সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?

(দ্বিতীয় পর্ব: হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও নিজেদের খবর কেউ লেখে না)

 

সত্য উদঘাটনে জীবন বাজি রেখে কাজ করলেও নিজেদের জীবনের অভ্যন্তরীণ সত্যটা প্রকাশ্যে আনতে পারে না মফস্বল সাংবাদিকরা। অপ্রিয় এই সত্যগুলো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। ভেতরে ভেতরে গুমড়ে গুমড়ে কাঁদে। তারপরও বুকের ভেতরে পাথরচাপা দিয়ে রাখতে হয়।

 

 

বাংলাদেশের অনেক মানুষই এমনকি জাতীয় গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিরাও জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা অনেকটা তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন। অনেকেই রয়েছেন, জেলার সাংবাদিকদের শুধু সংবাদাতা হিসেবেই মনে করেন। কিন্তু ভেবে দেখেন, যেখানে রাজধানীতে কর্মরত সাংবাদিকদের বিট ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বিট, বিরোধী দলীয় নেতা বিট, সরকারি দল বিট, বিরোধী দল বিট, সচিবালয় বিট, আদালত বিট, ক্রীড়া বিট, বিনোদন বিট, রাজনৈতিক দলের পৃথক বিট ইত্যাদি। জানেন কি? একটি জাতীয় গণমাধ্যমের জেলায় কর্মরত প্রতিনিধিকে সবগুলো বিটে একাই কাজ করতে হয়?

 

 

ধরুণ একটি জেলায় একই দিনে মারাত্বক সড়ক দূর্ঘটনা, একই সময়ে একটি হত্যাকান্ড, আদালতে একটি আলোচিত মামলার রায় ঘোষণাও হলো-আবার ওইদিনই সরকারের একজন মন্ত্রীর কর্মসূচিও রয়েছে। জেলার সাংবাদিককে সব সংবাদ একাই কাভার করতে হবে। পাশাপাশি প্রিন্ট পত্রিকার প্রতিনিধি হলে সংবাদের পাশাপাশি সরকারি বিজ্ঞাপণের জন্য তাঁকেই দৌঁড়াতে হয়।

 

 

দশ বছর আগের সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় একটি বিয়ের মাইক্রোবাসের ১৬ জন নিহত হয়। ওই রোমহর্ষক ঘটনায় জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের চোখে দু-তিন রাত কোন ঘুম ছিল না। দূর্ঘটনার আদ্যপান্ত নিয়ে সংবাদের পাশাপাশি মানবিক স্টোরী তৈরি করছিলেন সাংবাদিকরা। নিজের মানবিক ভাবনার পাশাপাশি অফিসগুলোর প্রতিযোগীতামূলক এ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে হচ্ছিল। অথচ এই ঘটনা যদি রাজধানীতে হতো, তাহলে একটি মিডিয়ার একাধিক রিপোর্টার, ক্যামেরা পার্সন কাজ করতেন। জেলার সাংবাদিকদের কাজের ব্যাপারে এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যাবে। আমি এখনও রাত তিনটার সময় ঘটনার তথ্য পেলে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠি, তথ্য সংগ্রহ করে অফিসে নিউজ পাঠিয়ে দেই। গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে আবার ভোরবেলায় কোন ঘটনা-দূর্ঘটনা ঘটলে লাফিয়ে দৌঁড়াতে হয়।

 

পড়ুন: মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?

কিন্তু সেই আমাদের কাজের মূল্যায়ন কতটা? একটি জাতীয় গণমাধ্যমের জেলা প্রতিনিধির আর্থিক নিরাপত্তা কতটুকো? সে বিষয়ে বাইরের কারও জানা নেই। থাকবে কি করে এসব বিষয় নিয়ে চাকরি হারানোর ভয়ে খোদ আমরা নিজেরাই তো সোচ্চার নই। মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারি না, অফিস আমাদের এই পারিশ্রমিক দেয়।

 

 

বর্তমান বাংলাদেশে ছোট একটি পরিবারের ভরণপোষন করতে মাসে অন্তত ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন হয়। তার উপর জেলা শহরে থাকতে গেলে বাসা ভাড়া, সন্তানাদির পড়াশোনা, চিকিৎসা ব্যয় তো আছেই। সব মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবনধারণ করতে মাসে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার প্রয়োজন।

 

 

কিন্তু একজন জেলা পর্যায়ের কর্মরত শীর্ষ গণমাধ্যমের অধিকাংশ সাংবাদিক চাহিদার এক চতুর্থাংশও পায় না। আর দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেনীর গণমাধ্যমগুলো তো প্রতিনিধিকে কোন প্রকার সম্মানীই দেয় না। বিশ্বের কোন রাষ্ট্রে মফস্বল সাংবাদিকরা এতটা উপেক্ষিত কিনা আমার জানা নেই।

 

 

প্রিয় পাঠক আপনাদের সঙ্গে আমার জীবনের একটি অভিজ্ঞতার শেয়ার করছি……….
২০১৭ সালের মার্চ মাসে জার্মানীর জনপ্রিয় একটি গণমাধ্যমের বাংলা বিভাগ থেকে তিনদিনের মধ্যে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি স্টোরী চাইলেন। বলা হলো নিউজের জন্য যে কিছুটা কনভেন্স দেবেন কর্তৃপক্ষ। খুব বেশি পরিশ্রম করতে হলো না, সিরাজগঞ্জে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আগেও একাধিকবার কাজ করেছি। তাদের বেশিরভাগ একই এলাকায় থাকে। একবেলার মধ্যেই তাদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে রিপোর্টটি যথারীতি দাঁড় করিয়ে অফিসে পাঠিয়ে দিলাম। কিছুদিন পরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ নিয়ে আরও একটি ফটোস্টোরী চেয়ে নিলেন তারা। এক মাসের মধ্যে প্রথম স্টোরীর বিল বাবদ ১৩৫ ও দ্বিতীয় স্টোরী বাবদ ৭৫ ডলার আমার একাউন্টে পাঠিয়ে দিলেন।

 

 

আমি অবাক হলাম, মাত্র দুটি স্টোরী পাঠিয়ে বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি টাকা পেলাম। একজন অতিথি রিপোর্টারকে পারিশ্রমিক হিসেবে যদি এত টাকা দেয়, তাহলে নিয়মিত রিপোর্টাররা কত বেতন পায়! প্রশ্ন আমার সেখানেই।

 

 

অথচ বাংলাদেশের স্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা কত বেতন/সম্মানী পান-সেটা না বলাই ভালো। (চলবে….)

 

 

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, জনতার কণ্ঠ.কম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, প্রতিদিনের দৃশ্যপট, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি কালবেলা ও বাংলানিউজ

One thought on “মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অদম্য পলি রানী: পা দিয়ে লিখেই দিচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা

মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?

আপডেট টাইম : ০১:৫৯:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

(দ্বিতীয় পর্ব: হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও নিজেদের খবর কেউ লেখে না)

 

সত্য উদঘাটনে জীবন বাজি রেখে কাজ করলেও নিজেদের জীবনের অভ্যন্তরীণ সত্যটা প্রকাশ্যে আনতে পারে না মফস্বল সাংবাদিকরা। অপ্রিয় এই সত্যগুলো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। ভেতরে ভেতরে গুমড়ে গুমড়ে কাঁদে। তারপরও বুকের ভেতরে পাথরচাপা দিয়ে রাখতে হয়।

 

 

বাংলাদেশের অনেক মানুষই এমনকি জাতীয় গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিরাও জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা অনেকটা তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন। অনেকেই রয়েছেন, জেলার সাংবাদিকদের শুধু সংবাদাতা হিসেবেই মনে করেন। কিন্তু ভেবে দেখেন, যেখানে রাজধানীতে কর্মরত সাংবাদিকদের বিট ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বিট, বিরোধী দলীয় নেতা বিট, সরকারি দল বিট, বিরোধী দল বিট, সচিবালয় বিট, আদালত বিট, ক্রীড়া বিট, বিনোদন বিট, রাজনৈতিক দলের পৃথক বিট ইত্যাদি। জানেন কি? একটি জাতীয় গণমাধ্যমের জেলায় কর্মরত প্রতিনিধিকে সবগুলো বিটে একাই কাজ করতে হয়?

 

 

ধরুণ একটি জেলায় একই দিনে মারাত্বক সড়ক দূর্ঘটনা, একই সময়ে একটি হত্যাকান্ড, আদালতে একটি আলোচিত মামলার রায় ঘোষণাও হলো-আবার ওইদিনই সরকারের একজন মন্ত্রীর কর্মসূচিও রয়েছে। জেলার সাংবাদিককে সব সংবাদ একাই কাভার করতে হবে। পাশাপাশি প্রিন্ট পত্রিকার প্রতিনিধি হলে সংবাদের পাশাপাশি সরকারি বিজ্ঞাপণের জন্য তাঁকেই দৌঁড়াতে হয়।

 

 

দশ বছর আগের সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় একটি বিয়ের মাইক্রোবাসের ১৬ জন নিহত হয়। ওই রোমহর্ষক ঘটনায় জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের চোখে দু-তিন রাত কোন ঘুম ছিল না। দূর্ঘটনার আদ্যপান্ত নিয়ে সংবাদের পাশাপাশি মানবিক স্টোরী তৈরি করছিলেন সাংবাদিকরা। নিজের মানবিক ভাবনার পাশাপাশি অফিসগুলোর প্রতিযোগীতামূলক এ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে হচ্ছিল। অথচ এই ঘটনা যদি রাজধানীতে হতো, তাহলে একটি মিডিয়ার একাধিক রিপোর্টার, ক্যামেরা পার্সন কাজ করতেন। জেলার সাংবাদিকদের কাজের ব্যাপারে এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যাবে। আমি এখনও রাত তিনটার সময় ঘটনার তথ্য পেলে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠি, তথ্য সংগ্রহ করে অফিসে নিউজ পাঠিয়ে দেই। গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে আবার ভোরবেলায় কোন ঘটনা-দূর্ঘটনা ঘটলে লাফিয়ে দৌঁড়াতে হয়।

 

পড়ুন: মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?

কিন্তু সেই আমাদের কাজের মূল্যায়ন কতটা? একটি জাতীয় গণমাধ্যমের জেলা প্রতিনিধির আর্থিক নিরাপত্তা কতটুকো? সে বিষয়ে বাইরের কারও জানা নেই। থাকবে কি করে এসব বিষয় নিয়ে চাকরি হারানোর ভয়ে খোদ আমরা নিজেরাই তো সোচ্চার নই। মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারি না, অফিস আমাদের এই পারিশ্রমিক দেয়।

 

 

বর্তমান বাংলাদেশে ছোট একটি পরিবারের ভরণপোষন করতে মাসে অন্তত ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন হয়। তার উপর জেলা শহরে থাকতে গেলে বাসা ভাড়া, সন্তানাদির পড়াশোনা, চিকিৎসা ব্যয় তো আছেই। সব মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবনধারণ করতে মাসে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার প্রয়োজন।

 

 

কিন্তু একজন জেলা পর্যায়ের কর্মরত শীর্ষ গণমাধ্যমের অধিকাংশ সাংবাদিক চাহিদার এক চতুর্থাংশও পায় না। আর দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেনীর গণমাধ্যমগুলো তো প্রতিনিধিকে কোন প্রকার সম্মানীই দেয় না। বিশ্বের কোন রাষ্ট্রে মফস্বল সাংবাদিকরা এতটা উপেক্ষিত কিনা আমার জানা নেই।

 

 

প্রিয় পাঠক আপনাদের সঙ্গে আমার জীবনের একটি অভিজ্ঞতার শেয়ার করছি……….
২০১৭ সালের মার্চ মাসে জার্মানীর জনপ্রিয় একটি গণমাধ্যমের বাংলা বিভাগ থেকে তিনদিনের মধ্যে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি স্টোরী চাইলেন। বলা হলো নিউজের জন্য যে কিছুটা কনভেন্স দেবেন কর্তৃপক্ষ। খুব বেশি পরিশ্রম করতে হলো না, সিরাজগঞ্জে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আগেও একাধিকবার কাজ করেছি। তাদের বেশিরভাগ একই এলাকায় থাকে। একবেলার মধ্যেই তাদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে রিপোর্টটি যথারীতি দাঁড় করিয়ে অফিসে পাঠিয়ে দিলাম। কিছুদিন পরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ নিয়ে আরও একটি ফটোস্টোরী চেয়ে নিলেন তারা। এক মাসের মধ্যে প্রথম স্টোরীর বিল বাবদ ১৩৫ ও দ্বিতীয় স্টোরী বাবদ ৭৫ ডলার আমার একাউন্টে পাঠিয়ে দিলেন।

 

 

আমি অবাক হলাম, মাত্র দুটি স্টোরী পাঠিয়ে বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি টাকা পেলাম। একজন অতিথি রিপোর্টারকে পারিশ্রমিক হিসেবে যদি এত টাকা দেয়, তাহলে নিয়মিত রিপোর্টাররা কত বেতন পায়! প্রশ্ন আমার সেখানেই।

 

 

অথচ বাংলাদেশের স্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা কত বেতন/সম্মানী পান-সেটা না বলাই ভালো। (চলবে….)

 

 

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, জনতার কণ্ঠ.কম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, প্রতিদিনের দৃশ্যপট, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি কালবেলা ও বাংলানিউজ