অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় এমন একটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত স্থাপনার ক্ষুদ্রাকৃতির প্রতিরূপ একই জায়গায় দেখা যায়। নাম ককিংটন গ্রিন গার্ডেনস। আন্তর্জাতিক স্থাপত্যের এই অনন্য প্রদর্শনীতে রয়েছে বাংলাদেশের গর্ব ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনের একটি স্থায়ী ক্ষুদ্র প্রতিরূপ।
সবুজে ঘেরা সুন্দর বাগান, ক্ষুদ্রাকৃতির ভবন, আন্তর্জাতিক স্থাপত্যের বৈচিত্র্য ও মডেলগুলোর সূক্ষ্ম কারুকাজ ককিংটন গ্রিন গার্ডেনসকে ক্যানবেরার অন্যতম ব্যতিক্রমী পর্যটন আকর্ষণে পরিণত করেছে। বর্তমানে এর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে বিশ্বের ৩০টি দেশের বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ রয়েছে।
ককিংটন গ্রিন গার্ডেনসের গল্প শুরু হয় ১৯৭২ সালে। সে বছর যুক্তরাজ্য সফরের সময় বিভিন্ন ক্ষুদ্র মডেল গ্রাম দেখে অনুপ্রাণিত হন এর প্রতিষ্ঠাতা ডাগ ও ব্রেন্ডা সারাহ। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ক্যানবেরায় একটি নিজস্ব মডেল গ্রাম তৈরির স্বপ্ন দেখেন তারা।
ককিংটন গ্রিন গার্ডেনসের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ প্রস্তুতি, পরিশ্রম ও নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে ৩ নভেম্বর ১৯৭৯ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় ককিংটন গ্রিন। শুরুতে এখানে মূলত ব্রিটিশ ভবন ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন দৃশ্যের ক্ষুদ্র সংস্করণ প্রদর্শিত হতো। পরে এর পরিধি বাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত স্থাপনা যুক্ত করা হয়।

ককিংটন গ্রিনের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর ধারণা বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর প্রথম ধাপ উন্মোচিত হয়। ক্যানবেরায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোন দেশের কোন স্থাপনা প্রদর্শিত হবে, কীভাবে মডেল তৈরি হবে এবং এর অর্থায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে কাজ শুরু করে ককিংটন গ্রিন কর্তৃপক্ষ।
এই আন্তর্জাতিক পরিসরেই স্থান করে নেয় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন।
ককিংটন গ্রিন গার্ডেনসের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের মডেলটি ১:৫০ স্কেলে নির্মিত। অর্থাৎ মূল ভবনের তুলনায় এটি পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ আকারে তৈরি। মডেলটি নির্মাণ করেছে ককিংটন গ্রিন গার্ডেনসের নিজস্ব কারিগরি দল এবং এটি নির্মাণে দেড় হাজার ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে।
ক্ষুদ্রাকৃতির হলেও মডেলটিতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। ভবনের চারপাশের জলাধার, জ্যামিতিক নকশা, বিশাল আকৃতি এবং স্থাপত্যের সামগ্রিক বিন্যাসকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে এর প্রদর্শনী এলাকা।
মূল জাতীয় সংসদ ভবন ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত। বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই কান-এর নকশায় নির্মিত এই ভবন আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। ১৯৬১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৮২ সালে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ককিংটন গ্রিনের তথ্য অনুযায়ী, সংসদ ভবনটি প্রায় ৮০ হেক্টর এলাকাজুড়ে অবস্থিত।
স্থাপত্যের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ ভবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর জ্যামিতিক আকৃতি, গভীরভাবে ভেতরে ঢুকে যাওয়া বারান্দা বা প্রবেশপথ এবং বহির্ভাগের বড় বড় জ্যামিতিক খোলা অংশ। ভবনের তিন পাশে থাকা জলাধার স্থাপনাটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে।
ক্যানবেরার ককিংটন গ্রিন গার্ডেনসে জাতীয় সংসদ ভবনের মডেল স্থাপন বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিদেশের মাটিতে একটি দেশের জাতীয় সংসদ ভবনকে স্থায়ী আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে দেখা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়।
ক্যানবেরা বাংলা রেডিওর সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ককিংটন গ্রিন গার্ডেনসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের ক্ষুদ্র মডেল স্থাপনের উদ্বোধন বা প্রদর্শনীতে যুক্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ককিংটন গ্রিনের মহাব্যবস্থাপক মার্ক সারাহ এবং ক্যানবেরায় ‘বাংলাদেশের জন্য কাজ করি’ সংগঠনের সভাপতি শামসুদ্দিন শফি বিপ্লবের সঙ্গে এ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল।
এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৮ মার্চ ২০২১ ক্যানবেরার ককিংটন গ্রিন গার্ডেনসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের ক্ষুদ্র প্রতিরূপের একটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ হাইকমিশন, ক্যানবেরার উদ্যোগে আয়োজিত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচির অংশ ছিল।
ফলে ক্যানবেরার বুকে বাংলাদেশের এই স্থাপত্য নিদর্শনের উপস্থিতি শুধু পর্যটনের বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি দৃশ্যমান পরিচয়ও বহন করছে।
ককিংটন গ্রিন গার্ডেনসের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে একটি দেশের স্থাপনা যতটা না তার আকার দিয়ে পরিচিত হয়, তার চেয়ে বেশি পরিচিত হয় তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। সেই অর্থে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের এই ক্ষুদ্র প্রতিরূপের গুরুত্ব অনেক বড়।
মূল ভবন ঢাকার মাটিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার প্রতীক। আর তার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ ক্যানবেরায় দাঁড়িয়ে যেন দূরদেশে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করছে।
একদিকে লুই কানের বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য, অন্যদিকে ককিংটন গ্রিনের দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি ১:৫০ স্কেলের ক্ষুদ্র সংস্করণ। দুই ভিন্ন ভূখণ্ডে থাকা এই দুই স্থাপনা এক সুতোয় বাঁধা বাংলাদেশের ইতিহাস, স্থাপত্য ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে।
লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও লেখক।

ন্যাশনাল ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 





















One thought on “ক্যানবেরায় বিশ্বের ৩০ দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গে বাংলাদেশের সংসদ ভবন”