সিরাজগঞ্জ , মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo তিন যুগেও নির্মিত হয়নি সেতু, প্রতিশ্রুতির ভারে নুয়ে পড়েছে সাহেবের চরবাসী Logo হোসেনপুরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, চিকিৎসায় প্রস্তুত হাসপাতাল Logo টেন্ডার ছাড়াই ভবন নির্মাণ শুরু চেয়ারম্যানের, বন্ধ করলেন ইউএনও Logo ‘ঘাড় থেকে মাথা সরিয়ে দেব’, বিএনপি নেতাকে হুঁশিয়ারি স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতির Logo নওগাঁ কারা হেফাজতে থাকা বগুড়ার আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু Logo ডেঙ্গুতে নতুন করে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২ হাজার ১০ জন Logo থাপ্পড়কাণ্ডে শাহজালাল রুমিকে আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ Logo জাজিরায় মৃত্যুর দুই মাস পরের দলিলে জমি দাবি, বিরোধে দুই পক্ষ Logo ৭ নভেম্বর ৬ ঘণ্টার জন্য টোল ফ্রি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে Logo সৌদি আরবে হামলা:পিছিয়েই গেল এশিয়ান কাপ

শিক্ষক দিবসে শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী সম্মাননায় সিক্ত শিক্ষকগণ

সকালটা অন্য দিনের মতো ছিল না। বিদ্যালয়ের মাঠে সারি সারি শিক্ষার্থী। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে চকলেট। একটু পরপরই শোনা যাচ্ছিল আনন্দের কোলাহল। শিক্ষকেরাও যেন ফিরেছিলেন নিজেদের ছাত্রজীবনের কোনো এক আনন্দের দিনে।

 

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট শামছুন মহসীন উচ্চ বিদ্যালয়ে সোমবার এমনই এক উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষার্থীদের ফুলেল শুভেচ্ছা, চকলেট বিতরণ, র‍্যালি, শিক্ষার্থীদের হাতে লেখা সম্মাননা সনদ ও কেক কাটার মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্‌যাপন করা হয়। তবে আনন্দের এই আয়োজনের মধ্যেই উঠে এসেছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জাতীয়করণের দাবিও।

 

 

সকালে অ্যাসেম্বলির মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কার্যক্রম। এদিন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পোশাকেও ছিল ভিন্নতা। শিক্ষকেরা পরেছিলেন একই রঙের পোশাক, শিক্ষিকারাও ছিলেন একই ধরনের পোশাকে। শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে ছিল উৎসবের আমেজ।

 

 

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সদস্যদের অংশগ্রহণে বের হয় র‍্যালি। এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে র‍্যালিটি আবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরে আসে। র‍্যালির সামনে শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল আলাদা আলাদা প্ল্যাকার্ড। খণ্ড খণ্ডভাবে লেখা সেই শব্দগুলো একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছিল বিশ্ব শিক্ষক ২০২৬।

 

 

র‍্যালি শেষে শুরু হয় আরও আবেগঘন আয়োজন। শিক্ষার্থীদের নিজেদের হাতে লেখা সম্মাননা সনদ শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কোথাও লেখা ছিল শ্রদ্ধার কথা, কোথাও ভালোবাসার কথা। প্রিয় শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের এই ছোট্ট ভালোবাসার প্রকাশে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তৈরি হয় অন্যরকম এক আবহ।

 

 

এরপর অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে কেক কাটেন।

 

 

আনন্দের এই আয়োজনের মাঝেই নিজেদের নানা বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। তাঁদের দাবি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। তাঁরা চান, শিক্ষকদের বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সব শিক্ষককে একসঙ্গে জাতীয়করণ করা হোক।

 

 

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উত্তম কুমার বলেন,আমাদের চিকিৎসাভাতা মাত্র ৫০০ টাকা। অথচ সরকারি শিক্ষকদের চিকিৎসাভাতা ৩ হাজার টাকা। বর্তমান সময়ে একজন চিকিৎসকের ভিজিট দিতেই অনেক টাকা লাগে। কিন্তু আমাদের চিকিৎসাভাতা বাড়ানো হয়নি। আমরা এই বৈষম্য থেকে মুক্তি চাই।

 

 

সহকারী শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকার আমাদের যে বেতন দেয়, বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তা মিলিয়ে চলা কঠিন। আমাদের জাতীয়করণ করতে হবে। সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে হবে।

 

 

প্রধান শিক্ষক কাছিদা খাতুন বলেন,আজ যারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, এমপি বা মন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরা আমাদের মতো শিক্ষকদের কাছ থেকেই শিক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সব শিক্ষককে একসঙ্গে জাতীয়করণের দাবি জানাচ্ছি।

 

 

শুধু শিক্ষকেরাই নন, তাঁদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছেন অভিভাবকেরাও। বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য মির্জা আব্দুস সামাদ বলেন,শিক্ষকেরা জাতির মেরুদণ্ড। জাতির মেরুদণ্ড ভালো থাকলে দেশও ভালো থাকবে। গত ৮–১০ বছরেও তাঁরা যে বেতন পেতেন, এখনো অনেক ক্ষেত্রে সেই বেতনই পাচ্ছেন। অথচ এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। শিক্ষকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত।

 

 

বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি আব্দুল আলিম খান বলেন, শিক্ষকেরা জাতি গঠনের কারিগর। তাঁদের যথাযথ মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনা করে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এটাই প্রত্যাশা।

 

 

শিক্ষক দিবসের এই আয়োজন তাই শুধু ফুল, চকলেট আর কেক কাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা যেমন শিক্ষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, তেমনি তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও বৈষম্যের কথাও উঠে এসেছে সেই আয়োজনের মঞ্চে।

দিবসটির আয়োজনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এডহক কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তিন যুগেও নির্মিত হয়নি সেতু, প্রতিশ্রুতির ভারে নুয়ে পড়েছে সাহেবের চরবাসী

শিক্ষক দিবসে শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী সম্মাননায় সিক্ত শিক্ষকগণ

আপডেট টাইম : ১০:২১:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

সকালটা অন্য দিনের মতো ছিল না। বিদ্যালয়ের মাঠে সারি সারি শিক্ষার্থী। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে চকলেট। একটু পরপরই শোনা যাচ্ছিল আনন্দের কোলাহল। শিক্ষকেরাও যেন ফিরেছিলেন নিজেদের ছাত্রজীবনের কোনো এক আনন্দের দিনে।

 

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট শামছুন মহসীন উচ্চ বিদ্যালয়ে সোমবার এমনই এক উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষার্থীদের ফুলেল শুভেচ্ছা, চকলেট বিতরণ, র‍্যালি, শিক্ষার্থীদের হাতে লেখা সম্মাননা সনদ ও কেক কাটার মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্‌যাপন করা হয়। তবে আনন্দের এই আয়োজনের মধ্যেই উঠে এসেছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জাতীয়করণের দাবিও।

 

 

সকালে অ্যাসেম্বলির মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কার্যক্রম। এদিন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পোশাকেও ছিল ভিন্নতা। শিক্ষকেরা পরেছিলেন একই রঙের পোশাক, শিক্ষিকারাও ছিলেন একই ধরনের পোশাকে। শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে ছিল উৎসবের আমেজ।

 

 

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সদস্যদের অংশগ্রহণে বের হয় র‍্যালি। এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে র‍্যালিটি আবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরে আসে। র‍্যালির সামনে শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল আলাদা আলাদা প্ল্যাকার্ড। খণ্ড খণ্ডভাবে লেখা সেই শব্দগুলো একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছিল বিশ্ব শিক্ষক ২০২৬।

 

 

র‍্যালি শেষে শুরু হয় আরও আবেগঘন আয়োজন। শিক্ষার্থীদের নিজেদের হাতে লেখা সম্মাননা সনদ শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কোথাও লেখা ছিল শ্রদ্ধার কথা, কোথাও ভালোবাসার কথা। প্রিয় শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের এই ছোট্ট ভালোবাসার প্রকাশে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তৈরি হয় অন্যরকম এক আবহ।

 

 

এরপর অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে কেক কাটেন।

 

 

আনন্দের এই আয়োজনের মাঝেই নিজেদের নানা বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। তাঁদের দাবি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। তাঁরা চান, শিক্ষকদের বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সব শিক্ষককে একসঙ্গে জাতীয়করণ করা হোক।

 

 

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উত্তম কুমার বলেন,আমাদের চিকিৎসাভাতা মাত্র ৫০০ টাকা। অথচ সরকারি শিক্ষকদের চিকিৎসাভাতা ৩ হাজার টাকা। বর্তমান সময়ে একজন চিকিৎসকের ভিজিট দিতেই অনেক টাকা লাগে। কিন্তু আমাদের চিকিৎসাভাতা বাড়ানো হয়নি। আমরা এই বৈষম্য থেকে মুক্তি চাই।

 

 

সহকারী শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকার আমাদের যে বেতন দেয়, বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তা মিলিয়ে চলা কঠিন। আমাদের জাতীয়করণ করতে হবে। সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে হবে।

 

 

প্রধান শিক্ষক কাছিদা খাতুন বলেন,আজ যারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, এমপি বা মন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরা আমাদের মতো শিক্ষকদের কাছ থেকেই শিক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সব শিক্ষককে একসঙ্গে জাতীয়করণের দাবি জানাচ্ছি।

 

 

শুধু শিক্ষকেরাই নন, তাঁদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছেন অভিভাবকেরাও। বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য মির্জা আব্দুস সামাদ বলেন,শিক্ষকেরা জাতির মেরুদণ্ড। জাতির মেরুদণ্ড ভালো থাকলে দেশও ভালো থাকবে। গত ৮–১০ বছরেও তাঁরা যে বেতন পেতেন, এখনো অনেক ক্ষেত্রে সেই বেতনই পাচ্ছেন। অথচ এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। শিক্ষকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত।

 

 

বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি আব্দুল আলিম খান বলেন, শিক্ষকেরা জাতি গঠনের কারিগর। তাঁদের যথাযথ মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনা করে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এটাই প্রত্যাশা।

 

 

শিক্ষক দিবসের এই আয়োজন তাই শুধু ফুল, চকলেট আর কেক কাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা যেমন শিক্ষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, তেমনি তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও বৈষম্যের কথাও উঠে এসেছে সেই আয়োজনের মঞ্চে।

দিবসটির আয়োজনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এডহক কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।