ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছাড়েন মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বাঁশকান্দি এলাকার তিন যুবক। স্বপ্ন ছিল ইতালি পৌঁছে পরিশ্রম করে উপার্জন করবে অনেক টাকা। আর্থিকভাবে সচ্ছল হবে পরিবার। অন্যান্যদের মতো আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালির উদ্দেশে লিবিয়াতে যায় এই তিন যুবক। প্রায় ১৪ মাস আগে লিবিয়া গেলেও ইতালি যাত্রার ‘গেম’ হয়নি তাদের।
অন্যদিকে পরিবারগুলো খুইয়েছেন ৪০ লাখ করে টাকা! শেষমেষ গেমের কথা বলে বিক্রি করে দেওয়া হয় মাফিয়াদের কাছে। সম্প্রতি ওই তিন যুবককে বেঁধে নির্যাতনের একটি ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে চাওয়া হয় আরও বিশ লাখ করে টাকা! নির্যাতনের ভিডিও দেখার পর দিশেহারা পরিবারগুলো। এদিকে গা ঢাকা দিয়েছে স্থানীয় দুই দালাল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বাঁশকান্দি ইউনিয়ন। বয়ে চলা শান্ত বিলপদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে নাওরা চর শেখপুর গ্রাম। গ্রামের ৬ যুবক স্থানীয় দালালের মাধ্যমে ইতালির উদ্দেশে লিবিয়া পৌঁছায়। প্রায় ১৪ মাস আগে লিবিয়া গেলেও ৬ যুবকের ৩ জন বেশ কয়েক মাস আগেই পৌঁছে যায় ইতালি। ভাগ্য বিড়ম্বনার ফাঁদে পড়ে যায় আলাউদ্দিন খানের ছেলে আলমাস খান (২৫), চুন্নু তপাদারের ছেলে সবুজ তপাদার (২৫) এবং নূর ইসলাম ফরাজীর ছেলে সজীব ফরাজী (৩৩)। ১৪ মাসে ‘গেম’ এর আশায় ৪০ লাখ টাকা খুইয়েছেন পরিবারগুলো। গেম না দিয়ে অবশেষে মাফিয়াদের হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে তিন যুবককে। সম্প্রতি তিনজনকে বেঁধে মারধর করার একটি ভিডিও পরিবারের কাছে আসে। দাবি করা হয় আরও টাকা!
সরেজমিনে ওই তিন যুবকের বাড়িতে গেলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানান, একই এলাকার নূর আলম ও সেলিম নামে দুই দালালের মাধ্যমে সমস্ত টাকা লেনদেন হয় ছেলেদের ইতালি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। গেমের অপেক্ষায় লিবিয়া আটকে থাকে তারা। গত এক মাস ধরে ছেলেদের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে পরিবারের ফোনে নির্যাতনের ভিডিও চিত্র পাঠানো হলে গ্রামে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। গা ঢাকা দেয় দালাল নূর আলম ও সেলিম।
এদিকে ভুক্তভোগী পরিবার মামলা দায়ের করলে দালালদ্বয়ের স্ত্রীদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মাফিয়াদের কাছ থেকে মুক্তি পেতে আরও ২০ লাখ করে টাকা চাচ্ছে বলেও জানান তারা। জমি বিক্রি করে, ঋণ করে টাকা এনে দালালদের হাতে দিতে দিতে এখন নিঃস্ব পরিবারগুলো। সন্তানদের দুঃশ্চিন্তায় এখন রাত কাটছে নির্ঘুম।
এলাকাবাসী জানান, ইতালি নেওয়ার কথা বলে নুর আলম টাকা নিছে। তার ছেলেও ওদের সঙ্গে লিবিয়া গেছে। সেখান থেকে ইতালিও পৌঁছেছে অনেক আগে। শুধু এই তিনজন আটকে আছে দালালচক্রের কাছে। দফায় দফায় টাকা নিছে। এখনও নানা ভাবে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে ভুক্তভোগীদের।
লিবিয়ায় বন্দি আলমাস খানের বাবা আলাউদ্দিন খান বলেন, মোট ১৭ লাখ টাকার চুক্তি হয় দালাল নুর আলমের সঙ্গে। ১০ লাখ টাকা লিবিয়া পৌঁছানোর পর এবং ৭ লাখ টাকা ইতালি পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা থাকে। গত বছর আমার ছেলেসহ মোট ৬ জন লিবিয়া যায়। ধারদেনা কইরা টাকা জোগার করে দালালকে দেই। লিবিয়া নেওয়ার পর গেমের কথা বইলা দফায় দফায় টাকা নেয়। ৪০ লাখ টাকা গেছে। জমি বিক্রি কইরা টাকা দিছি। এখন শুনি আমার ছেলেরে মাফিয়ার কাছে বিক্রি কইরা দিছে। গত সপ্তাহে মারধর করার ভিডিও পাঠাইছে!’
আলমাসের মা চায়না বেগম বলেন, ‘আমার পোলাডারে মারতে মারতে শ্যাষ কইরা ফালাইতেছে। আরও ২০ লাখ টাকা চায়। আমার তো সব শ্যাষ হইয়া গেছে।’
আরেক বন্দি সবুজ তপাদারের মা পারুল বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেসহ দিনজনরে মারধর করে ভিডিও পাঠাইছে। মুক্তিপণের জন্য ২০ লাখ টাকা চায়। ৪০ লাখ তো দিছি আগে। আমার বড় একটা গরুর খামার ছিল। সব গরু বিক্রি কইরা দিছি। সব শ্যাষ আমার। না জানি পোলাডা কেমন আছে এখন!’
লিবিয়ায় নির্যাতনের শিকার বন্দি সজীব ফরাজীর মা শেফালী বেগম বলেন, ‘১৪ মাস আগে লিবিয়া নিছে। গেম তো দেয়ই নাই। মাফিয়াদের কাছে বিক্রি কইরা দিছে। এখন আরও ২০ লাখ টাকা চায়। নির্যাতনের ভিডিও পাঠানোর পর দালাল নুর আলম আর সেলিম পলাইছে। গ্রামের লোকজন পুলিশকে জানাইছিল। আমি মামলাও করছি। এরপর লোক দিয়া হুমকি দেয় ওরা। আমরা আমাগো ছেলেদের ফেরত চাই। সর্বশান্ত হইয়া গেছি। এখন ছেলেরা সুস্থভাবে বাড়ি ফিরলেই আমাগো শান্তি!’
এদিকে অভিযুক্তরা পলাতক থাকায় কারো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। ২ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। এছাড়া অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’