ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জের ৬টি আসনের মধ্যে একটি আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোটে জয় পেয়েছে জামায়াত। বাকি ৫টি আসনে জামায়াত ও জোটের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। তারপরও ইতিহাসের সেরা সাফল্য পেয়েছে দলটি। প্রতিটি আসনেই লক্ষাধিক ভোট পেয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা, যেটা ছিল এ যাবতকালের সর্বোচ্চ।
সিরাজগঞ্জের ৬টি আসনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলায় মোট ভোট পড়েছে ১৭ লাখ ৩২ হাজার ৯২৪। বিএনপি পেয়েছে ৯ লাখ ৩৫ হাজার ১৭, যা প্রদত্ত ভোটের ৫৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। জামায়াত জোট ভোট পেয়েছে ৭ লাখ ৩৫ হাজার ২৭৬ যা প্রদত্ত ভোটের ৪২ দশমিক ৪২ শতাংশ। ইতিপূর্বে কোন জাতীয় নির্বাচনেই জামায়াতে ইসলামী এত বিপুল সংখ্যক ভোট পায়নি।
১৯৯১ সালে ৫ম ও ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয় জামায়াত। ৫ম সংসদ নির্বাচনে যে ভোট পায় ৭ম সংসদে এসে অর্ধেকে নামে। অর্থ্যাৎ ১৯৯৬ সালে তাদের জনপ্রিয়তায় ব্যাপক ধস নামে। ২০০১ থেকে বাকি নির্বাচনগুলোতে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণ করে দলটি।
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯১ সালে সিরাজগঞ্জ-১ আসনে জামায়াত ৩০৪৪ ভোট অর্থাৎ প্রদত্ত ভোটের ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ পায়। ১৯৯৬ সালে পায় ১৮৬৯ ভোট, যা প্রদত্ত ভোটের ২ শতাংশ। সিরাজগঞ্জ-২ আসনে ১৯৯১ সালে পায় ৩৩ হাজার ৮৮১ ভোট, যা প্রদত্ত ভোটের ২৩.৭ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে প্রদত্ত ভোটের ১২ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থাৎ ২২ হাজার ৭৯৫ ভোট পায়। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে ১৯৯১ সালে জামায়াতের ভোট ২৫ হাজার ২৩৪, যা প্রদত্ত ভোটের ২০ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে ১৭ হাজার ৮৫৪ পায় তারা যা প্রদত্ত ভোটের ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে ১৯৯১ সালে প্রদত্ত ভোটের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ পেয়ে দ্বিতীয় হয়। সে বছর তাদের ভোটসংখ্যা ছিল ৩১ হাজার ৭২৯। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ব্যাপক ধস নেমে তারা তৃতীয় হয়। প্রদত্ত ভোটের ১৬ দশমিক ৯ শতাংশে মোট ভোট পায় ২৩ হাজার ৮১৪। সিরাজগঞ্জের বাকী আসনগুলোতেও একইভাবে ভোটের হার কমে যায় দলটির। ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করায় জামায়াতের ভোট আলাদা করা যায়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ আসনে জামায়াত ভোট পায় ১ লাখ ৮ হাজার ৮১৫, যা প্রদত্ত ভোটের ৪৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ ভোট। সিরাজগঞ্জ-২ আসনে প্রদত্ত ভোটের ৪২ দশমিক ৫৫ শতাংশ ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৯৭ ভোট পেয়েছে জামায়াত। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াত সমর্থিত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৮০২, যা প্রদত্ত ভোটের ৩৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে ৪৮ দশমিক ৬০ শতাংশ ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়ে জামায়াত। সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে জামায়াত পেয়েছে ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ ১ লাখ ৬ হাজার ৮০৫ ভোট। সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে জামায়াত সমর্থিত এনসিপি প্রার্থী পেয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ১৮৫ ভোট, যা প্রদত্ত ভোটের ৩৫ দশমিক ৮০ শতাংশ।
১৯৯১ সালে সিরাজগঞ্জ-৫ ও ২০০৮ সালে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে দ্বিতীয় স্থান ছাড়া জেলায় বড় কোন অর্জন নেই জামায়াতের। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে সদর, রায়গঞ্জ ও বেলকুচিতে একবার করে ও রায়গঞ্জ পৌরসভার মেয়র পদেও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী একবার নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এ বছর ৫টি আসনে হারলেও ভোটের দিক থেকে জামায়াতে ইসলামী বড় সাফল্য অর্জন করেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, জামায়াতের ক্লিন ইমেজটা ভোটারদের কাছে ভালো লেগেছে। জামায়াত প্রার্থীরা, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাসীর সঙ্গে জড়িত নয়। তাদের নির্বাচিত করলে ভালো সমাজ বা ভালো রাষ্ট্র পাবো। এই বিষয়টিই জনগণের মধ্যে বেশি কাজ করেছে। দ্বিতীয়ত পরিবর্তণের একটা আকাঙ্খা জনগণের মধ্যে ছিল। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও নারীরা জামায়াতের প্রতি বেশি আকৃষ্ট ছিল। এসব কারণে জামায়াত ভোটের দিক থেকে যে কোন সময়ের তুলণায় সফলতা অর্জন করেছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, জামায়াতের উত্থানটা সারা বাংলাদেশে। তাদের কৌশল, প্রতারণা, বেহেশতের টিকিট দেওয়ার আশ্বাস, চাকরি দিয়ে নিজেদের লোকজনকে সেটাআপ করে দীর্ঘ সময় তারা প্রচারে ছিল। আমরা শুধু ছিলাম আন্দোলন সংগ্রামে, তারা নামকাওয়াস্তে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। মাঠে থাকে নাই ওইভাবে। জুলাই আন্দোলনের শহীদের সংখ্যা কাদের বেশি সেটা দেখলেই বোঝা যায়। তারা ১৭ বছর প্ল্যান করেছে, এবং জুলাই যোদ্ধাদের ঘারে সওয়ার করেছে। আর আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে দলীয়করণ করে বিতর্কিত করার কারণেই তাদের ভোট বেড়েছে। তবে পরবর্তীতে তাদের ভোটের পরিসংখ্যানটা এমন থাকবে না বলে মনে করেন বিএনপির এই নেতা।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। জনতার কণ্ঠ.কম 

















