অতীতের সংসদগুলোর মতো বয়কট বা সাংঘর্ষিক রাজনীতির বদলে এবার সংসদে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আভাস মিলছে। একদিকে সরকারি দল ‘ঐকমত্যের ভিত্তিতে’ দেশ পরিচালনার কথা বলছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী জোটগুলোও সহিংসতা এড়িয়ে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সংসদে শক্ত ভূমিকা রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
সমন্বয়ের বার্তা সরকারি ও বিরোধী দলের হুইপদের
সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে এরই মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়েছে সরকারি ও বিরোধী উভয় শিবিরে। সোমবার (৯ মার্চ) সংসদ ভবনে চিফ হুইপের কার্যালয়ে এক বিরল ও ইতিবাচক দৃশ্য দেখা যায়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলামের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা।
বৈঠকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।
অধিবেশন শুরুর আগের দিন, অর্থাৎ আগামীকাল বুধবার (১১ মার্চ) সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত সরকারি দলীয় সভাকক্ষে বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি দলের প্রথম সংসদীয় সভা।
সোমবার (৯ মার্চ) জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) সভাপতিত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
সভায় সরকারি দলের সব সংসদ সদস্যকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, এই সভায় সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংসদীয় কার্যপ্রণালি নিয়ে দলীয় এমপিদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। এছাড়া বৃহস্পতিবার শুরু হতে যাওয়া প্রথম অধিবেশনেই অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন ও অনুমোদনের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
ত্রয়োদশ সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা জোটগুলোর ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহল ছিল। জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় বিরোধী জোট সংসদে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার নীতি গ্রহণ করেছে।
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সম্প্রতি এক বক্তব্যে রাজনীতি থেকে ‘প্রতিহিংসার বিষ’ এবং ‘দুর্নীতির ক্যানসার’ দূর করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গত ৫৫ বছরের মতো ভবিষ্যতেও দেশ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না, যদি আমরা রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে না পারি। আমরা কেবল আসনের জন্য রাজনীতি করি না, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করি।
সমমনা ১২ দলীয় জোটের ঐক্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা জোটগতভাবে যখন বসেছি, তখন একটি কথাই বলেছি— আমরা শুধু আসনের জন্য আসিনি, জনগণের ভোটাধিকার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছি। প্রিয় বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আমরা কখনো বেইমানি করব না। সস্তা কোনো সুযোগ-সুবিধা আমাদের পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ৫৪ বছরের বঞ্চনার পর আমাদের যুবসমাজের নেতৃত্বে যে পরিবর্তন এসেছে, সেই যুবসমাজকে আমরা চিরতরে বুকে ধারণ করে রাখব। তাদের একটাই স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আমরাও সর্বক্ষেত্রে সুবিচার চাই। স্বজনপ্রীতি বা দলপ্রীতি আমরা আর দেখতে চাই না। ইতিহাস কাউকে ছেড়ে কথা বলে না।
ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জামায়াত আমির বলেন, আমাদের লড়াই কোনো নির্দিষ্ট দলের বিজয়ের জন্য নয়। এই লড়াই হবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়ের লড়াই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, আগামী ১২ মার্চের জাতীয় সংসদের অধিবেশন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। কারণ অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। সেই ধারাবাহিকতায় বিরোধী দল সংসদে কার্যকর ভূমিকা পালন করলে সমৃদ্ধ দেশ গঠন সহজ হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেছেন, আমরা সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চাই। গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চাই।

ন্যাশনাল ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 

















