সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo মমতাকে অব্যাহতি দিয়ে ভেঙে দেওয়া হলো পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভা Logo কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদযাপনে প্রস্তুত শাহজাদপুরের কাছারিবাড়ি Logo নিকার অনুমোদন: ভূল্লী উপজেলা গঠনে জনসাধারণের উচ্ছ্বাস Logo ধর্ষণ মামলায় নির্দোষ ইমাম জেলে, ডিএনএ পরীক্ষায় বেরিয়ে এলো আসল তথ্য Logo অবৈধভাবে গড়ে উঠা স্থাপনা দখলমুক্ত হবে: পানি সম্পদ মন্ত্রী Logo বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি: বিদ্যুৎমন্ত্রী Logo  বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ট্রান্সফরমার চোর চক্রের ৯ সদস্য গ্রেফতার Logo মাদক সেবনের দায়ে কারাদণ্ড, কলেজ ছাত্রদল সভাপতি বহিষ্কার Logo মাসুদ উদ্দিনকে জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল Logo ইসরায়েলকে হুমকি দিলে কঠিন পরিণতি: নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি

শেষ বিদায় জানালেন ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’র নায়ক

ইলিয়াস জাভেদ। ছবি : সংগৃহীত

একটি নক্ষত্র খসে পড়ল ঢালিউডের আকাশ থেকে। ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি, বুধবার—দিনটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি বিষাদগ্রস্ত অধ্যায় হয়ে রইল। রুপালি পর্দার সেই তেজোদীপ্ত ‘রাজপুত্র’, যার নাচের ছন্দে একসময় কেঁপে উঠত প্রেক্ষাগৃহ, সেই ইলিয়াস জাভেদ আর নেই।

 

 

রাজধানীর উত্তরায় নিজ বাসভবনে ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। দীর্ঘদিন ক্যানসার ও বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে অবশেষে হার মানলেন তিনি। তার প্রয়াণে কেবল একজন অভিনেতার মৃত্যু হলো না, বরং যবনিকা পতন হলো ফোক-ফ্যান্টাসি ও জাঁকজমকপূর্ণ সিনেমার এক সোনালি যুগের।

 

 

জাভেদের জীবনের গল্পটা কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের পেশাওয়ারে জন্ম নেওয়া এই তরুণের ধমনিতে ছিল পাঠান রক্ত। যে মাটিতে দিলীপ কুমার আর রাজকাপুরের মতো কিংবদন্তিদের শেকড়, সেখানেই জন্ম নিয়েছিলেন রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস, যিনি পরে হয়ে ওঠেন আমাদের প্রিয় ‘জাভেদ’।

 

দেশভাগের কাঁটাতার পেরিয়ে পরিবার নিয়ে পাঞ্জাব, আর সেখান থেকে ১৯৬৩ সালে ঢাকায় আগমন—এ যেন ছিল নিয়তির এক অমোঘ লিখন। তরুণ জাভেদের চোখে তখন স্বপ্ন, আর পায়ে ছিল সহজাত নাচের ছন্দ। ঢাকার সিনেমা পাড়া তখন বিকশিত হচ্ছে, আর সেখানেই এক নতুন পালক যুক্ত করলেন এই তরুণ।

নৃত্য পরিচালক থেকে রুপালি পর্দার হিরো জাভেদ নায়ক হয়ে আসেননি, এসেছিলেন নৃত্য পরিচালক হিসেবে। ষাটের দশকে যখন সিনেমার নাচে ছিল ধীরলয়, জাভেদ সেখানে নিয়ে এলেন ঝড়। তিনি নিজে নাচতেন, নায়িকাদের নাচাতেন। তার কোরিওগ্রাফিতে ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এক অদ্ভুত ফিউশন। সেই সুঠাম দেহ আর সুদর্শন চেহারা দেখে নির্মাতারা বুঝতে ভুল করেননি—এই ছেলে কেবল ক্যামেরার পেছনে থাকার জন্য নয়।

 

১৯৬৪ সালে উর্দু ছবি ‘নয়ি জিন্দেগি’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক। তবে ১৯৬৬ সালে ‘পায়েল’ ছবিতে যখন তিনি শাবানার বিপরীতে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দাঁড়ালেন, তখন আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

 

 

ফোক-ফ্যান্টাসির মুকুটহীন সম্রাট সত্তর ও আশির দশক ছিল জাভেদের রাজত্বকাল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সিনেমার ‘ফোক-ফ্যান্টাসি’র অঘোষিত রাজপুত্র। রঙিন পাগড়ি, গায়ে জড়ানো চকচকে পোশাক, হাতে তলোয়ার আর চোখে তারুণ্যদীপ্ত চাহনি—এটাই ছিল জাভেদের সিগনেচার স্টাইল।

 

 

‘নিশান’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘আলাদিন আলিবাবা ও সিন্দবাদ’, ‘রূপের রানী’ কিংবা ‘মালকা বানু’—তালিকায় একের পর এক সুপারহিট সিনেমা। বলা হয়ে থাকে, ১৯৭০ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তার অভিনীত প্রায় ২০০টি ছবির কোনোটিই ফ্লপ হয়নি। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে তিনি ছিলেন যেমন ক্ষিপ্র, নাচের দৃশ্যে তেমনই নমনীয়। ‘নিশান’ ছবিতে তার অ্যাকশন হিরো ইমেজ আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।

 

 

স্টাইল আইকন ও ব্যক্তিগত জীবন জাভেদ কেবল অভিনয় করতেন না, তিনি ছিলেন একজন স্টাইল আইকন। তার ফ্যাশন সচেতনতা, বিশেষ করে ফ্যান্টাসি মুভিতে তার কস্টিউম সিলেকশন ছিল সেই সময়ের তরুণদের কাছে এক বড় আকর্ষণ।

 

 

পর্দার প্রেমেও তিনি ছিলেন সফল। শাবানা, ববিতা, রোজিনা থেকে শুরু করে ফোকের রানী অঞ্জু ঘোষ—সবার সঙ্গেই তার রসায়ন ছিল জমজমাট। তবে পর্দার রোমান্স বাস্তবে রূপ নেয় সহশিল্পী ডলি চৌধুরীর সঙ্গে। ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’র সেট থেকে শুরু হওয়া সেই সখ্য ১৯৮৪ সালে গড়ায় পরিণয়ে। জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই ডলি চৌধুরীই ছিলেন তার সবচেয়ে বড় অবলম্বন।

 

 

রঙিন পর্দার এই মানুষটির শেষ জীবনটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। মূত্রনালির জটিলতা আর মরণব্যাধি ক্যানসার তাকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বুধবার সকালে তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।

 

 

জাভেদ চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক বর্ণাঢ্য ইতিহাস। যতদিন বাংলা সিনেমায় ফোক-ফ্যান্টাসির গল্প হবে, তলোয়ারের ঝনঝনানি বাজবে কিংবা উদ্দাম নৃত্যের কথা উঠবে—ততদিন ইলিয়াস জাভেদ বেঁচে থাকবেন। তিনি ছিলেন সেই নায়ক, যিনি দর্শকদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে কল্পনার রাজ্যে ডানা মেলতে হয়।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মমতাকে অব্যাহতি দিয়ে ভেঙে দেওয়া হলো পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভা

শেষ বিদায় জানালেন ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’র নায়ক

আপডেট টাইম : ০৩:০৩:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

একটি নক্ষত্র খসে পড়ল ঢালিউডের আকাশ থেকে। ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি, বুধবার—দিনটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি বিষাদগ্রস্ত অধ্যায় হয়ে রইল। রুপালি পর্দার সেই তেজোদীপ্ত ‘রাজপুত্র’, যার নাচের ছন্দে একসময় কেঁপে উঠত প্রেক্ষাগৃহ, সেই ইলিয়াস জাভেদ আর নেই।

 

 

রাজধানীর উত্তরায় নিজ বাসভবনে ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। দীর্ঘদিন ক্যানসার ও বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে অবশেষে হার মানলেন তিনি। তার প্রয়াণে কেবল একজন অভিনেতার মৃত্যু হলো না, বরং যবনিকা পতন হলো ফোক-ফ্যান্টাসি ও জাঁকজমকপূর্ণ সিনেমার এক সোনালি যুগের।

 

 

জাভেদের জীবনের গল্পটা কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের পেশাওয়ারে জন্ম নেওয়া এই তরুণের ধমনিতে ছিল পাঠান রক্ত। যে মাটিতে দিলীপ কুমার আর রাজকাপুরের মতো কিংবদন্তিদের শেকড়, সেখানেই জন্ম নিয়েছিলেন রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস, যিনি পরে হয়ে ওঠেন আমাদের প্রিয় ‘জাভেদ’।

 

দেশভাগের কাঁটাতার পেরিয়ে পরিবার নিয়ে পাঞ্জাব, আর সেখান থেকে ১৯৬৩ সালে ঢাকায় আগমন—এ যেন ছিল নিয়তির এক অমোঘ লিখন। তরুণ জাভেদের চোখে তখন স্বপ্ন, আর পায়ে ছিল সহজাত নাচের ছন্দ। ঢাকার সিনেমা পাড়া তখন বিকশিত হচ্ছে, আর সেখানেই এক নতুন পালক যুক্ত করলেন এই তরুণ।

নৃত্য পরিচালক থেকে রুপালি পর্দার হিরো জাভেদ নায়ক হয়ে আসেননি, এসেছিলেন নৃত্য পরিচালক হিসেবে। ষাটের দশকে যখন সিনেমার নাচে ছিল ধীরলয়, জাভেদ সেখানে নিয়ে এলেন ঝড়। তিনি নিজে নাচতেন, নায়িকাদের নাচাতেন। তার কোরিওগ্রাফিতে ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এক অদ্ভুত ফিউশন। সেই সুঠাম দেহ আর সুদর্শন চেহারা দেখে নির্মাতারা বুঝতে ভুল করেননি—এই ছেলে কেবল ক্যামেরার পেছনে থাকার জন্য নয়।

 

১৯৬৪ সালে উর্দু ছবি ‘নয়ি জিন্দেগি’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক। তবে ১৯৬৬ সালে ‘পায়েল’ ছবিতে যখন তিনি শাবানার বিপরীতে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দাঁড়ালেন, তখন আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

 

 

ফোক-ফ্যান্টাসির মুকুটহীন সম্রাট সত্তর ও আশির দশক ছিল জাভেদের রাজত্বকাল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সিনেমার ‘ফোক-ফ্যান্টাসি’র অঘোষিত রাজপুত্র। রঙিন পাগড়ি, গায়ে জড়ানো চকচকে পোশাক, হাতে তলোয়ার আর চোখে তারুণ্যদীপ্ত চাহনি—এটাই ছিল জাভেদের সিগনেচার স্টাইল।

 

 

‘নিশান’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘আলাদিন আলিবাবা ও সিন্দবাদ’, ‘রূপের রানী’ কিংবা ‘মালকা বানু’—তালিকায় একের পর এক সুপারহিট সিনেমা। বলা হয়ে থাকে, ১৯৭০ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তার অভিনীত প্রায় ২০০টি ছবির কোনোটিই ফ্লপ হয়নি। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে তিনি ছিলেন যেমন ক্ষিপ্র, নাচের দৃশ্যে তেমনই নমনীয়। ‘নিশান’ ছবিতে তার অ্যাকশন হিরো ইমেজ আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।

 

 

স্টাইল আইকন ও ব্যক্তিগত জীবন জাভেদ কেবল অভিনয় করতেন না, তিনি ছিলেন একজন স্টাইল আইকন। তার ফ্যাশন সচেতনতা, বিশেষ করে ফ্যান্টাসি মুভিতে তার কস্টিউম সিলেকশন ছিল সেই সময়ের তরুণদের কাছে এক বড় আকর্ষণ।

 

 

পর্দার প্রেমেও তিনি ছিলেন সফল। শাবানা, ববিতা, রোজিনা থেকে শুরু করে ফোকের রানী অঞ্জু ঘোষ—সবার সঙ্গেই তার রসায়ন ছিল জমজমাট। তবে পর্দার রোমান্স বাস্তবে রূপ নেয় সহশিল্পী ডলি চৌধুরীর সঙ্গে। ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’র সেট থেকে শুরু হওয়া সেই সখ্য ১৯৮৪ সালে গড়ায় পরিণয়ে। জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই ডলি চৌধুরীই ছিলেন তার সবচেয়ে বড় অবলম্বন।

 

 

রঙিন পর্দার এই মানুষটির শেষ জীবনটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। মূত্রনালির জটিলতা আর মরণব্যাধি ক্যানসার তাকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বুধবার সকালে তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।

 

 

জাভেদ চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক বর্ণাঢ্য ইতিহাস। যতদিন বাংলা সিনেমায় ফোক-ফ্যান্টাসির গল্প হবে, তলোয়ারের ঝনঝনানি বাজবে কিংবা উদ্দাম নৃত্যের কথা উঠবে—ততদিন ইলিয়াস জাভেদ বেঁচে থাকবেন। তিনি ছিলেন সেই নায়ক, যিনি দর্শকদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে কল্পনার রাজ্যে ডানা মেলতে হয়।