সিরাজগঞ্জ , মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo ৭ নভেম্বর ৬ ঘণ্টার জন্য টোল ফ্রি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে Logo সৌদি আরবে হামলা:পিছিয়েই গেল এশিয়ান কাপ Logo জাজিরার নাওডোবায় মৃত ব্যক্তির নামে দলিল সৃজনের অভিযোগ Logo বিএনপি নেতার ‘ঘাড় থেকে মাথা সরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি স্বেচ্ছাসেবকদল নেতার, ভিডিও ভাইরাল Logo হাসিনা-কামালের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি Logo বঙ্গভবনের ফোনে খুলে যায় কারাগারের দরজা: যেভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে Logo মাদক ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করতে হবে Logo বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে নজিরবিহীন সাইবার চুরি Logo ইরানে মার্কিন হামলার খবরে ফের বাড়ল তেলের দাম Logo ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ

মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার দলই সীমান্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বাঙ্কারে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে সফল অভিযানের পর ফেরার পথে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শাহাদতবরণ করেন তিনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বীরের রক্তে আজও ভিজে রয়েছে দলই সীমান্তের মাটি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার দলই রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামের সন্তান সিপাহি হামিদুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শেষদিকে কমলগঞ্জের দলই সীমান্ত এলাকায় প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। চারদিকে চা বাগান, মাঝখানে ধলাই সীমান্ত চৌকি। দলই সীমান্ত চৌকি থেকে দক্ষিণ-পূর্বদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর শহরে ছিল মুক্তিবাহিনীর সাবসেক্টর ক্যাম্প। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানির হয়ে দলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল করার অভিযানে অংশ নেন সিপাহি হামিদুর রহমান।

সব প্রস্তুতি নিয়ে ২৮ অক্টোবর ভোর রাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল পাক সেনাদের ওপর চতুর্দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। ব্যাপক গোলাবর্ষণে পাক-সেনাদের ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। শক্রু অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছালে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। এ সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেশিনগানের তীব্র গুলিবর্ষণের কারণে মুক্তিবাহিনী সামনে অগ্রসর হতে পারছিল না। তখন পাকিস্তানি মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় হামিদুর রহমানকে।

পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন তিনি। তার ছোড়া দুটি গ্রেনেড সফলভাবে মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানে। এর পরপরই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সে অবস্থাতেই মেশিনগান পোস্টে গিয়ে সেখানকার দুই পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু করেন এবং একপর্যায়ে মেশিনগান পোস্টটি অকার্যকর করে দিতে সক্ষম হন। তার এই বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হয়ে সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করেন। তবে বিজয়ের স্বাদ আস্বাদন করতে পারেননি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। ফাঁড়ি দখলের পর সহযোদ্ধারা তার মরদেহ উদ্ধার করেন এবং সীমান্তের অল্প দূরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়।

স্বাধীনতার পর দলই সীমান্ত ফাঁড়ির বিজিবির (তৎকালীন বিডিআর) পক্ষ থেকে স্থানীয়ভাবে একটি নামফলকস্বরূপ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান দলই সীমান্ত এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করে একটি স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের লিখিত আবেদন ও এলাকাবাসীর দাবিতে ২০০৭ সালের ২৭ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকার শহীদ হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়।

সে অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে তার দেহাবশেষ গ্রহণ করে এবং যথাযথ মর্যাদার সাথে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। পরে ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

উল্লেখ্য, প্রতি বছরের মতো এবারও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের শাহাোতবার্ষিকী উপলক্ষে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, বিজিবি ব্যাটালিয়ন কমান্ড ও কমলগঞ্জ প্রেস ক্লাব দলই সীমান্তে অবস্থিত তার স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করবে।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৭ নভেম্বর ৬ ঘণ্টার জন্য টোল ফ্রি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ

আপডেট টাইম : ০৯:৪৯:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার দলই সীমান্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বাঙ্কারে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে সফল অভিযানের পর ফেরার পথে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শাহাদতবরণ করেন তিনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বীরের রক্তে আজও ভিজে রয়েছে দলই সীমান্তের মাটি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার দলই রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামের সন্তান সিপাহি হামিদুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শেষদিকে কমলগঞ্জের দলই সীমান্ত এলাকায় প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। চারদিকে চা বাগান, মাঝখানে ধলাই সীমান্ত চৌকি। দলই সীমান্ত চৌকি থেকে দক্ষিণ-পূর্বদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর শহরে ছিল মুক্তিবাহিনীর সাবসেক্টর ক্যাম্প। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানির হয়ে দলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল করার অভিযানে অংশ নেন সিপাহি হামিদুর রহমান।

সব প্রস্তুতি নিয়ে ২৮ অক্টোবর ভোর রাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল পাক সেনাদের ওপর চতুর্দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। ব্যাপক গোলাবর্ষণে পাক-সেনাদের ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। শক্রু অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছালে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। এ সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেশিনগানের তীব্র গুলিবর্ষণের কারণে মুক্তিবাহিনী সামনে অগ্রসর হতে পারছিল না। তখন পাকিস্তানি মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় হামিদুর রহমানকে।

পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন তিনি। তার ছোড়া দুটি গ্রেনেড সফলভাবে মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানে। এর পরপরই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সে অবস্থাতেই মেশিনগান পোস্টে গিয়ে সেখানকার দুই পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু করেন এবং একপর্যায়ে মেশিনগান পোস্টটি অকার্যকর করে দিতে সক্ষম হন। তার এই বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হয়ে সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করেন। তবে বিজয়ের স্বাদ আস্বাদন করতে পারেননি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। ফাঁড়ি দখলের পর সহযোদ্ধারা তার মরদেহ উদ্ধার করেন এবং সীমান্তের অল্প দূরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়।

স্বাধীনতার পর দলই সীমান্ত ফাঁড়ির বিজিবির (তৎকালীন বিডিআর) পক্ষ থেকে স্থানীয়ভাবে একটি নামফলকস্বরূপ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান দলই সীমান্ত এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করে একটি স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের লিখিত আবেদন ও এলাকাবাসীর দাবিতে ২০০৭ সালের ২৭ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকার শহীদ হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়।

সে অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে তার দেহাবশেষ গ্রহণ করে এবং যথাযথ মর্যাদার সাথে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। পরে ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

উল্লেখ্য, প্রতি বছরের মতো এবারও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের শাহাোতবার্ষিকী উপলক্ষে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, বিজিবি ব্যাটালিয়ন কমান্ড ও কমলগঞ্জ প্রেস ক্লাব দলই সীমান্তে অবস্থিত তার স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করবে।