টিনন্দন এ ফুল। ফুল ফুটলে বাড়ির আশপাশের সৌন্দর্যও বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
প্যাগোডা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum paniculatum। ইংরেজিতে এটি ‘Pagoda Flower’ নামে পরিচিত। ফুলগুলো স্তরে স্তরে গুচ্ছাকারে সাজানো থাকে বলে দূর থেকে এর পুষ্পমঞ্জরি অনেকটা প্যাগোডার মতো দেখায়। অসংখ্য ছোট লাল বা কমলা-লাল ফুল একসঙ্গে ফুটে বড় ও আকর্ষণীয় পুষ্পমঞ্জরি তৈরি করে।
ওয়াছুরের বাসিন্দা তাহের মিয়া বলেন, ‘বনে কাজ করতে গিয়ে ফুলটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে একটি গাছ বাড়িতে এনে লাগিয়েছিলাম। এখন সেই গাছে ফুল ফুটেছে। ফুল ফুটলে পুরো জায়গাটিই যেন অন্যরকম সুন্দর হয়ে ওঠে। পথ দিয়ে যাতায়াতের সময় অনেকেই এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ কেউ ফুলটির ছবি তুলে নিয়ে যান।’
স্থানীয় বাসিন্দা রাম্রাচাই বলেন, ‘আত্মীয়ের বাড়িতে ফুলটি দেখে ভালো লাগায় একটি গাছ এনে বাড়িতে লাগিয়েছিলাম। এখন সেই গাছে ফুল ফুটেছে। পাহাড়ে নানা ফুল দেখা গেলেও এর রং ও গুচ্ছাকারে ফুটে থাকার সৌন্দর্য আলাদা।’
পথচারী আবদুর রহমান বলেন, ‘রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ সবুজের মধ্যে লাল ফুলগুলো চোখে পড়ে। প্রথমে মনে হয়েছিল কোনো বিশেষ জাতের ফুল। কাছে গিয়ে দেখি অসংখ্য ছোট ফুল একসঙ্গে ফুটে আছে। সত্যিই দেখলেই থমকে দাঁড়াতে হয়।’
প্রকৃতিপ্রেমী জাফর মিয়া বলেন, ‘পাহাড়ের সৌন্দর্য শুধু বড় বড় পাহাড় কিংবা ঝরনায় নয়; এমন ছোট ছোট ফুলও পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্য বহন করে। এসব উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা দরকার।’
মাটিরাঙ্গা উপজেলা উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, ‘লালভান্ডি বা প্যাগোডা ফুল একটি আকর্ষণীয় শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে এ ধরনের উদ্ভিদের উপস্থিতি জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে। অপ্রয়োজনে গাছ কেটে ফেলা বা ফুলের গাছ নষ্ট না করে এগুলো সংরক্ষণ করা উচিত।’
পাহাড়ের সৌন্দর্য বহুরূপী। কখনো মেঘ, কখনো কুয়াশা, কখনো ঝরনা, আবার কখনো নাম না-জানা ফুল সেই সৌন্দর্যে যোগ করে নতুন মাত্রা। মাটিরাঙ্গার ওয়াছুর পাহাড়ি পথেও তেমনই এক নীরব সৌন্দর্যের গল্প বলছে প্যাগোডা ফুল। সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে উঁকি দেওয়া রক্তিম ফুলগুলো যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে—প্রকৃতির সৌন্দর্য সবসময় বড় আয়োজন করে আসে না; কখনো পথের ধারে কিংবা কারও বাড়ির আঙিনাতেই লুকিয়ে থাকে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্প।

ন্যাশনাল ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 
























