সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

ব্যতিক্রমী সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী, বিতর্কে মন্ত্রীদের বক্তব্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন চমকপ্রদ সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসিত হচ্ছেন।

 

 

তবে প্রধানমন্ত্রী সংযমী জীবনযাপন ও প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচনের বার্তা দিলেও কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, মন্ত্রীরা ট্যাক্স ফ্রি সরকারি গাড়ি ও সরকারি বাসভবন নেবেন না।

 

নিজেও গুলশানের ব্যক্তিগত বাসা থেকে দাপ্তরিক কাজ শুরু করেছেন।

 

 

সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার অফিস করে সাম্প্রতিক সময়ের রেওয়াজ ভেঙেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর কমিয়ে আনা হয়েছে, ভিভিআইপি চলাচলের সময় দীর্ঘক্ষণ সড়ক বন্ধ রাখার প্রথাও বাতিল করা হয়েছে। সচিবালয় থেকে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে হেঁটে যাওয়া ও অনুষ্ঠান শেষে হেঁটে ফিরে আসার ঘটনাও মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

 

 

গত শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অফিস করতে যান। কার্যালয়ের মূল ভবনে প্রবেশের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন এবং করমর্দন করেন। তিনি কার্যালয়ের পুরনো অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নাম ধরে কাছে ডেকে কথা বলেন। এ সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এত একান্তভাবে প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পাওয়ায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনা আলোড়ন তোলে।

 

 

সচিবালয় থেকে গুলশান ফেরার পথে এক বেসরকারি চাকরিজীবী নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘এতদিন সাধারণ মানুষ দেখেছে মন্ত্রীরা দীর্ঘ গাড়িবহর নিয়ে চলাচল করেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়ক বন্ধ থেকেছে, যানজটে অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা মিস করেছে, শ্রমিকেরা কাজের সময় হারাচ্ছে। সরকারি সেবা দায়িত্বের চেয়ে সুবিধার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

 

 

আর এবার প্রধানমন্ত্রীর বহরে মাত্র কয়েকটি গাড়ি।

 

 

কোথাও অতিরিক্ত তৎপরতা নেই, নেই হর্ন বা সাইরেনের চাপ। জ্যামে কিংবা সিগনালে সাধারণ যানবাহনের সঙ্গেই চলছিল তার গাড়িবহর।’

 

 

ওই চাকরিজীবী জানান, মগবাজার ফ্লাইওভারে পাশাপাশি এলে তিনি সালাম দিলে প্রধানমন্ত্রীও সালামের উত্তর দেন। তার ভাষায়, এভাবে চলাচল করলে অন্তত রাস্তায় মানুষের ভোগান্তি কমবে।

 

 

রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় কথা হয় কাশেম নামের এক রিকশাচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে ভিআইপি গেলে এক ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। আর সেই জ্যাম সারাদিন ধরে লেগে থাকতো। এবার যদি সত্যি রাস্তা বন্ধ না করে প্রধানমন্ত্রী চলেন, তাহলে আমাদের আয় বাড়বে। মানুষেরও কষ্ট কম হবে।

 

 

প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনিক বৈঠক সচিবালয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বদলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো জোরদার হয়। সরকারি ব্যয় সংকোচন, দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের কথাও জানিয়েছেন।

 

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ হোসেনের মতে, এটি কেবল একটি আচরণগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি প্রতীকী বার্তা। নেতৃত্ব জনগণের ঊর্ধ্বে নয়—বরং জনগণের অংশ। এমন পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।

 

 

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মত ভিন্ন। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রটোকল শিথিল করা হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি থাকা উচিত নয়।

 

 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রম প্রশংসিত হলেও সরকারের শুরুর দিকেই কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে যে অর্থ তোলা হয়, সেটিকে তিনি চাঁদাবাজি মনে করেন না; বরং এটি একটি সমঝোতা বা ব্যবস্থার অংশ।

 

 

তার এই বক্তব্য সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, কারণ চাঁদাবাজি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসা নতুন সরকারের মন্ত্রীর মুখে এমন কথা অনেকেই নেতিবাচকভাবে নিয়েছেন।

 

 

রাজধানীর সায়েদাবাদে কথা হয় শরিয়তপুরগামী বাসযাত্রী মাহফুজের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘টিকিটের বাইরে যদি টাকা দিতে হয়, সেটা আমরা চাঁদাই বলি। নাম বদলালেই তো বাস্তবতা বদলায় না। সরকার যদি চাঁদাবাজি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে ভাষার ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়া দরকার।’

 

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল এক হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন যে, সেবা রোগীর কাছে যাবে, রোগীকে সেবার পেছনে ছুটতে হবে না। তবে সাধারণ মানুষের মতে, এই ‘যাওয়াটা’ যদি শুধু ক্যামেরার সামনে হয় আর বাস্তবে রোগীরা ওষুধ বা সিরিয়াল না পায়, তবে এই বক্তব্যের কোনো মূল্য থাকবে না।

 

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন এমন কথা বলছেন, তখনো বড় বড় সরকারি হাসপাতালে সাধারণ রোগীরা একটি সিটের জন্য ফ্লোরে শুয়ে থাকছেন। রোগীর কাছে যাওয়ার আগে হাসপাতালের ভেতর রোগীর ন্যূনতম মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন নাগরিকরা।

 

 

ঢাকা মেডিকেলে রোগীর স্বজন আরিফা খাতুন বলেন, বিছানা না পেয়ে ফ্লোরে থাকতে হয়। আগে সিট আর ওষুধ নিশ্চিত হোক। এক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জনবল কম। ডাক্তার-নার্স বাড়ানো না হলে মাঠপর্যায়ে সেবা পৌঁছানো কঠিন।

 

 

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হবে মার্চ মাস থেকে। প্রথম পর্যায়ে নগদ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে এ কার্যক্রম চালু হবে এবং মোট ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের নারী সদস্য এই কার্ডের মালিক হবেন। স্বজনপ্রীতি পরিহার করে স্বচ্ছতার সাথে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করতে হবে। এর ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সরকারি সহায়তা পাবেন।

 

 

পুরান ঢাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মামুন বলেন, গতবারের সরকারের মতো কার্ডের নামে টাকা আদায়, স্বজনপ্রীতি, একই পরিবারের অধিক কার্ড যাতে না হয়। এবার যেন স্বচ্ছতা থাকে।

 

 

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেছেন, ‘আমরা কথা কম বলতে চাই, কাজ বেশি করতে চাই’। তার এই সরাসরি ও পরিমিত বক্তব্য অনেক মহলে প্রশংসিত হলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি কতটা সফল হবেন, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে।

 

 

ইসলামপুরের কাপড় ব্যবসায়ী লোকমান বলেন, মন্ত্রী ভালো কথা বলেছেন। এখন ডলারের বাজার, মূল্যস্ফীতি আর বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার।

 

 

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দুর্নীতি নিয়ে একটি মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কেবলমাত্র আর্থিক অনিয়মই দুর্নীতি নয়, দায়িত্ব পালনে গাফিলতিও এক ধরনের দুর্নীতি।’ তার এই বক্তব্যটি মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

 

ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন। গণমাধ্যমকর্মীরা সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও কেউ কেউ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত।

 

 

চলচ্চিত্র অভিনেতা ও পরিচালক সোহেল রানা সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করে বলেছেন, কিছু মন্ত্রীর বক্তব্যে সংযম দরকার। তার মতে, প্রয়োজন ছাড়া ঘনঘন বক্তব্য না দিয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মুখপাত্রের মাধ্যমে তথ্য দেওয়া হলে বিভ্রান্তি কমবে।

 

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ হোসেনের মতে, নতুন সরকারের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সংযম ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের উদ্যোগ জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে মন্ত্রীদের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি। কারণ এখন মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

 

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান বলেন, নতুন সরকারের সবকিছু ভালোভাবেই শুরু হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান আর শিক্ষার মান না বাড়লে শুধু প্রতীকী সিদ্ধান্তে লাভ হবে না।

 

 

সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের সূচনালগ্নে যেমন প্রশংসার ঢেউ উঠেছে, তেমনি কিছু বক্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্কের ঝড়। এখন দেখার বিষয়, ঘোষণার পর বাস্তবায়নের পথে সরকার কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এগোতে পারে।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অদম্য পলি রানী: পা দিয়ে লিখেই দিচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা

ব্যতিক্রমী সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী, বিতর্কে মন্ত্রীদের বক্তব্য

আপডেট টাইম : ০৯:২১:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন চমকপ্রদ সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসিত হচ্ছেন।

 

 

তবে প্রধানমন্ত্রী সংযমী জীবনযাপন ও প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচনের বার্তা দিলেও কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, মন্ত্রীরা ট্যাক্স ফ্রি সরকারি গাড়ি ও সরকারি বাসভবন নেবেন না।

 

নিজেও গুলশানের ব্যক্তিগত বাসা থেকে দাপ্তরিক কাজ শুরু করেছেন।

 

 

সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার অফিস করে সাম্প্রতিক সময়ের রেওয়াজ ভেঙেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর কমিয়ে আনা হয়েছে, ভিভিআইপি চলাচলের সময় দীর্ঘক্ষণ সড়ক বন্ধ রাখার প্রথাও বাতিল করা হয়েছে। সচিবালয় থেকে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে হেঁটে যাওয়া ও অনুষ্ঠান শেষে হেঁটে ফিরে আসার ঘটনাও মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

 

 

গত শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অফিস করতে যান। কার্যালয়ের মূল ভবনে প্রবেশের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন এবং করমর্দন করেন। তিনি কার্যালয়ের পুরনো অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নাম ধরে কাছে ডেকে কথা বলেন। এ সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এত একান্তভাবে প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পাওয়ায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনা আলোড়ন তোলে।

 

 

সচিবালয় থেকে গুলশান ফেরার পথে এক বেসরকারি চাকরিজীবী নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘এতদিন সাধারণ মানুষ দেখেছে মন্ত্রীরা দীর্ঘ গাড়িবহর নিয়ে চলাচল করেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়ক বন্ধ থেকেছে, যানজটে অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা মিস করেছে, শ্রমিকেরা কাজের সময় হারাচ্ছে। সরকারি সেবা দায়িত্বের চেয়ে সুবিধার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

 

 

আর এবার প্রধানমন্ত্রীর বহরে মাত্র কয়েকটি গাড়ি।

 

 

কোথাও অতিরিক্ত তৎপরতা নেই, নেই হর্ন বা সাইরেনের চাপ। জ্যামে কিংবা সিগনালে সাধারণ যানবাহনের সঙ্গেই চলছিল তার গাড়িবহর।’

 

 

ওই চাকরিজীবী জানান, মগবাজার ফ্লাইওভারে পাশাপাশি এলে তিনি সালাম দিলে প্রধানমন্ত্রীও সালামের উত্তর দেন। তার ভাষায়, এভাবে চলাচল করলে অন্তত রাস্তায় মানুষের ভোগান্তি কমবে।

 

 

রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় কথা হয় কাশেম নামের এক রিকশাচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে ভিআইপি গেলে এক ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। আর সেই জ্যাম সারাদিন ধরে লেগে থাকতো। এবার যদি সত্যি রাস্তা বন্ধ না করে প্রধানমন্ত্রী চলেন, তাহলে আমাদের আয় বাড়বে। মানুষেরও কষ্ট কম হবে।

 

 

প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনিক বৈঠক সচিবালয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বদলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো জোরদার হয়। সরকারি ব্যয় সংকোচন, দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের কথাও জানিয়েছেন।

 

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ হোসেনের মতে, এটি কেবল একটি আচরণগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি প্রতীকী বার্তা। নেতৃত্ব জনগণের ঊর্ধ্বে নয়—বরং জনগণের অংশ। এমন পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।

 

 

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মত ভিন্ন। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রটোকল শিথিল করা হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি থাকা উচিত নয়।

 

 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রম প্রশংসিত হলেও সরকারের শুরুর দিকেই কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে যে অর্থ তোলা হয়, সেটিকে তিনি চাঁদাবাজি মনে করেন না; বরং এটি একটি সমঝোতা বা ব্যবস্থার অংশ।

 

 

তার এই বক্তব্য সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, কারণ চাঁদাবাজি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসা নতুন সরকারের মন্ত্রীর মুখে এমন কথা অনেকেই নেতিবাচকভাবে নিয়েছেন।

 

 

রাজধানীর সায়েদাবাদে কথা হয় শরিয়তপুরগামী বাসযাত্রী মাহফুজের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘টিকিটের বাইরে যদি টাকা দিতে হয়, সেটা আমরা চাঁদাই বলি। নাম বদলালেই তো বাস্তবতা বদলায় না। সরকার যদি চাঁদাবাজি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে ভাষার ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়া দরকার।’

 

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল এক হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন যে, সেবা রোগীর কাছে যাবে, রোগীকে সেবার পেছনে ছুটতে হবে না। তবে সাধারণ মানুষের মতে, এই ‘যাওয়াটা’ যদি শুধু ক্যামেরার সামনে হয় আর বাস্তবে রোগীরা ওষুধ বা সিরিয়াল না পায়, তবে এই বক্তব্যের কোনো মূল্য থাকবে না।

 

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন এমন কথা বলছেন, তখনো বড় বড় সরকারি হাসপাতালে সাধারণ রোগীরা একটি সিটের জন্য ফ্লোরে শুয়ে থাকছেন। রোগীর কাছে যাওয়ার আগে হাসপাতালের ভেতর রোগীর ন্যূনতম মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন নাগরিকরা।

 

 

ঢাকা মেডিকেলে রোগীর স্বজন আরিফা খাতুন বলেন, বিছানা না পেয়ে ফ্লোরে থাকতে হয়। আগে সিট আর ওষুধ নিশ্চিত হোক। এক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জনবল কম। ডাক্তার-নার্স বাড়ানো না হলে মাঠপর্যায়ে সেবা পৌঁছানো কঠিন।

 

 

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হবে মার্চ মাস থেকে। প্রথম পর্যায়ে নগদ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে এ কার্যক্রম চালু হবে এবং মোট ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের নারী সদস্য এই কার্ডের মালিক হবেন। স্বজনপ্রীতি পরিহার করে স্বচ্ছতার সাথে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করতে হবে। এর ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সরকারি সহায়তা পাবেন।

 

 

পুরান ঢাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মামুন বলেন, গতবারের সরকারের মতো কার্ডের নামে টাকা আদায়, স্বজনপ্রীতি, একই পরিবারের অধিক কার্ড যাতে না হয়। এবার যেন স্বচ্ছতা থাকে।

 

 

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেছেন, ‘আমরা কথা কম বলতে চাই, কাজ বেশি করতে চাই’। তার এই সরাসরি ও পরিমিত বক্তব্য অনেক মহলে প্রশংসিত হলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি কতটা সফল হবেন, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে।

 

 

ইসলামপুরের কাপড় ব্যবসায়ী লোকমান বলেন, মন্ত্রী ভালো কথা বলেছেন। এখন ডলারের বাজার, মূল্যস্ফীতি আর বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার।

 

 

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দুর্নীতি নিয়ে একটি মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কেবলমাত্র আর্থিক অনিয়মই দুর্নীতি নয়, দায়িত্ব পালনে গাফিলতিও এক ধরনের দুর্নীতি।’ তার এই বক্তব্যটি মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

 

ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন। গণমাধ্যমকর্মীরা সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও কেউ কেউ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত।

 

 

চলচ্চিত্র অভিনেতা ও পরিচালক সোহেল রানা সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করে বলেছেন, কিছু মন্ত্রীর বক্তব্যে সংযম দরকার। তার মতে, প্রয়োজন ছাড়া ঘনঘন বক্তব্য না দিয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মুখপাত্রের মাধ্যমে তথ্য দেওয়া হলে বিভ্রান্তি কমবে।

 

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ হোসেনের মতে, নতুন সরকারের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সংযম ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের উদ্যোগ জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে মন্ত্রীদের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি। কারণ এখন মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

 

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান বলেন, নতুন সরকারের সবকিছু ভালোভাবেই শুরু হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান আর শিক্ষার মান না বাড়লে শুধু প্রতীকী সিদ্ধান্তে লাভ হবে না।

 

 

সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের সূচনালগ্নে যেমন প্রশংসার ঢেউ উঠেছে, তেমনি কিছু বক্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্কের ঝড়। এখন দেখার বিষয়, ঘোষণার পর বাস্তবায়নের পথে সরকার কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এগোতে পারে।