সিরাজগঞ্জ , বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে নিহতদের বাড়িতে

নওগাঁয় চলছে শোকের মাতম, নেই সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা

আমার ছেলেরা তো স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল। সংসারের কষ্ট দূর করবে, বাড়ি করবে, বিয়ে করবে—কত স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আগুন সব শেষ করে দিল। দুই সন্তানকে হারিয়ে আহাজারি করতে করতে করতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে নিহত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের দুই ভাই মোহন ও সুমনের মা ময়না খাতুন।

 

পরীবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তার স্ত্রী সাফিয়া খাতুন। পরিবারের বড় ছেলে ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান। ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। এখন এই ঋণ কেমনে শোধ করবো।

 

মিম বানুর কোলে ছোট্র শিশু। মুখে নেই কোনো হাসি। তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ মাস আগে জীবিকার তাগিদে আমার স্বামী সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেদিন রাতে আমার সাথে কথা বলার মাঝে ফোনটা রাখতে বলে কল কেটে দিছে। তারপর আর কোনো কথা নেই। আরও কখনও কথা হবেও না। কথাগুলো বলছিলেন নওগাঁ শহরের নিহত শাহিনের স্ত্রী মিম বানু। তিনি বলেন আমার শ্বাশুড়ি ও দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে এখন কেমন করে চলবো।

 

আর এভাবেই নওগাঁ জেলায় চলছে শোকের মাতম। এরমধ্যে জেলার আত্রাই উপজেলায় বিভিন্ন পরিবারের ১২টি উপার্জনের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাওয়া সদস্যদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম আর কান্না। সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৭ বাংলাদেশি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে জেলার আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ১২জন এবং নওগাঁ শহরে একজন রয়েছেন। একসঙ্গে এতজন প্রবাসীর মৃত্যুতে পুরো উপজেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি।

 

সোমবার (১০আগষ্ট) উপজেলার গন্ডগোহালী, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আশেপাশে নেই কোনো হাসি। এলাকাজুড়ে শুধু নিস্তব্ধতা। আর নিহতদের বাড়িতে শুধু কান্নার শব্দ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তাদের কেউ আবার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তাদের চোখের পানি দেখে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষগুলোরও চোখ ভিজে যাচ্ছে। একে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেরাই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোক আর বুকফাটা আহাজারি।

 

‘আগুনে পুড়ে যাচ্ছি মা, ঘরে তালা দেওয়া—বের হতে পারছি না। বিদ্যুৎ নেই মা।’ সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত আত্রাইয়ের গন্ডগোহালি গ্রামের দুই ভাই মোহন ও সুমনের শেষ কথাগুলো স্মরণ করে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তাদের মা।

 

মোহন এবং সুমনকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা ময়না খাতুন বলেন, ‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনোদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করে বাড়ি আসবো। বাড়ি এসে বিয়া করমু মা। মেয়ে-টেয়ে দেখো না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করমু। কিন্তু আসা হলো না। কি সর্বনাশ হলো বাবা আমার।’

 

মোহন ও সুমনের বাবা গুফফার প্রামাণিক বলেন “আমার তিন ছেলের মধ্যে দুজন সৌদিতে কাজ করত। বড় ছেলে মোহন সাত বছর আর সুমন তিন বছর আগে যায়। ছোট ছেলেটি প্রতিবন্ধী, আমি নিজেও প্রতিবন্ধী। মোহনের আগামী মাসেই দেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু কারখানায় লাগা আগুনে আমার দুই সন্তানসহ আরও কয়েকজন মারা যায়। তিনি বলেন, কিছুদিনের মধ্যে বাড়িতে এসে বিয়ে করার কথা ছিল তাদের। কিন্তু এই অগ্নিকাণ্ড আমার সব স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে।

 

একই গ্রামের নিহত রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘আমার রুবেলের ৯ বছর হচ্ছে সৌদি যাওয়ার বয়স। সাড়ে ছয় বছর পরে ছুটিতে আইছিল। আসার পরে ছাওয়ালোক আবার বিয়া দিনু। বিয়া করে আবার গেলো সৌদি। যেয়ে দুই বছরকার মাথাত আবার আলো বাড়িত। আসে ছয় মাসের ছুটি কাটে গেলো। ছয় মাস ছুটি কাটায়ে যায়ে কেবল তিন মাস হলো। ওটি যায়ে সোফা সেটের কাজ করে হামার ছাওয়াল। ‘আমার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকলো না বাবা। আমার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হচ্ছে। দুনিয়ার বুকে তো আমাক আর দেখার মতো আর কিছু থাকলো না বাবা! ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।’

 

রুবেলের চাচাতো ভাই বিপ্লব হোসেন জানান, ১২-১৪ বছর ধরে রুবেল সৌদি আরবে যাতায়াত করছেন। তার মাত্র ১৫ দিন বয়সী একটি নবজাতক কন্যাসন্তান রয়েছে।

 

নিহত ফরিদ শেখের স্ত্রী সুখি বেগম বলেন, “আমার স্বামী ঋণ করে চার বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। শুরুতে তেমন ভালো কিছু করতে পারেননি। পরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ওই কারখানায় কাজ করছিলেন। ঘটনার দিন বিকেলেও তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আমি এখন দিশেহারা। আমার বসতবাড়ি বলতেও তেমন কিছু নেই। সরকারের কাছে আমার দাবি, আমার স্বামীর লাশ যেন দ্রুত আমাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।

 

সৌদির রিয়াদে থাকা অন্য বাংলাদেশি প্রবাসীদের বরাত দিয়ে ফরিদ শেখের চাচাতো ভাই জাহিদুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকান্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় ফরিদ শেখসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন।

 

প্রতিবেশী জামিউল হক জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঠিক আগমুহূর্তে বিকেল ৩টা ৫১ মিনিটে মোহন বাড়িতে ফোন দিয়েছিলেন। গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকায় এবং ওয়াইফাই বন্ধ থাকায় পরিবার সরাসরি কথা বলতে পারেনি। পরে পাঠানো শেষ ভয়েস মেসেজে মোহন আকুতি জানিয়ে বলেন—  মা কেন ফোন ধরতিছো না, আমাদের গোদামে আগুন লাগছে, আমরা বের হতে পারতেছি না।

 

ডুবাই গ্রামের নিহত হাসিবুল হাসান শুভ’র চাচা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন।’

 

তিনি বলেন, ‘হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাশ করে স্থানীয় একটা এনজিওতে চাকরি করতো। ওই চাকরিটা চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার জীবন-যাপন করে। পরে জীবিকার সন্ধানে ও পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে সে সৌদি আরবে যায়।’

 

এদিকে পরীবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তার স্ত্রী সাফিয়া খাতুন। পরিবারের বড় ছেলে ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান। ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে? নিহত ফরিদের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী মেয়ে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে পুরো পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে।

 

সৌদির রিয়াদে থাকা অন্য বাংলাদেশি প্রবাসীদের বরাত দিয়ে ফরিদ শেখের চাচাতো ভাই জাহিদুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকান্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় ফরিদ শেখসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন।

 

নিহতদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার চারজন একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন- উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের গাফ্ফার প্রামানিকের ছেলে  মো. মোহন (২২), তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও মৃত বজলুর প্রামাণিকের ছেলে মো. কলিমউদ্দিন প্রামাণিক (৩৫)। এই উপজেলার নিহত অন্যরা হলেন- উপজেলার সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের আব্দুল জলিল (৪৮) ও মজনুর ছেলে মজিদুল ইসলাম (৩৪), উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার মৃত মজনুর ছেলে শাহিন (৩৮)।

 

কারখানার একমাত্র জীবিত কর্মী গন্ডগোহালি গ্রামের হাবিবুর রহমান বলেন, আমি দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে চুল কাটার জন্য কারখানা থেকে বের হয়ে যাই। পরে ফিরে এসে দেখি কারখানায় আগুন জ্বলছে। তিনি জানান, সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্সের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। নিহতদের কয়েকজন সরাসরি আগুনে পুড়ে এবং কয়েকজন কালো ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান।

 

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, সৌদি আরবের রিয়াদ নগরীতে সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ ঘটনায় ১৩জন রেমিট্যান্স যোদ্ধা নিহত হওয়ার সংবাদ আমরা পেয়েছি। তবে “আমরা এখন পর্যন্ত আত্রাইয়ে ১১জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পেরেছি। বাকিদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

 

তিনি আরও বলেন, “সংবাদ পাওয়ার পরপরই গভীর রাতে গন্ডগোহালি গ্রামে নিহতদের পরিবারের কাছে গিয়েছি। অন্যদের বাড়িতেও গিয়েছি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে যত দ্রুত সম্ভব তাদের মরদেহ দেশে আনার চেষ্টা করা হবে। সেই জন্য নিহতদের পাসপোর্ট ও এনআইডি তথ্য সংগ্রহের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।

 

নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শাহীন মাহমুদ বলেন, ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা মো: শাহীন মৃত্যুবরণ করেন। খবর পেয়ে সোমবার দুপুরে শহরের পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস পাড়ায় নিহতের বাসভবনে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয় এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী তুলে দেয়া হয়।

 

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাঁদের মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার ব্যাপারে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের অব্যাহত রয়েছে। সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশে মরদেহ আসতে কিছু দিন সময় লাগতে পারে। সৌদি দূতাবাস ও নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’

 

এদিকে ওই সকল রেমিট্যান্স যোদ্ধার মর্মান্তিক মৃত্যুতে নওগাঁ ও আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের চোখে এখন শুধু প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখার আকুতি—লাশটা দ্রুত দেশে এনে আমাদের কাছে দিন।

 

অপরদিকে তাদের এই অকাল মৃত্যুতে পরিবার ও পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনরা এখন সরকারের কাছে দ্রুত নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুল আকুতি জানাচ্ছেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এর পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে।

 

অন্যদিকে প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয় থেকেও দেওয়া হয়েছে বিবৃতি।

 

উল্লেখ, নিহতদের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় গত রোববার বাংলাদেশ সময় দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সৌদি আরবের রিয়াদ মহানগরীর শিফা থানাধীন মুসাসানাইয়া শিল্প এলাকায় বাংলাদেশি কর্মীদের পরিচালনাধীন ওই কারখানায় নওগাঁর সদর ও আত্রাই এবং নাটোরের নলডাঙ্গা ও রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বেশ কিছু শ্রমিক কাজ করতেন। কারখানাটিতে মোট ১৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করতেন। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ওই কারখানার মধ্যে আটকে পড়া ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই ও সদর উপজেলায়। বাকি দুইজনের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় এবং একজনের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়।

 

অগ্নিকাণ্ডের পর সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। সৌদি সময় রাত ১১টার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়।

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে নিহতদের বাড়িতে

নওগাঁয় চলছে শোকের মাতম, নেই সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা

আপডেট টাইম : ০৮:৩৫:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

আমার ছেলেরা তো স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল। সংসারের কষ্ট দূর করবে, বাড়ি করবে, বিয়ে করবে—কত স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আগুন সব শেষ করে দিল। দুই সন্তানকে হারিয়ে আহাজারি করতে করতে করতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে নিহত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের দুই ভাই মোহন ও সুমনের মা ময়না খাতুন।

 

পরীবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তার স্ত্রী সাফিয়া খাতুন। পরিবারের বড় ছেলে ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান। ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। এখন এই ঋণ কেমনে শোধ করবো।

 

মিম বানুর কোলে ছোট্র শিশু। মুখে নেই কোনো হাসি। তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ মাস আগে জীবিকার তাগিদে আমার স্বামী সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেদিন রাতে আমার সাথে কথা বলার মাঝে ফোনটা রাখতে বলে কল কেটে দিছে। তারপর আর কোনো কথা নেই। আরও কখনও কথা হবেও না। কথাগুলো বলছিলেন নওগাঁ শহরের নিহত শাহিনের স্ত্রী মিম বানু। তিনি বলেন আমার শ্বাশুড়ি ও দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে এখন কেমন করে চলবো।

 

আর এভাবেই নওগাঁ জেলায় চলছে শোকের মাতম। এরমধ্যে জেলার আত্রাই উপজেলায় বিভিন্ন পরিবারের ১২টি উপার্জনের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাওয়া সদস্যদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম আর কান্না। সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৭ বাংলাদেশি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে জেলার আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ১২জন এবং নওগাঁ শহরে একজন রয়েছেন। একসঙ্গে এতজন প্রবাসীর মৃত্যুতে পুরো উপজেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি।

 

সোমবার (১০আগষ্ট) উপজেলার গন্ডগোহালী, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আশেপাশে নেই কোনো হাসি। এলাকাজুড়ে শুধু নিস্তব্ধতা। আর নিহতদের বাড়িতে শুধু কান্নার শব্দ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তাদের কেউ আবার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তাদের চোখের পানি দেখে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষগুলোরও চোখ ভিজে যাচ্ছে। একে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেরাই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোক আর বুকফাটা আহাজারি।

 

‘আগুনে পুড়ে যাচ্ছি মা, ঘরে তালা দেওয়া—বের হতে পারছি না। বিদ্যুৎ নেই মা।’ সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত আত্রাইয়ের গন্ডগোহালি গ্রামের দুই ভাই মোহন ও সুমনের শেষ কথাগুলো স্মরণ করে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তাদের মা।

 

মোহন এবং সুমনকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা ময়না খাতুন বলেন, ‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনোদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করে বাড়ি আসবো। বাড়ি এসে বিয়া করমু মা। মেয়ে-টেয়ে দেখো না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করমু। কিন্তু আসা হলো না। কি সর্বনাশ হলো বাবা আমার।’

 

মোহন ও সুমনের বাবা গুফফার প্রামাণিক বলেন “আমার তিন ছেলের মধ্যে দুজন সৌদিতে কাজ করত। বড় ছেলে মোহন সাত বছর আর সুমন তিন বছর আগে যায়। ছোট ছেলেটি প্রতিবন্ধী, আমি নিজেও প্রতিবন্ধী। মোহনের আগামী মাসেই দেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু কারখানায় লাগা আগুনে আমার দুই সন্তানসহ আরও কয়েকজন মারা যায়। তিনি বলেন, কিছুদিনের মধ্যে বাড়িতে এসে বিয়ে করার কথা ছিল তাদের। কিন্তু এই অগ্নিকাণ্ড আমার সব স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে।

 

একই গ্রামের নিহত রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘আমার রুবেলের ৯ বছর হচ্ছে সৌদি যাওয়ার বয়স। সাড়ে ছয় বছর পরে ছুটিতে আইছিল। আসার পরে ছাওয়ালোক আবার বিয়া দিনু। বিয়া করে আবার গেলো সৌদি। যেয়ে দুই বছরকার মাথাত আবার আলো বাড়িত। আসে ছয় মাসের ছুটি কাটে গেলো। ছয় মাস ছুটি কাটায়ে যায়ে কেবল তিন মাস হলো। ওটি যায়ে সোফা সেটের কাজ করে হামার ছাওয়াল। ‘আমার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকলো না বাবা। আমার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হচ্ছে। দুনিয়ার বুকে তো আমাক আর দেখার মতো আর কিছু থাকলো না বাবা! ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।’

 

রুবেলের চাচাতো ভাই বিপ্লব হোসেন জানান, ১২-১৪ বছর ধরে রুবেল সৌদি আরবে যাতায়াত করছেন। তার মাত্র ১৫ দিন বয়সী একটি নবজাতক কন্যাসন্তান রয়েছে।

 

নিহত ফরিদ শেখের স্ত্রী সুখি বেগম বলেন, “আমার স্বামী ঋণ করে চার বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। শুরুতে তেমন ভালো কিছু করতে পারেননি। পরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ওই কারখানায় কাজ করছিলেন। ঘটনার দিন বিকেলেও তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আমি এখন দিশেহারা। আমার বসতবাড়ি বলতেও তেমন কিছু নেই। সরকারের কাছে আমার দাবি, আমার স্বামীর লাশ যেন দ্রুত আমাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।

 

সৌদির রিয়াদে থাকা অন্য বাংলাদেশি প্রবাসীদের বরাত দিয়ে ফরিদ শেখের চাচাতো ভাই জাহিদুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকান্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় ফরিদ শেখসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন।

 

প্রতিবেশী জামিউল হক জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঠিক আগমুহূর্তে বিকেল ৩টা ৫১ মিনিটে মোহন বাড়িতে ফোন দিয়েছিলেন। গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকায় এবং ওয়াইফাই বন্ধ থাকায় পরিবার সরাসরি কথা বলতে পারেনি। পরে পাঠানো শেষ ভয়েস মেসেজে মোহন আকুতি জানিয়ে বলেন—  মা কেন ফোন ধরতিছো না, আমাদের গোদামে আগুন লাগছে, আমরা বের হতে পারতেছি না।

 

ডুবাই গ্রামের নিহত হাসিবুল হাসান শুভ’র চাচা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন।’

 

তিনি বলেন, ‘হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাশ করে স্থানীয় একটা এনজিওতে চাকরি করতো। ওই চাকরিটা চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার জীবন-যাপন করে। পরে জীবিকার সন্ধানে ও পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে সে সৌদি আরবে যায়।’

 

এদিকে পরীবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তার স্ত্রী সাফিয়া খাতুন। পরিবারের বড় ছেলে ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান। ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে? নিহত ফরিদের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী মেয়ে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে পুরো পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে।

 

সৌদির রিয়াদে থাকা অন্য বাংলাদেশি প্রবাসীদের বরাত দিয়ে ফরিদ শেখের চাচাতো ভাই জাহিদুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকান্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় ফরিদ শেখসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন।

 

নিহতদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার চারজন একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন- উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের গাফ্ফার প্রামানিকের ছেলে  মো. মোহন (২২), তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও মৃত বজলুর প্রামাণিকের ছেলে মো. কলিমউদ্দিন প্রামাণিক (৩৫)। এই উপজেলার নিহত অন্যরা হলেন- উপজেলার সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের আব্দুল জলিল (৪৮) ও মজনুর ছেলে মজিদুল ইসলাম (৩৪), উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার মৃত মজনুর ছেলে শাহিন (৩৮)।

 

কারখানার একমাত্র জীবিত কর্মী গন্ডগোহালি গ্রামের হাবিবুর রহমান বলেন, আমি দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে চুল কাটার জন্য কারখানা থেকে বের হয়ে যাই। পরে ফিরে এসে দেখি কারখানায় আগুন জ্বলছে। তিনি জানান, সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্সের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। নিহতদের কয়েকজন সরাসরি আগুনে পুড়ে এবং কয়েকজন কালো ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান।

 

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, সৌদি আরবের রিয়াদ নগরীতে সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ ঘটনায় ১৩জন রেমিট্যান্স যোদ্ধা নিহত হওয়ার সংবাদ আমরা পেয়েছি। তবে “আমরা এখন পর্যন্ত আত্রাইয়ে ১১জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পেরেছি। বাকিদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

 

তিনি আরও বলেন, “সংবাদ পাওয়ার পরপরই গভীর রাতে গন্ডগোহালি গ্রামে নিহতদের পরিবারের কাছে গিয়েছি। অন্যদের বাড়িতেও গিয়েছি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে যত দ্রুত সম্ভব তাদের মরদেহ দেশে আনার চেষ্টা করা হবে। সেই জন্য নিহতদের পাসপোর্ট ও এনআইডি তথ্য সংগ্রহের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।

 

নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শাহীন মাহমুদ বলেন, ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা মো: শাহীন মৃত্যুবরণ করেন। খবর পেয়ে সোমবার দুপুরে শহরের পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস পাড়ায় নিহতের বাসভবনে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয় এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী তুলে দেয়া হয়।

 

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাঁদের মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার ব্যাপারে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের অব্যাহত রয়েছে। সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশে মরদেহ আসতে কিছু দিন সময় লাগতে পারে। সৌদি দূতাবাস ও নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’

 

এদিকে ওই সকল রেমিট্যান্স যোদ্ধার মর্মান্তিক মৃত্যুতে নওগাঁ ও আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের চোখে এখন শুধু প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখার আকুতি—লাশটা দ্রুত দেশে এনে আমাদের কাছে দিন।

 

অপরদিকে তাদের এই অকাল মৃত্যুতে পরিবার ও পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনরা এখন সরকারের কাছে দ্রুত নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুল আকুতি জানাচ্ছেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এর পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে।

 

অন্যদিকে প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয় থেকেও দেওয়া হয়েছে বিবৃতি।

 

উল্লেখ, নিহতদের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় গত রোববার বাংলাদেশ সময় দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সৌদি আরবের রিয়াদ মহানগরীর শিফা থানাধীন মুসাসানাইয়া শিল্প এলাকায় বাংলাদেশি কর্মীদের পরিচালনাধীন ওই কারখানায় নওগাঁর সদর ও আত্রাই এবং নাটোরের নলডাঙ্গা ও রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বেশ কিছু শ্রমিক কাজ করতেন। কারখানাটিতে মোট ১৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করতেন। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ওই কারখানার মধ্যে আটকে পড়া ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই ও সদর উপজেলায়। বাকি দুইজনের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় এবং একজনের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়।

 

অগ্নিকাণ্ডের পর সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। সৌদি সময় রাত ১১টার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়।