বিকাশ চন্দ্র প্রামানিক ব্যুরো প্রধান, নওগাঁ। জনতার কণ্ঠ.কম
টকশোতে দেওয়া এক মনোনয়ন প্রত্যাশীর মন্তব্যকে ঘিরে চলছে আলোচনা সমালোচনা। সম্প্রতি ডাক্তার ইকরামুল বারী টিপু নামের ওই মনোনয়ন প্রত্যাশী তার বিরুদ্ধে ৭ টি রাজনৈতিক মামলার কথা উল্লেখ করেন বেসরকারি এশিয়ান টেলিভিশনের টকশোতে। আর এতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন মামলা হামলায় নির্যাতিত হওয়া নওগাঁর মান্দা উপজেলার বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এরই ধারাবাহিকতায় নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনে উপজেলা বিএনপির রাজনীতিতে এখন চলছে চরম অস্থিরতা এবং আস্থার সঙ্কট। দলের ভেতরেই যখন ‘ত্যাগ ও মিথ্যার’ ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তখন টেলিভিশন টকশোতে মনোনয়ন প্রত্যাশীর মিথ্যে বক্তব্য দলের বর্ষীয়ান ও কারা নির্যাতিত কর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। প্রতিবাদ শুরু হয়েছে মাঠ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এই পরিস্থিতিতে ডাক্তার ইকরামুল বারী টিপুর মামলা সংক্রান্ত মিথ্যা তথ্য এবং বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য প্রতিবাদ ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ডাঃ ইকরামুল বারী টিপুর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং মিথ্যাচারের অভিযোগ এনে তাঁর সাথে সকল রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ২৩ অক্টোবর দুপুরের দিকে উপজেলার প্রসাদপুর বাজার সংলগ্ন মুনসুর মৃধার আম বাগানে সংবাদ সম্মেলন করে তীব্র প্রতিবাদ জানান তারা।
মান্দা উপজেলা বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত এই প্রতিবাদ ও সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মান্দা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বাবুল।
ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী ঐক্য ও নির্দেশনার প্রতি অবজ্ঞা উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও সাধারণ মানুষ দুঃশাসন থেকে মুক্ত হওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়।
সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বাবুল বলেন, তারেক রহমান দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করার এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও প্রতিশোধপরায়ণ ঘটনা না ঘটানোর জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি আরও নির্দেশ দেন, মানবিকতা ও নৈতিকতার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে রাজনীতি পরিচালনা করতে হবে।
তবে, গভীর উদ্বেগের সাথে তিনি উল্লেখ করে বলেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মান্দা উপজেলা বিএনপির সদস্য ডাঃ ইকরামুল বারী টিপু এবং তাঁর অনুসারীরা ধারাবাহিকভাবে উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড বিএনপির মূল নেতৃত্বকে অবহিত না করে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন এবং বিভ্রান্তিমূলক মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করছেন। তারেক রহমানের নির্দেশ অমান্য করে এমন কাজ চালিয়ে যাওয়ায় দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।

মিথ্যা মামলা দাবির প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, গত ২১ অক্টোবর এশিয়ান টিভি চ্যানেলের একটি অনুষ্ঠানে ডাঃ টিপু বিগত ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর বিরুদ্ধে ৭টি নাশকতামূলক মামলা হয়েছিলো বলে যে দাবি করেছেন, তা ‘নির্জন মিথ্যাচার’ বলে উল্লেখ করা হয়। উপজেলা বিএনপির দাবি, ডাঃ টিপু বিগত ১৫ বছরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সখ্যতা রেখে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন যাপন করেছেন, তাই তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক মামলা হয়নি।
হত্যা মামলার আসামী ও বহিষ্কার সম্পর্কে বলা হয় গত ২০০৪ সালের উপজেলা বিএনপির তৎকালীন সহ-সভাপতি বলিষ্ঠ নেতৃত্ব মুনসুর আলী মৃধা হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামী ছিলেন ডাঃ টিপু। এই মামলায় আসামী হওয়ায় তিনি দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন বলেও জানানো হয়।
আওয়ামী লীগের সুপারিশ গ্রহণ: হত্যা মামলা প্রত্যাহারের আবেদনে ডাঃ টিপু তৎকালীন এমপি ইসরাফিল ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বকুলের সুপারিশ নিয়েছিলেন এবং ঐ আবেদন পত্রে বিএনপি দলকে নিয়ে ‘কুকথা’ বলেছিলেন, যার অনুলিপি সাংবাদিকদের সরবরাহ করা হয়েছে।
জমি দখলের বিষয় বলা হয়, গত ৫ আগস্টের পর ডাঃ টিপুর নেতৃত্বে মান্দা উপজেলার বিল মান্দা হারকিশর মৌজায় ১৮ একর জমি দখল করে নেওয়া হয়, যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিউজ হয়েছে এবং স্থানীয় লোকজন মানববন্ধন করেছিল।
সংস্কারপন্থী ও নৌকার পক্ষে কাজ করেছেন উল্লেখ করে বলা হয়, গত ২০০৬ সালের নির্বাচনে সংস্কারপন্থী হয়ে বিকল্পধারায় যোগদান করে প্রার্থী হয়েছিলেন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীর বিরোধিতা করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে সমর্থন ও তাঁর জন্য ভোট করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।
সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বাবুল বলেন, ডাঃ টিপুর অব্যাহত সংগঠন বিরোধী ও মিথ্যাচারের দায়ভার মান্দা উপজেলা বিএনপি পরিবার কোনোভাবেই বহন করবে না। তিনি বলেন, ডাঃ টিপু জমি দখলসহ মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা করে মান্দায় বিএনপির শৃঙ্খলা ও ইমেজ নষ্ট করে দলকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছেন, যা দলীয় ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মান্দা উপজেলা বিএনপি পরিবার দলের আদর্শ, সুনাম ও শৃঙ্খলার স্বার্থে ডাঃ একরামুল বারী টিপুর সাথে সকল রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ঘোষণা দেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক এবং মান্দা উপজেলা বিএনপির নির্বাচিত সভাপতি এম এ মতীন, নিহত মুনসুর মৃধার ভাই সিনিয়র সহ-সভাপতি মন্টু মৃধা,
একেএম নাজমুল হক নাজু, তোফাজ্জল হোসেন টুকু, সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম সরদার, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বাবুল, সিনিয়র যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন খান, যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক সামছুল ইসলাম বাদল ও কুমার বিশ্বজিৎ সরকার, যুবদলের আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম, ছাত্রদলের আহ্বায়ক শহিদুজ্জামান সালেক এবং সদস্য সচিব পলাশ কুমার সহ বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।
এদিকে গভীর হতাশার কথা প্রকাশ করে বাবার হত্যাকারী হিসেবে ডাক্তার ইকরামুল বারী টিপুর বিচার চাইলেন নিহত মুনসুর মৃধার মেয়ে ফারজানা মৃধা মিতু।

অপরদিকে তীব্র ক্ষোভ, লজ্জা এবং গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক এবং মান্দা উপজেলা বিএনপির নির্বাচিত সভাপতি এম এ মতীন।
সভাপতি এম এ মতীন বলেন, “আজকে আমি একজন বিএনপির কারা নির্যাতিত কর্মী হিসেবে অনেক দুঃখিত, লজ্জিত এবং মর্মাহত হলাম। কারণ মান্দা উপজেলা থেকে একজন সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতা জাতির সামনে একটা টেলিভিশন টকশোতে যেভাবে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করলেন, তা সত্যিই দুঃখজনক।
তিনি বলেন, মাঠ পর্যায় থেকে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে বিতর্ক ও সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে, মুলত সেই সকল দিক বিবেচনা করে আজকের এই প্রতিবাদ।
এসময় মুনসুর মৃধার হত্যাকারী হিসেবে ডাক্তার ইকরামুল বারী টিপুর বিচার চেয়ে হাতে প্লাকার্ড নিয়ে নেতাকর্মীরা শ্লোগান দিতে থাকেন। পরে উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়ন থেকে আগত প্রায় ৫ হাজার নারী-পুরুষ নেতাকর্মী বিভিন্ন প্লাকার্ড হাতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
অভিযোগের বিষয় জানার জন্য উপজেলা বিএনপির সদস্য ও মনোনয়ন প্রত্যাশী ডাক্তার ইকরামুল বারী টিপুর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেননি।

রিপোর্টার: 



















