(প্রথম পর্ব)
আমার মাথায় অনেকদিন ধরেই একটি প্রশ্ন জাগে আমরা যারা মফস্বল জেলাগুলোতে সাংবাদিকতা করি তাদের মূলত পেশাটা কি? পেশা বলতে যে কাজ করে মানুষের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়-সেটাকেই তো বুঝি? কিন্তু বাংলাদেশের জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতা পেশার উপর নির্ভর করে ক’জনের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়? মনে হয় এ প্রশ্ন শুধু আমার নয়-সকলের মাথাতেই রয়েছে? আসুন আমরা এর জবাব খোঁজার চেষ্টা করি।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েই শুরু করছি………
দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন ছিল ছেলেবেলা থেকেই। কিশোর ও যুবক বয়সে গ্রামে যাত্রাপালা-নাটক, বৈঠকী গানের আসরেই সম্পৃক্ত থেকেছি। মনে কখনোই কোন উচ্চ আকাঙ্খা জন্ম নেয়নি। নিজেকে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠার চিন্তাও ছিল না। উচ্চশিক্ষা, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি কোনটার প্রতি আকৃষ্ট হইনি। মানুষকে আনন্দদানের মাধ্যমে নিজের আনন্দটা খুঁজে নেবার চেষ্টা করতাম। গ্রামের নাট্যদল থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন এরপর জেলা নাট্যদল। একনিষ্ঠতার কারণে সব সংগঠনে সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছে আমার কাঁধেই। নাট্যজগতে আমার বিচরণের বিবরণ দিতে গেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে হবে। তাই সেদিকে আর যেতে চাই না।
নিপীড়িত মানুষের জন্য কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে মানবাধিকার নাট্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হই। ওই সংগঠনটির ইউনিয়ন পর্যায়ের সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে জেলা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর পদাধিকার বলে ওই সংগঠন থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পেলাম। সেখান থেকেই আমার সাংবাদিকতা পেশায় আসা। একটি স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদক তার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিলেন। ভাবলাম, এবার মানুষের জন্য অন্তত কিছু করতে পারবো। দারুণ উদ্যম আর উৎসাহ নিয়ে সামান্য বেতনে ওই পত্রিকায় চাকরি নিলাম। অল্পদিনের মধ্যে বেতন বাড়ানোর আশ্বাস দিলেন সম্পাদক মহোদয়।
শুরু হলো পেশাদার সাংবাদিকতা। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই আমার স্বপ্নে চিড় ধরতে শুরু করে। দেখলাম যে পেশার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের ঘরের ক্ষুদ্র চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ, সেই পেশায় থেকে কিভাবে জাতির কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে কাজ করবে? আমার ভেতরের বিবেকটা সবসময়ই এমন প্রশ্ন করতে থাকে। ভাবলাম হয়তো স্থানীয় পত্রিকায় চাকরি করছি, বেতন কম। এজন্যই সাংসারিক অভাব অনটন। জাতীয় পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হলে হয়তো এই আর্থিক সংকট কেটে যাবে। তখন নিজের অভাব-অনটন দুরও হবে, অসহায় মানুষদের কল্যাণে কাজ করার পথও সুগম হবে।
কয়েক বছর পর জাতীয় পত্রিকায় যোগদান করলাম। আরও তিন বছর পর একটি অনলাইন পত্রিকাতেও জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেলাম। এভাবে তিনটি মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হই। স্থানীয় পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক, জাতীয় দৈনিকের জেলা প্রতিনিধি এবং একটি অনলাইন পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলাম। অর্থনৈতিক মুক্তির আশাতেই এতগুলো মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়া। নিরলস পরিশ্রম করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে থাকলাম।
ধীরে ধীরে টের পেতে শুরু করলাম জেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতার সুবিধা ও প্রতিবন্ধকতা। পেশাগত কারণে দেশের শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকা ও টেলিভিশন জেলা প্রতিনিধিদের সঙ্গে মিশতে শুরু করলাম। দেশের প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর মিডিয়াগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। ওইসব মিডিয়ার জেলা পর্যায়ে কর্মরত অনেক সহকর্মীর জীবনমান সম্পর্কেও ধারণা নিলাম। কিন্তু জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের শ্রম এবং পারিশ্রমিকের বিষয়ে রীতিমতো হতাশ হলেও ভালো কিছুর প্রত্যাশাতেই সাংবাদিকতা পেশায় দুই যুগ কেটে গেল। (চলবে…)

স্বপন চন্দ্র দাস 


















2 thoughts on “মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?”