সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে চাপের মুখে গার্মেন্টস শিল্প

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দেশের রপ্তানি শিল্প বড় ধরণের সংকটের মুখে পড়েছে।

 

 

 পণ্য উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অর্ডার সম্পন্ন করতেও বাড়তি সময় (লিড টাইম) লাগছে।

 

এছাড়া যুদ্ধের কারণে জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো কম দামে ও দ্রুত সরবারহ পাওয়া যায় এমন উৎস থেকে পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের রপ্তানি খাত নিয়ে নানাবিধ সংকট দেখছেন উদ্যোক্তারা।
 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দুইভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

 

 

উদ্যোক্তারা বলছেন,  হরমুজ প্রনালী দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগের মতো জ্বালানি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।

 

 

বাড়তি দাম দিয়েও সময় এবং চাহিদা মতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এই দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কালোবাজারিরা অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত সরকার ভর্তুকি দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ রাখলেও যথেষ্ট সরবারহ পাওয়া যাচ্ছে না।
 ফলে উৎপাদনের জন্য পুরোপুরি সময়কে কাজে লাগানো যাচ্ছে না, এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

 

 

 দেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরণের প্রভাব ফেলছে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ। যুদ্ধের পরোক্ষ বা মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি সবচেয়ে বড় ক্ষতি। বাংলাদেশকে সব চেয়ে বেশি এই ক্ষতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

 

 

যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে সেখানকার মানুষ খরচ কমিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মার্চ শেষে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩.৫৪ শতাংশ কমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে যা ছিল দশমিক ৭৪ শতাংশ।

 

 

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে ইউরোপ আগে থেকেই উচ্চমূল্য ও সেখানকার অর্থনীতি কিছুটা ধীর অবস্থার কবলে পড়ে। তাদের জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়েছে, আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিচ্ছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ইউরোপিয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রপ্তানি সংকুচিত হয়েছে ৭ শতাংশ। আগের মাস ফেব্রুয়ারি শেষে এই সংকোচনের হার ছিল ৫.৪৯ শতাংশ।

 

 

যুক্তরাজ্যের একক বাজারে মার্চ শেষে তৈরি পোশাক রপ্তানির সংকুচিত হয়েছে ১.৬১ শতাংশ; আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে এই সংকোচনের হার ছিল ১.২২ প্রবৃদ্ধি শতাংশ।

 

 

অবশ্য চীন ও ভারতের সস্তা তৈরি পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে চলতি অর্থবছরের আগস্ট থেকেই ইউরোপিয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমতে শুরু করে।

 

 

জানা গেছে, চীন ও ভারত রাশিয়ার কম দামের জ্বালানি পেয়ে গত কয়েকবছর ধরেই উৎপাদন কমিয়ে আনতে পেরেছে। বাংলাদেশ সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। উল্টো বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

 

 

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনে দেশের প্রধান বাজার ইউরোপে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। তৈরি পোশাকের বাজার সংকোচনের শঙ্কা ঘনিভূত হয়েছে।

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেন্দ্র করে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিদ্যামান অন্য সমস্যাগুলো একত্রিত হয়ে রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় দেওয়াল তৈরি করেছে বলে মনে করছেন নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

 

 

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। প্রতিদিন ২-৩ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কাজ না হলেও শ্রমিকদের পূর্ণ বেতন দিতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে জেনারেটর চালানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য জ্বালানির অগ্রাধিকার থাকলেও অনেক সময় পাম্পে তেল না থাকায় এই সুবিধা কোনো কাজে আসছে না।

 

 

বিকেএমই সভাপতি বলেন, মার্চ মাসে রপ্তানি আয় প্রায় ১৯.৭৮ শতাংশ কমেছে। এর আগের মাসে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমেছে। একই সময়ে ইউরোপের বাজারে তুরস্কের রপ্তানি বেড়েছে।

 

 

এর কারণ হলো ইউরোপের ক্রেতারা তুলনামূলক কাছের এবং কম সময়ে পোশাক সরবারহ পাওয়া যায় এমন উৎসের দিকে ঝুঁকছে। যুদ্ধের কারণে পরিবহন সংকটের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে সমস্যাও আরও বাড়বে।

 

 

আগে থেকেই ট্রাম্প ট্রারিফ সমস্যা তৈরি করেছে উল্লেখ করে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের কারণে চীন তাদের দৃষ্টি ইউরোপের বাজারের দিকে দিয়েছে। কম দামে পণ্য সরবরাহ করায় চীনের বাজার বাড়ছে। ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি যে হারে কমেছে, চীনের রপ্তানি তার চেয়ে কম হারে কমেছে।

 

 

‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে রপ্তানি পণ্য বোঝাই জাহাজগুলো এখন উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে গন্তব্যে পৌছাচ্ছে। এতে পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে অর্ডার ডেলিভারি লিড টাইম ৮-১০ দিন বেড়েছে। কন্টেইনার প্রতি ফ্রেইট চার্জ ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। একারণে তৈরি পোশাকের ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্রেতাই এখন কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে হিসাব নিকাশ করছে,’ যোগ করেন মোহাম্মদ হাতেম।

 

 

তিনি বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পরপরই জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নিয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এবং বিপিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ করা হয়েছিল। এ বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি উন্নতি হয়নি।

 

 

জ্বালানি সমস্যার সমাধান হলে রপ্তানি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বন্দরে কোনো জট নেই। মূল সমস্যা এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট।

 

 

মার্চ মাসে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বড় একটি থাক্কা লেগেছে। এ অবস্থা গত বছরের আগস্ট থেকে শুরু হয়ে চলতি বছরের মার্চ মাসে যুদ্ধ অবস্থার মধ্যে এসে ভংঙ্কর অবস্থা ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা্ পরিচালক শোভন ইসলাম।

 

 

তিনি বাংলানিউজক বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্বছরের জুলাই মাসেও প্রবৃদ্ধি ছিল, তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। মার্চ মাসে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বড় একটি ধাক্কা লেগেছে। জুলাই থেকে মার্চ অবধি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম রপ্তানি হয়েছে। এরমধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ১৫ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ শতাংশ কমেছে।

 

 

তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী এখন প্রত্যক্ষ পরোক্ষ দুইভাবে প্রভাব ফেলছে। যেহেতু হরমুজ সমস্যা আছে, সেজন্য এখন লোহিত সাগর দিয়েও জাহাজ যাচ্ছে না। সেখানে হুতিরা কখন আবার ডিস্টার্ব করে বসে। সেজন্য অনেক জাহাজই ঘুরে যাচ্ছে, এজন্য জাহাজের খরচ বেড়ে গেছে, লিড টাইম বেড়ে গেছে। সর্বপরি এতে ইন্স্যুরেন্সের খরচ বেড়ে গেছে। জ্বালানি যে একমাত্র রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছে এমন না। আমাদের পুরো সাপ্লাই চেইন নড়বড়ে করে দিয়েছে। পণ্য রপ্তানির খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।’

 

 

দেশের প্রধান এ রপ্তানি খাতের এই অবস্থাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিৎ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাপড় আমদানির ওপর অনেকটা নির্ভর করে; এই কাপড় এবং সুতা আমদানি অনেক কমে গেছে। যুদ্ধের বড় ব্যাপারটি যোগ হওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে। ব্যাংকিং ঋণ সহায়তার অভাব, উচ্চ সুদহারসহ নানা কারণে অনেক ফ্যাক্টরি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে; অনেক ফ্যাক্টরি খারাপ অবস্থায় আছে। সব মিলিয়ে আমরা একটা বাড়তি ঝামেলায় আছি।’

 

 

তিনি বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তোরণে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য নীতি সহায়তা চালু, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা দূর, বিশেষ করে সুদহার কমিয়ে আনা, কোভিডকালিন সময়ের মতো যুদ্ধাবস্থায়  নীতি সহায়তা চালু এবং এক্সপোর্ট ডেভোলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যার আওতায় কার্যাদেশ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তারা কিছু মূলধনী যন্ত্রপাতি সংগ্রহের সুবিধা পেতে পারে। যেহেতু রপ্তানি কমে যাচ্ছে, প্রতি মাসের খরচ যাতে সামাল দেওয়া যায় সেজন্য এই সুবিধাগুলো দরকার। এসব সুবিধা চালু হলে যুদ্ধাবস্থায় কারখানা বন্ধ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতো।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অদম্য পলি রানী: পা দিয়ে লিখেই দিচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা

বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে চাপের মুখে গার্মেন্টস শিল্প

আপডেট টাইম : ০৪:৫২:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দেশের রপ্তানি শিল্প বড় ধরণের সংকটের মুখে পড়েছে।

 

 

 পণ্য উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অর্ডার সম্পন্ন করতেও বাড়তি সময় (লিড টাইম) লাগছে।

 

এছাড়া যুদ্ধের কারণে জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো কম দামে ও দ্রুত সরবারহ পাওয়া যায় এমন উৎস থেকে পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের রপ্তানি খাত নিয়ে নানাবিধ সংকট দেখছেন উদ্যোক্তারা।
 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দুইভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

 

 

উদ্যোক্তারা বলছেন,  হরমুজ প্রনালী দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগের মতো জ্বালানি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।

 

 

বাড়তি দাম দিয়েও সময় এবং চাহিদা মতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এই দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কালোবাজারিরা অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত সরকার ভর্তুকি দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ রাখলেও যথেষ্ট সরবারহ পাওয়া যাচ্ছে না।
 ফলে উৎপাদনের জন্য পুরোপুরি সময়কে কাজে লাগানো যাচ্ছে না, এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

 

 

 দেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরণের প্রভাব ফেলছে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ। যুদ্ধের পরোক্ষ বা মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি সবচেয়ে বড় ক্ষতি। বাংলাদেশকে সব চেয়ে বেশি এই ক্ষতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

 

 

যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে সেখানকার মানুষ খরচ কমিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মার্চ শেষে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩.৫৪ শতাংশ কমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে যা ছিল দশমিক ৭৪ শতাংশ।

 

 

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে ইউরোপ আগে থেকেই উচ্চমূল্য ও সেখানকার অর্থনীতি কিছুটা ধীর অবস্থার কবলে পড়ে। তাদের জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়েছে, আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিচ্ছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ইউরোপিয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রপ্তানি সংকুচিত হয়েছে ৭ শতাংশ। আগের মাস ফেব্রুয়ারি শেষে এই সংকোচনের হার ছিল ৫.৪৯ শতাংশ।

 

 

যুক্তরাজ্যের একক বাজারে মার্চ শেষে তৈরি পোশাক রপ্তানির সংকুচিত হয়েছে ১.৬১ শতাংশ; আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে এই সংকোচনের হার ছিল ১.২২ প্রবৃদ্ধি শতাংশ।

 

 

অবশ্য চীন ও ভারতের সস্তা তৈরি পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে চলতি অর্থবছরের আগস্ট থেকেই ইউরোপিয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমতে শুরু করে।

 

 

জানা গেছে, চীন ও ভারত রাশিয়ার কম দামের জ্বালানি পেয়ে গত কয়েকবছর ধরেই উৎপাদন কমিয়ে আনতে পেরেছে। বাংলাদেশ সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। উল্টো বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

 

 

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনে দেশের প্রধান বাজার ইউরোপে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। তৈরি পোশাকের বাজার সংকোচনের শঙ্কা ঘনিভূত হয়েছে।

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেন্দ্র করে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিদ্যামান অন্য সমস্যাগুলো একত্রিত হয়ে রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় দেওয়াল তৈরি করেছে বলে মনে করছেন নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

 

 

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। প্রতিদিন ২-৩ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কাজ না হলেও শ্রমিকদের পূর্ণ বেতন দিতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে জেনারেটর চালানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য জ্বালানির অগ্রাধিকার থাকলেও অনেক সময় পাম্পে তেল না থাকায় এই সুবিধা কোনো কাজে আসছে না।

 

 

বিকেএমই সভাপতি বলেন, মার্চ মাসে রপ্তানি আয় প্রায় ১৯.৭৮ শতাংশ কমেছে। এর আগের মাসে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমেছে। একই সময়ে ইউরোপের বাজারে তুরস্কের রপ্তানি বেড়েছে।

 

 

এর কারণ হলো ইউরোপের ক্রেতারা তুলনামূলক কাছের এবং কম সময়ে পোশাক সরবারহ পাওয়া যায় এমন উৎসের দিকে ঝুঁকছে। যুদ্ধের কারণে পরিবহন সংকটের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে সমস্যাও আরও বাড়বে।

 

 

আগে থেকেই ট্রাম্প ট্রারিফ সমস্যা তৈরি করেছে উল্লেখ করে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের কারণে চীন তাদের দৃষ্টি ইউরোপের বাজারের দিকে দিয়েছে। কম দামে পণ্য সরবরাহ করায় চীনের বাজার বাড়ছে। ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি যে হারে কমেছে, চীনের রপ্তানি তার চেয়ে কম হারে কমেছে।

 

 

‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে রপ্তানি পণ্য বোঝাই জাহাজগুলো এখন উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে গন্তব্যে পৌছাচ্ছে। এতে পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে অর্ডার ডেলিভারি লিড টাইম ৮-১০ দিন বেড়েছে। কন্টেইনার প্রতি ফ্রেইট চার্জ ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। একারণে তৈরি পোশাকের ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্রেতাই এখন কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে হিসাব নিকাশ করছে,’ যোগ করেন মোহাম্মদ হাতেম।

 

 

তিনি বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পরপরই জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নিয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এবং বিপিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ করা হয়েছিল। এ বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি উন্নতি হয়নি।

 

 

জ্বালানি সমস্যার সমাধান হলে রপ্তানি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বন্দরে কোনো জট নেই। মূল সমস্যা এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট।

 

 

মার্চ মাসে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বড় একটি থাক্কা লেগেছে। এ অবস্থা গত বছরের আগস্ট থেকে শুরু হয়ে চলতি বছরের মার্চ মাসে যুদ্ধ অবস্থার মধ্যে এসে ভংঙ্কর অবস্থা ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা্ পরিচালক শোভন ইসলাম।

 

 

তিনি বাংলানিউজক বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্বছরের জুলাই মাসেও প্রবৃদ্ধি ছিল, তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। মার্চ মাসে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বড় একটি ধাক্কা লেগেছে। জুলাই থেকে মার্চ অবধি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম রপ্তানি হয়েছে। এরমধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ১৫ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ শতাংশ কমেছে।

 

 

তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী এখন প্রত্যক্ষ পরোক্ষ দুইভাবে প্রভাব ফেলছে। যেহেতু হরমুজ সমস্যা আছে, সেজন্য এখন লোহিত সাগর দিয়েও জাহাজ যাচ্ছে না। সেখানে হুতিরা কখন আবার ডিস্টার্ব করে বসে। সেজন্য অনেক জাহাজই ঘুরে যাচ্ছে, এজন্য জাহাজের খরচ বেড়ে গেছে, লিড টাইম বেড়ে গেছে। সর্বপরি এতে ইন্স্যুরেন্সের খরচ বেড়ে গেছে। জ্বালানি যে একমাত্র রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছে এমন না। আমাদের পুরো সাপ্লাই চেইন নড়বড়ে করে দিয়েছে। পণ্য রপ্তানির খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।’

 

 

দেশের প্রধান এ রপ্তানি খাতের এই অবস্থাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিৎ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাপড় আমদানির ওপর অনেকটা নির্ভর করে; এই কাপড় এবং সুতা আমদানি অনেক কমে গেছে। যুদ্ধের বড় ব্যাপারটি যোগ হওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে। ব্যাংকিং ঋণ সহায়তার অভাব, উচ্চ সুদহারসহ নানা কারণে অনেক ফ্যাক্টরি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে; অনেক ফ্যাক্টরি খারাপ অবস্থায় আছে। সব মিলিয়ে আমরা একটা বাড়তি ঝামেলায় আছি।’

 

 

তিনি বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তোরণে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য নীতি সহায়তা চালু, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা দূর, বিশেষ করে সুদহার কমিয়ে আনা, কোভিডকালিন সময়ের মতো যুদ্ধাবস্থায়  নীতি সহায়তা চালু এবং এক্সপোর্ট ডেভোলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যার আওতায় কার্যাদেশ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তারা কিছু মূলধনী যন্ত্রপাতি সংগ্রহের সুবিধা পেতে পারে। যেহেতু রপ্তানি কমে যাচ্ছে, প্রতি মাসের খরচ যাতে সামাল দেওয়া যায় সেজন্য এই সুবিধাগুলো দরকার। এসব সুবিধা চালু হলে যুদ্ধাবস্থায় কারখানা বন্ধ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতো।