ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পতন নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছে। আগামী রোববার প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন ‘ইয়াশার’ পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট। ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ নতুন নেসেটে স্থান পেতে যাওয়া দলগুলোর সাথে সপ্তাহজুড়ে অনুষ্ঠিত পরামর্শ সভা শেষ করার পর জানান, ‘ইয়াশার’ পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট আগামী রোববার সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট (দায়িত্ব) পেতে যাচ্ছেন। হারজোগের সাথে আলোচনায় আইজেনকোটের পক্ষে সর্বমোট ৬৭টি সুপারিশ জমা পড়েছে। সরকার গঠনের জন্য দরকার ৬১ জনের সমর্থন।
পরামর্শ সভার পর প্রেসিডেন্ট হারজোগ ঘোষণা করেন, তিনি রোববার যেকোনো একজন প্রার্থীর হাতে সরকার গঠনের দায়িত্ব তুলে দেবেন। তিনি আরো যোগ করেন, ‘ইসরাইলের জনগণের জন্য একটি ভালো ও স্থিতিশীল সরকার গঠনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে কোনো সুযোগই হাতছাড়া না করার’ উদ্দেশ্যে তিনি সপ্তাহান্তে একাধিক দলের প্রধানের সাথে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আইজেনকোট দুটি আরব দল—’রাম’ এবং ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর সমর্থন পেয়েছেন, যদিও তাদের এই সুপারিশ পরে চূড়ান্তভাবে তার জোটে যোগ দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।
নেতানিয়াহুকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে হারজোগ প্রশ্ন তুললে, ইয়াশার পার্টির প্রতিনিধি দল জোর দিয়ে জানায়, তারা নেতানিয়াহুর প্রশাসনের তৈরি করা ‘ক্ষতি’ পূরণে প্রথমেই একটি ‘জাতীয় জরুরি সরকার’ গঠনের জন্য কাজ করবে।
বিরোধী ব্লকের ৪৮টি সুপারিশের পাশাপাশি আরব দলগুলোর ১৯টি আসন যোগ হয়ে আইজেনকোটের সমর্থনে মোট ৬৭টি আসন নিশ্চিত হয়, যা তাকে নেতানিয়াহুর চেয়ে ম্যান্ডেট পাওয়ার দৌড়ে সুবিধাজনক অবস্থানে এগিয়ে রেখেছে।
নির্বাচনের ফলাফলে এক রাজনৈতিক অচলাবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যেখানে কোনো ব্লকই নেসেটে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সমর্থ হয়নি, যার ফলে নতুন সরকার গঠনের পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন পেলেও বিরোধী দলগুলো পায় ৪৮টি আসন। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি আরব দল ‘রাম’ এবং ‘জয়েন্ট লিস্ট’ যৌথভাবে রেকর্ডসংখ্যক ১৯টি আসনে জয়লাভ করে।
প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাওয়া বিরোধী ব্লকের সকল দল—’ইয়াশার’, নাফতালি বেনেটের ‘বিইয়াহাদ’, ইয়ার গোলানের ‘ডেমোক্র্যাটস’ এবং আবিগদোর লিবারম্যানের ‘ইসরাইল বেইতেনু’—আইজেনকোটের নাম সুপারিশ করেছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর পক্ষে সুপারিশকারী দলগুলোর মধ্যে রয়েছে লিকুদ, জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ‘ওৎজমা ইহুদিত’, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের ‘রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টি’, মোশে ফেইগলিনের ‘জেহুত’ এবং আরিয়ে দেরির ‘শাস’।
তবে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী অতি-অর্থোডক্স ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ দল কোনো প্রার্থীর পক্ষে সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইউটিজের এই বিরত থাকার সিদ্ধান্তটি তাদের সাথে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ, যা তাকে সরিয়ে সরকার গড়তে চাওয়া বিরোধী জোটকে সুবিধা এনে দিয়েছে। বিরোধী নেতারাও অতি-অর্থোডক্স দলগুলোকে নিজেদের জোটে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে উদার মনোভাব দেখাচ্ছেন।
হারজোগকে আব্বাস : হামাসের অস্ত্রসংবরণে সমর্থক ‘রাম’
আলোচনাকালে ‘রাম’ দলের নেতা মনসুর আব্বাস জানান যে তার দল হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার প্রস্তাব সমর্থন করে, যা আইজেনকোট তার জোটে যোগ দেওয়ার জন্য যে চারটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন তার একটি।
হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আব্বাস বলেন, ‘আরব সমাজ এবং ব্যক্তি হিসেবে আমি নিজে, এমনকি সামগ্রিকভাবে আরব নাগরিকরা—আমরা সবাই একটি সেতু হিসেবে কাজ করি। সেই সেতু ধ্বংস করবেন না। আমাদের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক বা দেশদ্রোহী বানাবেন না।’
আরব দলটি নিজেকে জোটে যোগ দেওয়ার মতো একটি গ্রহণযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের নেতা ইয়ার গোলান বিরোধী ব্লকটিকে আরব দলগুলোর সাথে হাত মেলাতে আহ্বান জানান, যাতে ৬৭ আসনের শক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব হয়। তবে বিরোধী ব্লকের অন্যান্য কিছু নেতা আরব দলগুলোর সাথে সরকার গঠনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বা ‘রেড লাইন’ টেনে রেখেছেন।
বৃহস্পতিবারের শেষভাগে, বেনেটের ‘বিইয়াহাদ’ দলের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলার সময় এমপি মেরাফ কোহেন নেতানিয়াহুর সাথে কোনো ঐক্যবদ্ধ সরকারের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে প্রেসিডেন্ট হারজোগকে বলেন, ‘আপনি তো আর বিচ্ছুর সাথে ব্যবসা করতে পারেন না।’
কোহেন আরো যোগ করেন, ‘করোনা মহামারির সময় আমি একটি জাতীয় ঐক্য সরকারের হয়ে কাজ করেছিলাম। কিন্তু দেশের ভালো করার বদলে আমি কেবল ক্ষতিই করে এসেছি।’ এর সাথে এমপি রাম বেন-বারাক যোগ করে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আদর্শে বিশ্বাসীদের সাথে কোনো ঐক্য হতে পারে না।’
লিকুদ প্রতিনিধি দলের সাথে হারজোগের চূড়ান্ত বৈঠকে পরিবহন মন্ত্রী মিরি রেগেভ দাবি তোলেন যে, সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে নেতানিয়াহুকেই সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দেওয়া উচিত।
প্রতিনিধিদলটি আরো সতর্ক করে বলে যে জয়েন্ট লিস্টের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে জোট তৈরি করা ‘বিপজ্জনক’ হবে, কারণ তাদের দাবি অনুযায়ী উক্ত দলটি সন্ত্রাসীদের সমর্থন করে।
জোটের হুইপ ও নেসেট সদস্য ওফির কাটজ বলেন, ‘পরিবর্তনকামী ব্লকটি আসলে সন্ত্রাসবাদের সমর্থনে পরিবর্তন চাইছে।’
সংকটে প্রাণ হারানো জিম্মি রণ গভিলির মা এবং নতুন নেসেট সদস্য তলিক গভিলি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের যারা হত্যা করেছে তাদের সমর্থকদের সাথে বসতে বিরোধী দলগুলোর এই আগ্রহ দেখে আমি কষ্ট পেয়েছি। মনে হচ্ছে আমি এখনো রিজার্ভ ফোর্সে আছি; রণের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে এবং শত্রুদের ধ্বংস করতেই আমি এখানে এসেছি।’
এই রাজনৈতিক জটিলতা শেষ পর্যন্ত নতুন একটি নির্বাচনের দিকে পরিস্থিতি গড়ালেও জোট আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সমঝতায় পৌঁছানোর পথও খোলা রয়েছে। অন্যান্য সম্ভাব্য পরিণতির মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের ব্লকের যৌথ জাতীয় সরকার অথবা একটি সংখ্যালঘু সরকার।
ওৎজমা ইহুদিত এবং জেহুত দলের সাথে হারজোগের বৈঠক চলাকালে লিকুদ ও বিদায়ী জোটের প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে এই নির্বাচন ‘ছিনতাই’ করা হয়েছে।
তাদের এই দাবি অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেতের’ পরিচালিত এক তদন্তের সাথে সম্পর্কিত, যেখানে কাতার ও তুরস্কের মতো বিদেশি শক্তি আরব অধ্যুষিত এলাকায় ভোটে প্রভাব ফেলতে অর্থ লেনদেন করেছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সামনে কী ঘটবে?
তদন্ত সত্ত্বেও, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন নেসেট নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে এবং পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, নির্বাচনের স্বচ্ছতায় কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
সংবিধান অনুযায়ী অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন আদায় করে সরকার গঠনের সর্বাধিক সম্ভাবনা কার রয়েছে, তা নির্ধারণেই হারজোগ এই পরামর্শ সভাগুলো পরিচালনা করলেন।
আইন অনুযায়ী, হারজোগ কর্তৃক মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন এবং প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট এই সময়সীমা আরও ১৪ দিন পর্যন্ত বাড়াতে পারেন।
যদি নির্বাচিত প্রার্থী নির্ধারিত সময়ে সরকার গঠনে ব্যর্থ হন, প্রেসিডেন্টকে ব্যর্থতার কথা জানান বা নেসেটে আস্থা ভোটে হেরে যান, তবে প্রেসিডেন্ট ৩ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন যে তিনি দায়িত্বটি অন্য কোনো পার্লামেন্ট সদস্যকে দেবেন নাকি স্পিকারকে জানাবেন যে সরকার গঠনের আর কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
দ্বিতীয় প্রার্থী তখন জোট গঠনের জন্য আবার ২৮ দিন সময় পাবেন, তবে এক্ষেত্রে সময় বাড়ানোর কোনো সুযোগ থাকবে না।
সরকার গঠন বা জোটের আলোচনা যেদিকেই যাক না কেন, আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্র : জেরুসালেম পোস্ট
জনতার কণ্ঠ / কেএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 




















