সিরাজগঞ্জ , শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

মোহাম্মদপুর-আদাবরে অভিযান, অপরাধীদের ‘হিরো’ বানানোর শঙ্কা

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এসব অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের খবরও নিয়মিত জানানো হচ্ছে।

গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তেজগাঁও বিভাগের বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬ হাজার ৮৮ জন।

এরই মধ্যে শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর শ্যামলীতে অটোরিকশায় থাকা অবস্থায় স্ত্রীসহ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছেন একটি জাতীয় দৈনিকের অপরাধ বিভাগের প্রধান।

 

সকাল সোয়া ৭টার দিকে শিশুমেলার বিপরীতে ফুটওভার ব্রিজের কাছে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তাঁর স্ত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় তার স্ত্রী আঙুলে আঘাত পান।

এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অন্যদিকে পুলিশের দাবি, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও আগের তুলনায় এসব এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে আগের মামলার পাশাপাশি নতুন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে।

তবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিচিতি তুলে ধরার ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে ‘ইতালিয়ান জুয়েল’সহ বিভিন্ন চটকদার নামে পরিচিত করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ও গণমাধ্যমের খবরে এসব নাম গুরুত্ব পেলে অপরাধীরা নিজেদের ‘হিরো’ ভাবতে পারে। এতে অন্য কিশোর ও তরুণদের মধ্যেও অপরাধের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, গত তিন মাসে ৬ হাজার ৮৮ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর এলাকা থেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন ২ হাজার ১৯৬ জন।

তিনি বলেন, তেজগাঁও বিভাগের আওতাধীন থানাগুলোতে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অপরাধীদের ধরতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এসব অভিযান চলবে।

তেজগাঁও বিভাগের আওতায় ছয়টি থানা রয়েছে। এগুলো হলো-তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা।

অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিচিতি প্রচারের ধরন নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তাও সতর্কতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। তাদের মতে, কিশোর বয়সে অপরাধে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার প্রবণতা থাকতে পারে। তাঁদের নামের সঙ্গে গ্যাংপ্রধানের মতো পরিচিতি জুড়ে দিয়ে প্রচার করা হলে সেই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

যেমন, কোনো গ্যাংপ্রধানকে গ্রেপ্তারের খবর চটকদার নামে প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট অপরাধীর মধ্যে একধরনের নায়কোচিত ভাব তৈরি হতে পারে। আবার অন্য কিশোর ও তরুণদের কেউ কেউ সেই পরিচিতি দেখে অপরাধীদের মতো পরিচিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

বিশেষ করে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে আবেগের আধিক্য ও নিজের মতো করে চলার প্রবণতা থাকতে পারে। এ বয়সে কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার কথিত উপাধি বা অপরাধজগতের পরিচিতি বড় করে প্রচার করা হলে অপরাধের বিস্তারিত বিবরণের চেয়ে নামটিই বেশি আলোচনায় চলে আসতে পারে। এতে অপরাধে জড়িত ব্যক্তির পরিচিতি বাড়ার পাশাপাশি একই বয়সী অন্য তরুণদের মধ্যেও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এ কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক প্রচার-প্রচারণার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংবাদ সম্মেলন এবং গণমাধ্যমে তাঁদের কথিত উপাধি ও দলীয় পরিচিতি প্রচারের ফলে অন্য কিশোরদের মধ্যে অপরাধীদের মতো ‘হিরো’ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে অপরাধীদের পরিচিতি তাঁদের প্রভাব ও চাঁদাবাজির দাপট বাড়াতেও কাজে লাগতে পারে।

এমন মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক।

তিনি বলেন, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণদের নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমান সময়ে বেশ কঠিন। এ বয়সে অনেকের মধ্যে আবেগের আধিক্য থাকে। তারা নিজের ইচ্ছায় চলতে চান এবং অন্যের কথা সহজে বুঝতে চান না।

তিনি বলেন, এ বয়সে যারা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তাদের গ্রেপ্তারের পর পুলিশ যখন কথিত উপাধিসহ পরিচিতি প্রকাশ করে, তখন গণমাধ্যমেও সেভাবে খবর প্রকাশিত হয়। এতে অন্য কিশোর ও তরুণদের কেউ কেউ তাঁদের ‘হিরো’ মনে করতে পারে। সেই পরিচিতি ও ‘হিরো’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে তারাও অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ালে তাদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব তৈরি হয়। যখন তারা বুঝতে পারেন, কয়েক দিন কারাগারে থাকা ছাড়া তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তখন অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমে প্রচার পাওয়া পরিচিতিকে অপরাধীরা জামিনে মুক্তির পর নিজেদের প্রভাব ও চাঁদাবাজির দাপট বাড়াতে ব্যবহার করতে পারেন। তাই অপরাধীদের ছবি, কথিত উপাধি ও অপরাধজগতের পরিচিতি প্রচারের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমকে সতর্ক হতে হবে।

প্রয়োজন অনুযায়ী অপরাধীর পরিচয় প্রকাশ করা যেতে পারে উল্লেখ করে এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, সবার ছবি ও অপরাধজগতের উপাধি প্রচার করা জরুরি নয়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে প্রচারের মাধ্যমে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য যেন আরও বেড়ে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা এবং গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিচিতি প্রচারের ধরন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান ও আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি অপরাধীদের পরিচিতি প্রচারে সতর্কতা এবং তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মোহাম্মদপুর-আদাবরে অভিযান, অপরাধীদের ‘হিরো’ বানানোর শঙ্কা

আপডেট টাইম : ০৯:৩২:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এসব অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের খবরও নিয়মিত জানানো হচ্ছে।

গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তেজগাঁও বিভাগের বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬ হাজার ৮৮ জন।

এরই মধ্যে শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর শ্যামলীতে অটোরিকশায় থাকা অবস্থায় স্ত্রীসহ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছেন একটি জাতীয় দৈনিকের অপরাধ বিভাগের প্রধান।

 

সকাল সোয়া ৭টার দিকে শিশুমেলার বিপরীতে ফুটওভার ব্রিজের কাছে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তাঁর স্ত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় তার স্ত্রী আঙুলে আঘাত পান।

এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অন্যদিকে পুলিশের দাবি, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও আগের তুলনায় এসব এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে আগের মামলার পাশাপাশি নতুন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে।

তবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিচিতি তুলে ধরার ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে ‘ইতালিয়ান জুয়েল’সহ বিভিন্ন চটকদার নামে পরিচিত করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ও গণমাধ্যমের খবরে এসব নাম গুরুত্ব পেলে অপরাধীরা নিজেদের ‘হিরো’ ভাবতে পারে। এতে অন্য কিশোর ও তরুণদের মধ্যেও অপরাধের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, গত তিন মাসে ৬ হাজার ৮৮ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর এলাকা থেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন ২ হাজার ১৯৬ জন।

তিনি বলেন, তেজগাঁও বিভাগের আওতাধীন থানাগুলোতে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অপরাধীদের ধরতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এসব অভিযান চলবে।

তেজগাঁও বিভাগের আওতায় ছয়টি থানা রয়েছে। এগুলো হলো-তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা।

অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিচিতি প্রচারের ধরন নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তাও সতর্কতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। তাদের মতে, কিশোর বয়সে অপরাধে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার প্রবণতা থাকতে পারে। তাঁদের নামের সঙ্গে গ্যাংপ্রধানের মতো পরিচিতি জুড়ে দিয়ে প্রচার করা হলে সেই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

যেমন, কোনো গ্যাংপ্রধানকে গ্রেপ্তারের খবর চটকদার নামে প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট অপরাধীর মধ্যে একধরনের নায়কোচিত ভাব তৈরি হতে পারে। আবার অন্য কিশোর ও তরুণদের কেউ কেউ সেই পরিচিতি দেখে অপরাধীদের মতো পরিচিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

বিশেষ করে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে আবেগের আধিক্য ও নিজের মতো করে চলার প্রবণতা থাকতে পারে। এ বয়সে কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার কথিত উপাধি বা অপরাধজগতের পরিচিতি বড় করে প্রচার করা হলে অপরাধের বিস্তারিত বিবরণের চেয়ে নামটিই বেশি আলোচনায় চলে আসতে পারে। এতে অপরাধে জড়িত ব্যক্তির পরিচিতি বাড়ার পাশাপাশি একই বয়সী অন্য তরুণদের মধ্যেও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এ কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক প্রচার-প্রচারণার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংবাদ সম্মেলন এবং গণমাধ্যমে তাঁদের কথিত উপাধি ও দলীয় পরিচিতি প্রচারের ফলে অন্য কিশোরদের মধ্যে অপরাধীদের মতো ‘হিরো’ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে অপরাধীদের পরিচিতি তাঁদের প্রভাব ও চাঁদাবাজির দাপট বাড়াতেও কাজে লাগতে পারে।

এমন মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক।

তিনি বলেন, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণদের নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমান সময়ে বেশ কঠিন। এ বয়সে অনেকের মধ্যে আবেগের আধিক্য থাকে। তারা নিজের ইচ্ছায় চলতে চান এবং অন্যের কথা সহজে বুঝতে চান না।

তিনি বলেন, এ বয়সে যারা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তাদের গ্রেপ্তারের পর পুলিশ যখন কথিত উপাধিসহ পরিচিতি প্রকাশ করে, তখন গণমাধ্যমেও সেভাবে খবর প্রকাশিত হয়। এতে অন্য কিশোর ও তরুণদের কেউ কেউ তাঁদের ‘হিরো’ মনে করতে পারে। সেই পরিচিতি ও ‘হিরো’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে তারাও অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ালে তাদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব তৈরি হয়। যখন তারা বুঝতে পারেন, কয়েক দিন কারাগারে থাকা ছাড়া তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তখন অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমে প্রচার পাওয়া পরিচিতিকে অপরাধীরা জামিনে মুক্তির পর নিজেদের প্রভাব ও চাঁদাবাজির দাপট বাড়াতে ব্যবহার করতে পারেন। তাই অপরাধীদের ছবি, কথিত উপাধি ও অপরাধজগতের পরিচিতি প্রচারের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমকে সতর্ক হতে হবে।

প্রয়োজন অনুযায়ী অপরাধীর পরিচয় প্রকাশ করা যেতে পারে উল্লেখ করে এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, সবার ছবি ও অপরাধজগতের উপাধি প্রচার করা জরুরি নয়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে প্রচারের মাধ্যমে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য যেন আরও বেড়ে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা এবং গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিচিতি প্রচারের ধরন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান ও আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি অপরাধীদের পরিচিতি প্রচারে সতর্কতা এবং তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।