সিরাজগঞ্জ , সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

নাচ-গানে মুখর আদিবাসীদের শতবর্ষী মিলনমেলা

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে বাঁশি, দোতারা, মাদল ও ধামসার সুরে সুরে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিশাল মিলনমেলা। দিনব্যাপী এই মেলায় দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, রাজশাহী ও নওগাঁসহ উত্তরের বিভিন্ন জেলা থেকে ১০ হাজারের বেশি আদিবাসী নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণী অংশ নেন।

বীরগঞ্জের গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এই মেলায় তরুণ-তরুণীরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে দলবদ্ধ হয়ে নিজস্ব কৃষ্টির নৃত্য ও গান পরিবেশন করেন। খোঁপার তাজা ফুল, কাচের চুড়ি আর রঙিন শাড়িতে সেজে আসা নারীদের অংশগ্রহণে মেলা প্রাঙ্গণ এক দারুণ উৎসবের রূপ নেয়।

মেলায় আদিবাসী ছাড়াও বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। স্থানীয়ভাবে অনেকের কাছে ‘বাসিয়াহাটি’ নামে পরিচিত এই মেলায় বসেছিল কুটিরশিল্প, বাহারি কাচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, মাটির ও ঝিনুকের তৈরি তৈজসপত্র, খেলনা, দা-কুড়াল এবং নানা ধরনের খাবারের পসরা। নিরাপত্তা নিশ্চিতে মেলা প্রাঙ্গণে কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল।

জনশ্রুতি রয়েছে, অতীতে এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ ছিল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা এখান থেকে পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে পারত। পছন্দ হলে পরিবারিকভাবে ধুমধামে বিয়ে দেওয়া হতো। তবে বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। মূলত এটি কোনো পছন্দ বা বিয়ের উদ্দেশ্যে আয়োজিত মেলা নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এটি এখন সামাজিক বন্ধন, পুনর্মিলন ও সংস্কৃতি আদান-প্রদানের মাধ্যমে রূপ নিয়েছে।

বীরগঞ্জ আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক জোসেফ হেমরম জানান, আদিবাসী এ মেলার প্রচলন কবে শুরু হয়েছে, সেটি সঠিকভাবে বলা যাবে না। তবে তারা শুধু সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্য ধারাবাহিকভাবে রক্ষা করে যাচ্ছেন।

এদিকে আয়োজক কমিটির আরেক নেতা রিতা হেমরম জানান, আদিবাসীরা ভিন্ন সত্তা নিয়ে এ দেশে বসবাস করে। তাদের কৃষ্টি-কালচার আলাদা, ভাষা আলাদা। কিন্তু কিছু মানুষ এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটররা আদিবাসী মিলনমেলাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে তাদের অসম্মানিত করেছে।

প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এই উৎসব মেলায় আসা দর্শনার্থীদেরও মুগ্ধ করে বলে জানান শিক্ষক ও গবেষক সায়েদ আলী।

আদিবাসীদের মিলনমেলা অনুষ্ঠানে সব রকম সহযোগিতার কথা জানান বীরগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আমীরুল ইসলাম।

বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমা খাতুন মনে করেন, এ মিলনমেলা শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি এবং নিজস্ব সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার একটি বড় মাধ্যম।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নাচ-গানে মুখর আদিবাসীদের শতবর্ষী মিলনমেলা

আপডেট টাইম : ০৯:১০:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে বাঁশি, দোতারা, মাদল ও ধামসার সুরে সুরে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিশাল মিলনমেলা। দিনব্যাপী এই মেলায় দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, রাজশাহী ও নওগাঁসহ উত্তরের বিভিন্ন জেলা থেকে ১০ হাজারের বেশি আদিবাসী নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণী অংশ নেন।

বীরগঞ্জের গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এই মেলায় তরুণ-তরুণীরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে দলবদ্ধ হয়ে নিজস্ব কৃষ্টির নৃত্য ও গান পরিবেশন করেন। খোঁপার তাজা ফুল, কাচের চুড়ি আর রঙিন শাড়িতে সেজে আসা নারীদের অংশগ্রহণে মেলা প্রাঙ্গণ এক দারুণ উৎসবের রূপ নেয়।

মেলায় আদিবাসী ছাড়াও বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। স্থানীয়ভাবে অনেকের কাছে ‘বাসিয়াহাটি’ নামে পরিচিত এই মেলায় বসেছিল কুটিরশিল্প, বাহারি কাচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, মাটির ও ঝিনুকের তৈরি তৈজসপত্র, খেলনা, দা-কুড়াল এবং নানা ধরনের খাবারের পসরা। নিরাপত্তা নিশ্চিতে মেলা প্রাঙ্গণে কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল।

জনশ্রুতি রয়েছে, অতীতে এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ ছিল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা এখান থেকে পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে পারত। পছন্দ হলে পরিবারিকভাবে ধুমধামে বিয়ে দেওয়া হতো। তবে বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। মূলত এটি কোনো পছন্দ বা বিয়ের উদ্দেশ্যে আয়োজিত মেলা নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এটি এখন সামাজিক বন্ধন, পুনর্মিলন ও সংস্কৃতি আদান-প্রদানের মাধ্যমে রূপ নিয়েছে।

বীরগঞ্জ আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক জোসেফ হেমরম জানান, আদিবাসী এ মেলার প্রচলন কবে শুরু হয়েছে, সেটি সঠিকভাবে বলা যাবে না। তবে তারা শুধু সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্য ধারাবাহিকভাবে রক্ষা করে যাচ্ছেন।

এদিকে আয়োজক কমিটির আরেক নেতা রিতা হেমরম জানান, আদিবাসীরা ভিন্ন সত্তা নিয়ে এ দেশে বসবাস করে। তাদের কৃষ্টি-কালচার আলাদা, ভাষা আলাদা। কিন্তু কিছু মানুষ এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটররা আদিবাসী মিলনমেলাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে তাদের অসম্মানিত করেছে।

প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এই উৎসব মেলায় আসা দর্শনার্থীদেরও মুগ্ধ করে বলে জানান শিক্ষক ও গবেষক সায়েদ আলী।

আদিবাসীদের মিলনমেলা অনুষ্ঠানে সব রকম সহযোগিতার কথা জানান বীরগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আমীরুল ইসলাম।

বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমা খাতুন মনে করেন, এ মিলনমেলা শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি এবং নিজস্ব সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার একটি বড় মাধ্যম।