গাজীপুরের টঙ্গীতে হাজির মাজার বস্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেছেন বস্তিতে বসবাসকারী লোকজন। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বস্তিবাসীরা টঙ্গী বাজার এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল টঙ্গী বাজার থেকে বের হয়ে স্টেশন রোড প্রদক্ষিণ করে বিআরটি ফ্লাইওভার ব্রিজের ওপর ওঠে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের একটি অংশে অবস্থান নিয়ে আংশিক অবরোধ সৃষ্টি করেন। এ সময় ‘ভাত দে, কাপড় দে, বাসস্থান দে, পুনর্বাসন দে’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে তারা।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে হাজির মাজার বস্তি উচ্ছেদ করায় শত শত পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তাদের ভাষ্য, উচ্ছেদে তাদের আপত্তি নেই; তবে উচ্ছেদের আগে তাদের থাকার ব্যবস্থা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে হাজির মাজার বস্তিতে বসবাস করে আসা এসব মানুষের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের। তাদের মধ্যে দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক, গার্মেন্টস ও বিভিন্ন শিল্পকারখানার শ্রমিক রয়েছেন। বস্তিবাসীদের অভিযোগ, হঠাৎ বসতঘর ভেঙে দেওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা কোথায় যাবেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
বিক্ষোভকারীরা বলেন, আমরা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে নই। আগে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হোক, পুনর্বাসন দেওয়া হোক। এরপর বস্তি ছেড়ে দিতে বলা হলে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।
বস্তিবাসীদের একটি অংশের অভিযোগ, আবুল খায়ের গ্রুপের স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ তাদের বসতি উচ্ছেদ করেছে। কয়েকজনের দাবি, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে এবং আবুল খায়ের গ্রুপের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুনর্বাসন ছাড়াই তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বিক্ষোভকারীরা তাৎক্ষণিক কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে হাজির মাজার বস্তিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কেনাবেচাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাদক উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, বস্তিটিকে মাদক ব্যবসার অন্যতম স্পট হিসেবে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও রাজউকের উদ্যোগে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
তবে বস্তিবাসীদের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি মাদক ব্যবসা বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে আইনের আওতায় নেওয়া হোক। কিন্তু তার দায় পুরো বস্তির নিরীহ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অসহায় পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করার দাবি জানান তারা।
বিক্ষোভ চলাকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিআরটি ফ্লাইওভারের ওপর আংশিক অবরোধ সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এতে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমরা বস্তিবাসীদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরানোর চেষ্টা করছি।’
বিক্ষোভকারীরা জানান, তারা কোনো সংঘাত বা বিশৃঙ্খলা চান না। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চান। তাদের দাবি, প্রথমে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক। এরপর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তারা বাধা দেবেন না।
বস্তিবাসীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে তারা এলাকায় বসবাস করলেও স্থায়ী আবাসনের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। দিন এনে দিন খাওয়া এসব মানুষ ঘর হারিয়ে এখন কোথায় যাবেন, সেই উত্তর তাদের জানা নেই। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেন, বস্তিতে মাদক ব্যবসা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থাকলে প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে মানবিক দিক বিবেচনা করে নিরীহ বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাও জরুরি।
বিক্ষোভকারীরা বলেন, ‘আমরা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি না। আমরা শুধু আমাদের থাকার জায়গার নিশ্চয়তা চাই। পুনর্বাসন দিয়ে উচ্ছেদ করা হলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
বস্তিবাসীরা জানিয়েছেন, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

ন্যাশনাল ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 




















