সিরাজগঞ্জ , বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
দেশি ধানের ২৫ নতুন জাত উদ্ভাবন

প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি, পেয়েছেন মানুষের ভালোবাসা

স্বীকৃতি মেলেনি, পেয়েছেন শুধু ভালোবাসা

২০০৫ সাল থেকে বিলুপ্তপ্রায় আমন ধানের ২৫টি জাত উদ্ভাবন করেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সেন্টু কুমার হাজং। বাজারে তার উদ্ভাবিত জাতের ধানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ২১ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখনো এই উদ্ভাবনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি সেন্টু। তবে পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকদের ভালোবাসা। কিন্তু আশার কথা হলো, জনকল্যাণমুখী ও সমাজ উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের তালিকায় সেন্টু হাজংয়ের এই অসামান্য কীর্তি তুলে ধরতে কাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।

 

 

 

 

 

উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের সেন্টু কুমার হাজংয়ের বাড়ি। কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা সেন্টু হাজং এসএসসি পাস করার পর আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। শিক্ষাজীবন থেমে গেলেও নতুন কিছু করার স্পৃহা থামেনি তার। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) অধীনে ব্রিডিং বিষয়ে মাত্র ১০ দিনের একটি প্রশিক্ষণ নেন। এরপর শুরু করেন ধানের জাত উদ্ভাবনের কাজ।

 

 

 

 

সরেজমিন দেখা যায়, ধান আবিষ্কারের জন্য সেন্টুর কোনো আধুনিক গবেষণাগার নেই। বাড়ির দুটি ঘরের একটিতে তিনি বসবাস করেন এবং অন্যটি গোয়ালঘরে চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষণা। ঘরের ভেতরে কয়েকটি মটকায় ধান সংরক্ষণ করে তা দিয়েই চলছে উদ্ভাবনী কার্যক্রম। নিজের ১২ কাঠা আবাদি জমিকে গবেষণাগার বানিয়ে ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন করে চলেছেন তিনি।

 

সেন্টু হাজং জানান, ধানের জাত উদ্ভাবনে তিনি ব্যবহার করেন ব্রিডিং বা সংকরায়ণ পদ্ধতি। একটি নতুন জাত তৈরি করে তা যাচাই করতে সময় লাগে সাত থেকে আট বছর। বর্তমানে ওই ১২ কাঠা জমিতে তার ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট রয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা জাতের ধান নিয়ে তিনি পরীক্ষা চালান। একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়েন না; নতুন উদ্যমে শুরু করেন পরবর্তী গবেষণায়। এভাবেই নতুন জাতের ধান উদ্ভাবনে সফলতা অর্জন করেন তিনি।

 

সেন্টু হাজংয়ের প্রথম সফল উদ্ভাবন ‘সেন্টু শাইল’ ধান। দীর্ঘ সাত বছরের চেষ্টার পর তিনি এই জাতটি উদ্ভাবন করেন। এরপর আবিষ্কার করেন ‘সেন্টু পাইজাম’ ধান, যা এলাকার কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলতি আমন মৌসুমে শত শত কৃষক সেন্টু পাইজাম ও সেন্টু শাইল ধান আবাদ করেছেন। আর কিছুদিন পরই শুরু হবে এসব ধান কাটা। সেন্টু-১ থেকে সেন্টু-২৫ পর্যন্ত তার উদ্ভাবিত সব ধানই তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে নামকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সেন্টু শাইল, পাঁচ ধরনের সেন্টু পাইজাম, তিন ধরনের চিনিশাইল ও তুলশিমালা অন্যতম।

 

 

 

শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনই নয়, হারিয়ে যাওয়া দেশি ধানের জাত সংরক্ষণেও কাজ করছেন সেন্টু হাজং। এরই মধ্যে তিনি বগি, হালই, গোলাপি, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল ও খাসিয়াবিন্নিসহ বিভিন্ন দেশি জাতের ধান সংগ্রহ করেছেন। বর্তমানে ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নিসহ বিভিন্ন জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন তিনি। এসব ধান চাষে তিনি রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবর ও নিজের তৈরি কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেন।

 

 

 

 

চাটকিয়া গ্রামের কৃষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, দুই একর জমিতে সেন্টু পাইজাম ধান লাগিয়েছি। আর ২০-২৫ দিন পরেই এই ধান কাটতে পারব। ফলন খুব ভালো হয়েছে এবং এই ধানের বাজারমূল্যও আমরা ভালো পাচ্ছি।

 

 

 

 

উদ্ভাবক সেন্টু কুমার হাজং বলেন, দেশি ধানের অনেক জাতই এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। অথচ এসব ধানের আলাদা স্বাদ রয়েছে এবং পোকার আক্রমণও তুলনামূলক কম হয়। তাই দেশি ধানের জাতগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখনো কোনো সরকারি স্বীকৃতি পাইনি। আমার কোনো গবেষণাগার বা ল্যাব নেই এবং উদ্ভাবিত বীজধানের প্রত্যয়নপত্রও পাইনি। যে কারণে প্যাকেটজাত করে বীজধান বাজারে বিক্রি করতে পারছি না। ভাঙা ঘরে থেকেই আমি আমার এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

 

 

 

 

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ধানের জাত উদ্ভাবনে সেন্টু হাজং যে পদ্ধতি অবলম্বন করছেন, তা পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক। কাজেই তার এ কাজের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া জরুরি।

 

 

 

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক বলেন, জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেতে যা করা প্রয়োজন, আমরা সেন্টু হাজংয়ের জন্য তা করার চেষ্টা করব।

 

 

 

 

জেলা প্রশাসক (ডিসি) মিস ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, নিজে গিয়ে তার উদ্ভাবনী মাঠ ঘুরে দেখেছি। তার কাজের স্বীকৃতির পাশাপাশি সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হবে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে মুখ্য সচিব বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

জনতার কন্ঠ/এস এ

ট্যাগ :

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নারী ক্রিকেটারকে যৌন হয়রানির প্রমাণ পেয়েছে বিসিবি

দেশি ধানের ২৫ নতুন জাত উদ্ভাবন

প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি, পেয়েছেন মানুষের ভালোবাসা

আপডেট টাইম : ১২:১১:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

২০০৫ সাল থেকে বিলুপ্তপ্রায় আমন ধানের ২৫টি জাত উদ্ভাবন করেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সেন্টু কুমার হাজং। বাজারে তার উদ্ভাবিত জাতের ধানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ২১ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখনো এই উদ্ভাবনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি সেন্টু। তবে পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকদের ভালোবাসা। কিন্তু আশার কথা হলো, জনকল্যাণমুখী ও সমাজ উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের তালিকায় সেন্টু হাজংয়ের এই অসামান্য কীর্তি তুলে ধরতে কাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।

 

 

 

 

 

উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের সেন্টু কুমার হাজংয়ের বাড়ি। কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা সেন্টু হাজং এসএসসি পাস করার পর আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। শিক্ষাজীবন থেমে গেলেও নতুন কিছু করার স্পৃহা থামেনি তার। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) অধীনে ব্রিডিং বিষয়ে মাত্র ১০ দিনের একটি প্রশিক্ষণ নেন। এরপর শুরু করেন ধানের জাত উদ্ভাবনের কাজ।

 

 

 

 

সরেজমিন দেখা যায়, ধান আবিষ্কারের জন্য সেন্টুর কোনো আধুনিক গবেষণাগার নেই। বাড়ির দুটি ঘরের একটিতে তিনি বসবাস করেন এবং অন্যটি গোয়ালঘরে চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষণা। ঘরের ভেতরে কয়েকটি মটকায় ধান সংরক্ষণ করে তা দিয়েই চলছে উদ্ভাবনী কার্যক্রম। নিজের ১২ কাঠা আবাদি জমিকে গবেষণাগার বানিয়ে ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন করে চলেছেন তিনি।

 

সেন্টু হাজং জানান, ধানের জাত উদ্ভাবনে তিনি ব্যবহার করেন ব্রিডিং বা সংকরায়ণ পদ্ধতি। একটি নতুন জাত তৈরি করে তা যাচাই করতে সময় লাগে সাত থেকে আট বছর। বর্তমানে ওই ১২ কাঠা জমিতে তার ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট রয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা জাতের ধান নিয়ে তিনি পরীক্ষা চালান। একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়েন না; নতুন উদ্যমে শুরু করেন পরবর্তী গবেষণায়। এভাবেই নতুন জাতের ধান উদ্ভাবনে সফলতা অর্জন করেন তিনি।

 

সেন্টু হাজংয়ের প্রথম সফল উদ্ভাবন ‘সেন্টু শাইল’ ধান। দীর্ঘ সাত বছরের চেষ্টার পর তিনি এই জাতটি উদ্ভাবন করেন। এরপর আবিষ্কার করেন ‘সেন্টু পাইজাম’ ধান, যা এলাকার কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলতি আমন মৌসুমে শত শত কৃষক সেন্টু পাইজাম ও সেন্টু শাইল ধান আবাদ করেছেন। আর কিছুদিন পরই শুরু হবে এসব ধান কাটা। সেন্টু-১ থেকে সেন্টু-২৫ পর্যন্ত তার উদ্ভাবিত সব ধানই তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে নামকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সেন্টু শাইল, পাঁচ ধরনের সেন্টু পাইজাম, তিন ধরনের চিনিশাইল ও তুলশিমালা অন্যতম।

 

 

 

শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনই নয়, হারিয়ে যাওয়া দেশি ধানের জাত সংরক্ষণেও কাজ করছেন সেন্টু হাজং। এরই মধ্যে তিনি বগি, হালই, গোলাপি, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল ও খাসিয়াবিন্নিসহ বিভিন্ন দেশি জাতের ধান সংগ্রহ করেছেন। বর্তমানে ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নিসহ বিভিন্ন জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন তিনি। এসব ধান চাষে তিনি রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবর ও নিজের তৈরি কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেন।

 

 

 

 

চাটকিয়া গ্রামের কৃষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, দুই একর জমিতে সেন্টু পাইজাম ধান লাগিয়েছি। আর ২০-২৫ দিন পরেই এই ধান কাটতে পারব। ফলন খুব ভালো হয়েছে এবং এই ধানের বাজারমূল্যও আমরা ভালো পাচ্ছি।

 

 

 

 

উদ্ভাবক সেন্টু কুমার হাজং বলেন, দেশি ধানের অনেক জাতই এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। অথচ এসব ধানের আলাদা স্বাদ রয়েছে এবং পোকার আক্রমণও তুলনামূলক কম হয়। তাই দেশি ধানের জাতগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখনো কোনো সরকারি স্বীকৃতি পাইনি। আমার কোনো গবেষণাগার বা ল্যাব নেই এবং উদ্ভাবিত বীজধানের প্রত্যয়নপত্রও পাইনি। যে কারণে প্যাকেটজাত করে বীজধান বাজারে বিক্রি করতে পারছি না। ভাঙা ঘরে থেকেই আমি আমার এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

 

 

 

 

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ধানের জাত উদ্ভাবনে সেন্টু হাজং যে পদ্ধতি অবলম্বন করছেন, তা পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক। কাজেই তার এ কাজের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া জরুরি।

 

 

 

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক বলেন, জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেতে যা করা প্রয়োজন, আমরা সেন্টু হাজংয়ের জন্য তা করার চেষ্টা করব।

 

 

 

 

জেলা প্রশাসক (ডিসি) মিস ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, নিজে গিয়ে তার উদ্ভাবনী মাঠ ঘুরে দেখেছি। তার কাজের স্বীকৃতির পাশাপাশি সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হবে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে মুখ্য সচিব বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

জনতার কন্ঠ/এস এ