সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo মমতাকে অব্যাহতি দিয়ে ভেঙে দেওয়া হলো পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভা Logo কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদযাপনে প্রস্তুত শাহজাদপুরের কাছারিবাড়ি Logo নিকার অনুমোদন: ভূল্লী উপজেলা গঠনে জনসাধারণের উচ্ছ্বাস Logo ধর্ষণ মামলায় নির্দোষ ইমাম জেলে, ডিএনএ পরীক্ষায় বেরিয়ে এলো আসল তথ্য Logo অবৈধভাবে গড়ে উঠা স্থাপনা দখলমুক্ত হবে: পানি সম্পদ মন্ত্রী Logo বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি: বিদ্যুৎমন্ত্রী Logo  বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ট্রান্সফরমার চোর চক্রের ৯ সদস্য গ্রেফতার Logo মাদক সেবনের দায়ে কারাদণ্ড, কলেজ ছাত্রদল সভাপতি বহিষ্কার Logo মাসুদ উদ্দিনকে জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল Logo ইসরায়েলকে হুমকি দিলে কঠিন পরিণতি: নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি

শিক্ষকদের ভ্যাগ্যবিধাতা স্বাধীন বাংলাদেশের “লাট”

  • রিপোর্টার:
  • আপডেট টাইম : ১২:৪০:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
  • 208

মো. মাসুদ রানা ওয়াসিম

সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পন্ডিত মশাই’ ছোট গল্পের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সম্ভবত ১৯৫২ সাল হবে। তিনি সমাজের সুবিধা বঞ্চিত এক স্কুল শিক্ষকের জীবনের করুণ চিত্র তুলে ধরেছিলেন ‘চাচা কাহিনী’তে সংকলিত ‘পন্ডিত মশাই’ গল্পে। একটু বলে রাখি “একবার পন্ডিত মশাইয়ের স্কুল পরিদর্শনে আসেন লাট সাহেব। লাট সাহেবের সফরসঙ্গীদের মধ্যে একটি তিন পা ওয়ালা কুকুরও ছিল……..” আর পন্ডিত মশাইয়ের পরিবারের সদস্য ছিলো আটজন।

 

বৃটিশ শাসনামলের সামাজিক শোষন-বঞ্চনার এক খন্ড চিত্র পন্ডিত মশাই। ১৯৪৭ সালে বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে চলে যাবার পর ১৯৭১ স্বাধীন বাংলাদের জন্ম হয়। বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কথা বলে ৫৪ বছরে বহু সরকার এসেছে, চলেও গেছে। কতোটুকু আর্থিক পরিবর্তন হয়েছে প্রান্তিক মানুষের? কিংবা অর্ধশত বছরের শাসনে কতোটুকু বদলিয়েছে “জাতির মেরুদন্ড”গড়ার কারিগর শিক্ষকদের জীবন-মান ও সামাজিক মর্যাদা?

 

চোখ বন্ধ করে বলা যায় “না এতোটুকুও বদলায়নি বরং কমেছে”। আর্থিক বঞ্চনার পাশাপাশি কমেছে শিক্ষকের মর্যাদাও। স্বাধীন বাংলাদেশে একজন ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী শিক্ষককে গলা ধাক্কা দেয়। বড় কর্তার অফিস পিয়ন ঘন্টার পর ঘন্টা বরান্দায় বসিয়ে রাখেন স্যারের ব্যস্ততার কথা বলে। আইনের রক্ষক পুলিশ রাস্তায় ফেলে পিটায় শিক্ষকদের। গালাগাল করেন জনগনের সেবক ‘‘ছবক”ধারী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও। অথচ আমাদের অনাদৃত শিক্ষক শ্রেণি যে কারো কাছ থেকে সামান্য সম্মান বা একটি ধন্যবাদ পেলে যে পরিমান খুশি হন, যা তাদের পেটের ক্ষাধাও ভুলিয়ে রাখে।

 

১২৭০০ টাকা মাসিক বেতনে (এন্টি লেভেলে) একজন সহকারী শিক্ষক দ্রব্যমূল্য উর্ধ্বগতির এই বাজারে পেটে-ভাতে কুলিয়ে উঠতে না পেড়ে যখন দাবি-দাওয়া নিয়ে মুনিবদের দারস্থ হয়েছে তখনই নানা কটু কথায় বিতাড়িত হয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে তাদের। কখনও বা এর বেশি। সাবেক সরকারের প্রধানমন্ত্রী তো প্রায়ই বলতেন কি দেইনি শিক্ষকদের, “তাদের বেতন দ্বিগুন করা হয়েছে”। ভাবুন তো দিগুনে যদি ১২৭০০ টাকা হয় তবে এর আগের অবস্থা কি ছিলো? আচ্ছা ২০১৫ পে-স্কেলে কি কেবল শিক্ষকদের বেতন বেড়েছে আর কারো নয়। হ্যাঁ বেড়েছে রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীদেরও। তবে যদি গদি উল্টে যাবার ভয়ে তাদের বিষয়ে কথা বলতেন না প্রধানমন্ত্রীও। একই ভয় পেয়ে বসেছে বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টার মধ্যেও। তার কথায়ও একই সুর আগামী পে-স্কেলে শিক্ষকদের বাড়ী ভাড়া দিগুন হবে। বলুন তো, খালি শিক্ষকদেরই দিগুন হবে???

 

বৈষম্যহীন সমাজ/রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশীদের হাত ধরে ৭১ এসেছে, এসছে ২৪ও। পরিবারে চাহিদা মেটাতে না পেড়ে সমাজের লাখো শ্রমিক-দিনমুজর, চাষী নিঝুম রাতে একা একা ঢ়ুকরে কাঁদে। শিক্ষকেরাও এই সমাজরই অংশ তারাও লুকিয়ে কাঁদে, যেন কেউ না দেখে।

 

বৃটিশ লাটেরা চলে গেলেও রীতিনীতি গুলো রেখে গেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে “নব্য লাট” (ক্যাডার কর্মকর্তা/ আমলারা)। রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল কল-কাঠি তাদের হাতেই। শিক্ষকদের ভ্যাগ বিধাতা যেন তারাই। দেশের ৯৫ ভাগ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের ভাগ্য তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত। শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রনালয় সব খানেই প্রভুত্ব তাদের। তারা চাইলে কিছু জোটে, নইলে না।

 

বর্তমানে দেশের ৬ লক্ষ মাধ্যমিক শিক্ষক, কয়েক লক্ষ প্রাথমিকের শিক্ষকসহ সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন তিন বেলা খাবার জোগার করতে হিমশিম খায় তখন লাটেরা আছেন বেশ আরাম আয়েশে। সরকারী টাকায় দু-চারজন চাকর/চাপরাশি থাকে তাদের সেবায়। লাটদের সম্পদের ক্ষুধা যেন পাহাড়সম। তাইতো পাহাড়ের উপর পুকুর খনন, রাস্তা ছাড়া ব্রীজ নির্মাণসহ উন্নয়নের মহাকাব্য রচনা করে টাকা লুটের মহাৎসবে মেতে উঠলেও তারা থাকেন অধরা।

 

অফিস পিয়ন থেকে শুরু করে বস, সবারই যেন হাজার কোটির রিসোট/বাংলো/গাড়ীর মালিক হওয়া-ই চাই-ই। আবেগাপ্লুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলতেন, তার পিয়ন ৪শত কোটি টাকার মালিক, পিএসসির গাড়ী চালকেরও আছে শত শত কোটি টাকা। কর কমিশনার মতিউরের কথা কে না জানে। সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের দেশের বাইরে ২০০বাড়ী। শিক্ষকের জমানো ৭ হাজার কোটা টাকা নিয়ে শাজাহান সাজুরা বিদেশ পাড়ি দেয়, ব্যাংক লুট করে এস আলমরা উধাও। আর শিক্ষকরা সামান্য ভাতা বৃদ্ধির দাবীতে শহীদ মিনারে খেয়ে না খেয়ে পড়ে থাকে লাট সাহেবদের সুদৃষ্টির আশায়। ভাবা যায়?? কি নিদারুন সামজিক বৈষম্য!!

 

প্রিয় পাঠক, লাট সাহেবের কুকুরের কথা মনে আছে নিশ্চই! সৈয়দ মুজতবা আলী গল্পের শেষাংশে পন্ডিত মশাইয়ের যে বেদনাদায়ক অভিব্যক্তি তুলে ধরেছেন তা যে কারোরই হৃদয়যন্ত্রণা তৈরী করবে…….

 

পন্ডিত মশাই জানতে পেরেছেন “সফরসঙ্গী কুকুরটির পেছনে লাট সাহেবের মাসিক খরচ পঁচাত্তর টাকা। পন্ডিত মশাইয়ের মাসিক বেতন সাকুল্যে পঁচিশ টাকা। কুকুরটির সাথে মনে মনে নিজের তুলনা করে পন্ডিত মশাই নিজেকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভেবে মর্মাহত হয়েছেন। পন্ডিত মশাইসহ তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিলো আটজন।

 

ক্লাসের কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে পন্ডিত মশাই তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন, লাট সাহেব তার কুকুরের পিছনে মাসে খরচ করেন পচাত্তর টাকা। এইবার দেখি তুই কি রকম অংক শিখেছিস, বল তো দেখি, “যদি একটা কুকুরের পিছনে মাসে পচাত্তুর টাকা খরচ হয়, আর সেই কুকুরের যদি তিনটি ঠ্যাং হয় তবে প্রতি ঠ্যাং এর জন্য কত খরচ হয়?

 

একেবারেই সোজা ভেবে ছাত্র তড়িঘড়ি উত্তর দিলো,“আজ্ঞে পঁচিশ টাকা”। পন্ডিত মশাই বললেন সাধু সাধু। তারপর বললেন, “আমি, ব্রাহ্মণী (স্ত্রী), বৃদ্ধা মাতা, তিন কন্যা, বিধবা পিসি, দাসী, আমাদের সকলের জীবনধারণের জন্য আমি মাসে বেতন পাই পঁচিশ টাকা। এখন বল তো দেখি, “এই ব্রাহ্মণ পরিবার লাট সাহেবের কুকুরের কটা ঠ্যাঙের সমান”?

 

সমস্ত ক্লাস নিস্তব্ধ। পন্ডিত মশাই হুংকার দিয়ে বললেন ‘উত্তর দে’। ক্লাসের সবাই বুঝতে পেরেছে, পন্ডিত মশাই আত্ম অবমাননার কি নির্মম পরিহাস সর্বাঙ্গে মেখেছেন। লজ্জা, তিক্ততা, ঘৃণায় বিকৃত হয়ে গিয়েছেন।

“পন্ডিত মশাই” গল্পে সৈয়দ মুজতবা আলী তৎকালীন শিক্ষক সমাজের যে আর্থিক দৈন্যতা আর সামাজিক অমর্যাদার চিত্র তুলে ধরেছেন, তা বর্তমান শিক্ষক সমাজেও বহমান।

 

আরও পড়ুন: স্বাধীনতার ৫৪ বছরে কতোটুকু শিক্ষিত হলো জাতি’?

উন্নয়নের মহাকাব্যে এই দেশের আকাশে হাজার কোটি টাকার স্যাটেলাইট উড়ে। উড়ন্ত সেতু, মেট্রোরেল, নয়নাভিরাম স্থাপনা, আধুনিক রাস্তা-ঘাট, ড্রাইভার-পিয়নদের শত শত কোটি টাকা, ছোট লাট-বড় লাটদের (আমলাদের) হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ, বেগম পাড়ায় অত্যাধুনিক বাড়ী। সেই দেশের শিক্ষক সমাজ সামান্য বাড়ী ভাড়া বৃদ্ধির জন্য থালা-বাটি হাতে নিয়ে ভুখা মিছিল করে। শহীদ মিনারে রাত্রি যাপন করে। জাতি হিসেবে এটা কতোটা সন্মানের???

শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক। দেশের সকল রাজনৈতিক পক্ষগুলো যখন এটি এক কন্ঠে স্বীকার করেন তখন এক অদৃশ্য ছায়ায় আটকে যায় শিক্ষকদের আর্তনাদ। স্বাধীন বাংলাদেশের ছোট লাট-বড় লাট কেহই যেন চান না শিক্ষকরা আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল হোক, সামাজিক মর্যাদাবান হোক।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। কিন্তু সেই মেরুদন্ড গড়ার কারিগরদের অভূক্ত রেখে আপনার আমার সোনার বাংলাদেশ কি ভাবে গড়ে উঠবে, “আপনার বিবেকের কাছে প্রশ্ন রইলো”??

লেখক: অধ্যক্ষ, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মমতাকে অব্যাহতি দিয়ে ভেঙে দেওয়া হলো পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভা

শিক্ষকদের ভ্যাগ্যবিধাতা স্বাধীন বাংলাদেশের “লাট”

আপডেট টাইম : ১২:৪০:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

মো. মাসুদ রানা ওয়াসিম

সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পন্ডিত মশাই’ ছোট গল্পের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সম্ভবত ১৯৫২ সাল হবে। তিনি সমাজের সুবিধা বঞ্চিত এক স্কুল শিক্ষকের জীবনের করুণ চিত্র তুলে ধরেছিলেন ‘চাচা কাহিনী’তে সংকলিত ‘পন্ডিত মশাই’ গল্পে। একটু বলে রাখি “একবার পন্ডিত মশাইয়ের স্কুল পরিদর্শনে আসেন লাট সাহেব। লাট সাহেবের সফরসঙ্গীদের মধ্যে একটি তিন পা ওয়ালা কুকুরও ছিল……..” আর পন্ডিত মশাইয়ের পরিবারের সদস্য ছিলো আটজন।

 

বৃটিশ শাসনামলের সামাজিক শোষন-বঞ্চনার এক খন্ড চিত্র পন্ডিত মশাই। ১৯৪৭ সালে বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে চলে যাবার পর ১৯৭১ স্বাধীন বাংলাদের জন্ম হয়। বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কথা বলে ৫৪ বছরে বহু সরকার এসেছে, চলেও গেছে। কতোটুকু আর্থিক পরিবর্তন হয়েছে প্রান্তিক মানুষের? কিংবা অর্ধশত বছরের শাসনে কতোটুকু বদলিয়েছে “জাতির মেরুদন্ড”গড়ার কারিগর শিক্ষকদের জীবন-মান ও সামাজিক মর্যাদা?

 

চোখ বন্ধ করে বলা যায় “না এতোটুকুও বদলায়নি বরং কমেছে”। আর্থিক বঞ্চনার পাশাপাশি কমেছে শিক্ষকের মর্যাদাও। স্বাধীন বাংলাদেশে একজন ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী শিক্ষককে গলা ধাক্কা দেয়। বড় কর্তার অফিস পিয়ন ঘন্টার পর ঘন্টা বরান্দায় বসিয়ে রাখেন স্যারের ব্যস্ততার কথা বলে। আইনের রক্ষক পুলিশ রাস্তায় ফেলে পিটায় শিক্ষকদের। গালাগাল করেন জনগনের সেবক ‘‘ছবক”ধারী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও। অথচ আমাদের অনাদৃত শিক্ষক শ্রেণি যে কারো কাছ থেকে সামান্য সম্মান বা একটি ধন্যবাদ পেলে যে পরিমান খুশি হন, যা তাদের পেটের ক্ষাধাও ভুলিয়ে রাখে।

 

১২৭০০ টাকা মাসিক বেতনে (এন্টি লেভেলে) একজন সহকারী শিক্ষক দ্রব্যমূল্য উর্ধ্বগতির এই বাজারে পেটে-ভাতে কুলিয়ে উঠতে না পেড়ে যখন দাবি-দাওয়া নিয়ে মুনিবদের দারস্থ হয়েছে তখনই নানা কটু কথায় বিতাড়িত হয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে তাদের। কখনও বা এর বেশি। সাবেক সরকারের প্রধানমন্ত্রী তো প্রায়ই বলতেন কি দেইনি শিক্ষকদের, “তাদের বেতন দ্বিগুন করা হয়েছে”। ভাবুন তো দিগুনে যদি ১২৭০০ টাকা হয় তবে এর আগের অবস্থা কি ছিলো? আচ্ছা ২০১৫ পে-স্কেলে কি কেবল শিক্ষকদের বেতন বেড়েছে আর কারো নয়। হ্যাঁ বেড়েছে রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীদেরও। তবে যদি গদি উল্টে যাবার ভয়ে তাদের বিষয়ে কথা বলতেন না প্রধানমন্ত্রীও। একই ভয় পেয়ে বসেছে বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টার মধ্যেও। তার কথায়ও একই সুর আগামী পে-স্কেলে শিক্ষকদের বাড়ী ভাড়া দিগুন হবে। বলুন তো, খালি শিক্ষকদেরই দিগুন হবে???

 

বৈষম্যহীন সমাজ/রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশীদের হাত ধরে ৭১ এসেছে, এসছে ২৪ও। পরিবারে চাহিদা মেটাতে না পেড়ে সমাজের লাখো শ্রমিক-দিনমুজর, চাষী নিঝুম রাতে একা একা ঢ়ুকরে কাঁদে। শিক্ষকেরাও এই সমাজরই অংশ তারাও লুকিয়ে কাঁদে, যেন কেউ না দেখে।

 

বৃটিশ লাটেরা চলে গেলেও রীতিনীতি গুলো রেখে গেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে “নব্য লাট” (ক্যাডার কর্মকর্তা/ আমলারা)। রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল কল-কাঠি তাদের হাতেই। শিক্ষকদের ভ্যাগ বিধাতা যেন তারাই। দেশের ৯৫ ভাগ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের ভাগ্য তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত। শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রনালয় সব খানেই প্রভুত্ব তাদের। তারা চাইলে কিছু জোটে, নইলে না।

 

বর্তমানে দেশের ৬ লক্ষ মাধ্যমিক শিক্ষক, কয়েক লক্ষ প্রাথমিকের শিক্ষকসহ সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন তিন বেলা খাবার জোগার করতে হিমশিম খায় তখন লাটেরা আছেন বেশ আরাম আয়েশে। সরকারী টাকায় দু-চারজন চাকর/চাপরাশি থাকে তাদের সেবায়। লাটদের সম্পদের ক্ষুধা যেন পাহাড়সম। তাইতো পাহাড়ের উপর পুকুর খনন, রাস্তা ছাড়া ব্রীজ নির্মাণসহ উন্নয়নের মহাকাব্য রচনা করে টাকা লুটের মহাৎসবে মেতে উঠলেও তারা থাকেন অধরা।

 

অফিস পিয়ন থেকে শুরু করে বস, সবারই যেন হাজার কোটির রিসোট/বাংলো/গাড়ীর মালিক হওয়া-ই চাই-ই। আবেগাপ্লুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলতেন, তার পিয়ন ৪শত কোটি টাকার মালিক, পিএসসির গাড়ী চালকেরও আছে শত শত কোটি টাকা। কর কমিশনার মতিউরের কথা কে না জানে। সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের দেশের বাইরে ২০০বাড়ী। শিক্ষকের জমানো ৭ হাজার কোটা টাকা নিয়ে শাজাহান সাজুরা বিদেশ পাড়ি দেয়, ব্যাংক লুট করে এস আলমরা উধাও। আর শিক্ষকরা সামান্য ভাতা বৃদ্ধির দাবীতে শহীদ মিনারে খেয়ে না খেয়ে পড়ে থাকে লাট সাহেবদের সুদৃষ্টির আশায়। ভাবা যায়?? কি নিদারুন সামজিক বৈষম্য!!

 

প্রিয় পাঠক, লাট সাহেবের কুকুরের কথা মনে আছে নিশ্চই! সৈয়দ মুজতবা আলী গল্পের শেষাংশে পন্ডিত মশাইয়ের যে বেদনাদায়ক অভিব্যক্তি তুলে ধরেছেন তা যে কারোরই হৃদয়যন্ত্রণা তৈরী করবে…….

 

পন্ডিত মশাই জানতে পেরেছেন “সফরসঙ্গী কুকুরটির পেছনে লাট সাহেবের মাসিক খরচ পঁচাত্তর টাকা। পন্ডিত মশাইয়ের মাসিক বেতন সাকুল্যে পঁচিশ টাকা। কুকুরটির সাথে মনে মনে নিজের তুলনা করে পন্ডিত মশাই নিজেকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভেবে মর্মাহত হয়েছেন। পন্ডিত মশাইসহ তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিলো আটজন।

 

ক্লাসের কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে পন্ডিত মশাই তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন, লাট সাহেব তার কুকুরের পিছনে মাসে খরচ করেন পচাত্তর টাকা। এইবার দেখি তুই কি রকম অংক শিখেছিস, বল তো দেখি, “যদি একটা কুকুরের পিছনে মাসে পচাত্তুর টাকা খরচ হয়, আর সেই কুকুরের যদি তিনটি ঠ্যাং হয় তবে প্রতি ঠ্যাং এর জন্য কত খরচ হয়?

 

একেবারেই সোজা ভেবে ছাত্র তড়িঘড়ি উত্তর দিলো,“আজ্ঞে পঁচিশ টাকা”। পন্ডিত মশাই বললেন সাধু সাধু। তারপর বললেন, “আমি, ব্রাহ্মণী (স্ত্রী), বৃদ্ধা মাতা, তিন কন্যা, বিধবা পিসি, দাসী, আমাদের সকলের জীবনধারণের জন্য আমি মাসে বেতন পাই পঁচিশ টাকা। এখন বল তো দেখি, “এই ব্রাহ্মণ পরিবার লাট সাহেবের কুকুরের কটা ঠ্যাঙের সমান”?

 

সমস্ত ক্লাস নিস্তব্ধ। পন্ডিত মশাই হুংকার দিয়ে বললেন ‘উত্তর দে’। ক্লাসের সবাই বুঝতে পেরেছে, পন্ডিত মশাই আত্ম অবমাননার কি নির্মম পরিহাস সর্বাঙ্গে মেখেছেন। লজ্জা, তিক্ততা, ঘৃণায় বিকৃত হয়ে গিয়েছেন।

“পন্ডিত মশাই” গল্পে সৈয়দ মুজতবা আলী তৎকালীন শিক্ষক সমাজের যে আর্থিক দৈন্যতা আর সামাজিক অমর্যাদার চিত্র তুলে ধরেছেন, তা বর্তমান শিক্ষক সমাজেও বহমান।

 

আরও পড়ুন: স্বাধীনতার ৫৪ বছরে কতোটুকু শিক্ষিত হলো জাতি’?

উন্নয়নের মহাকাব্যে এই দেশের আকাশে হাজার কোটি টাকার স্যাটেলাইট উড়ে। উড়ন্ত সেতু, মেট্রোরেল, নয়নাভিরাম স্থাপনা, আধুনিক রাস্তা-ঘাট, ড্রাইভার-পিয়নদের শত শত কোটি টাকা, ছোট লাট-বড় লাটদের (আমলাদের) হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ, বেগম পাড়ায় অত্যাধুনিক বাড়ী। সেই দেশের শিক্ষক সমাজ সামান্য বাড়ী ভাড়া বৃদ্ধির জন্য থালা-বাটি হাতে নিয়ে ভুখা মিছিল করে। শহীদ মিনারে রাত্রি যাপন করে। জাতি হিসেবে এটা কতোটা সন্মানের???

শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক। দেশের সকল রাজনৈতিক পক্ষগুলো যখন এটি এক কন্ঠে স্বীকার করেন তখন এক অদৃশ্য ছায়ায় আটকে যায় শিক্ষকদের আর্তনাদ। স্বাধীন বাংলাদেশের ছোট লাট-বড় লাট কেহই যেন চান না শিক্ষকরা আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল হোক, সামাজিক মর্যাদাবান হোক।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। কিন্তু সেই মেরুদন্ড গড়ার কারিগরদের অভূক্ত রেখে আপনার আমার সোনার বাংলাদেশ কি ভাবে গড়ে উঠবে, “আপনার বিবেকের কাছে প্রশ্ন রইলো”??

লেখক: অধ্যক্ষ, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ।