দাম বাড়তে বাড়তে রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ সয়াবিন তেল এখন সাধারণ মানুষের সংসার খরচের বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চমূল্যের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটির দাম বেড়েই চলেছে। ছয় বছর আগে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা। এখন সেই তেল কিনতে গুনতে হচ্ছে ২০৪ টাকা। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে বোতলজাত তেলের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। শুধু বোতলজাত নয়, খোলা সয়াবিন তেলের দামও বেড়ে লিটারপ্রতি ২০০ টাকায় উঠেছে। ফলে চাপে রয়েছে স্বল্প আয়ের মানুষও। এর মধ্যেই নতুন করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো। এতে সংসারের বাড়তি ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়া ভোক্তাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, রাজধানীর খুচরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিনের এক লিটারের বোতল ২০৪ টাকা বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই সময় এই বোতল সর্বনিম্ন ১৮৯ টাকা বিক্রি হয়। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ১৫ টাকা বেড়েছে। ২০২৪ সালের একই সময় এক লিটারের বোতলের দাম ছিল ১৬৫ টাকা। আর ২০২১ সালে এর দাম ছিল ১৫০ টাকা। ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবরের বাজার দরে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে সেদিন বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ গড়ে ১০৫ টাকায় কিনতে হয়েছে এক লিটারের বোতল। অর্থাৎ ছয় বছরে দাম ৯৪ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। বাড়তি এ ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন অধিকাংশ ভোক্তা।
প্রতি মাসের বাজার খরচের মধ্যে রান্নার তেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপে থাকতে হয় বলে জানালেন রাজধানীর পল্লবী এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. এনামুল হক। তিনি বলেন, চার সদস্যের পরিবারে মাসে ছয় লিটারের মতো তেল প্রয়োজন হয়। অতীতে যে পাঁচ লিটারের বোতল ৫০০ টাকার কাছাকাছি দামে কেনা যেত, এখন তা কিনতে এক হাজার টাকার নোট খরচ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে খরচ বাড়লে আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। ভোগান্তির এখানেই শেষ নয়, মাঝে মাঝে বাজারে বোতলের সংকট দেখা দেয়, তখন বাড়তি দামে কিনতে হয়। কখনো কখনো বাড়তি দামেও পাওয়া যায় না। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে হয়।
রান্নার তেলের খরচ নিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষ আরও বেশি চাপে রয়েছেন বলে জানান দিনমজুর মো. ইদ্রিস মিয়া। কদমতলী এলাকার এ বাসিন্দা বলেন, ‘টাকা বাঁচাইতে বোতলের বদলে লুজ তেল কিনি। এখন লুজ তেলের দামও প্রায় বোতলের সমান। রান্নার তেল তো প্রতিদিনই লাগে। তাই এর দাম সামান্য বাড়লেও আমাগো কষ্ট অনেক বাইড়া যায়। শুনছি আরও দাম বাড়ব। এখনই কিনতে কষ্ট হয়, আরও বাড়লে ক্যামনে চলুম।’
এদিকে বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ১৪ টাকা বাড়ানোর জন্য চলতি মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে চিঠি পাঠিয়েছে ভোজ্যতেল উৎপাদন ও পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। চিঠিতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের এক লিটারের বোতলের দাম ২০৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১৮ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতল এক হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৭০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, প্রতি টন কাঁচামালের দাম ১ হাজার ৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩২৫ ডলারে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দর অনুযায়ী উৎপাদন ও অন্যান্য ব্যয় হিসাব করলে বর্তমান মূল্যে তাদের বিক্রিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই দাম বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।
সংগঠনটির নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম মোল্লা কালবেলাকে বলেন, প্রধান কারণ হচ্ছে, ছয় মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ছে। সেইসঙ্গে দেশে গ্যাসসহ জ্বালানি ও পরিবহনেও খরচ বেড়েছে। এজন্য মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, গত ২ সেপ্টেম্বর দেশের বাজারে সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে পাঁচ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এর আগে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৯৯ টাকা।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রান্নার তেলের মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও ভোক্তাদের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছেন। ব্যয়ের সঙ্গে আয় সেভাবে বাড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কীভাবে সহনশীল পর্যায়ে রাখা যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য মূল্য সমন্বয় প্রক্রিয়া ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তি। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারকেও তো ঠিক করতে হবে। সয়াবিনের বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি রয়েছে; হাতে গোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা যেভাবে চালায় সেভাবেই চলছে। দাম বাড়াতে যখন খুশি বাজারে সংকট তৈরি করছে। খোলা তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। একদিকে ভোক্তাকে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে, আবার দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে বোতলের খোঁজে। এটা নতুন নয়, বারবার হচ্ছে। যেমন রান্নার সিলিন্ডার গ্যাসেও দেখা যায় সংকট তৈরি করা হচ্ছে। নির্ধারিত দামের বেশি দামে বিক্রি হয়। তার পরও পাওয়া যায় না। সরকার ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সেইসঙ্গে সয়াবিন তেলের মূল্য সমন্বয় প্রক্রিয়া ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। আর তার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে।
সয়াবিনের বাজারে বারবার একই কায়দায় অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে বলে অভিযোগ খুচরা বিক্রেতাদেরও। এ বিষয়ে কথা হলে কদমতলী এলাকার ব্যবসায়ী মো. মিলন হোসেন ও মো. আবু তাহের খোকন জানান, যখনই দাম বাড়ানোর সময় আসে তার আগমুহূর্তে বাজারে বোতলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। বোতল পেতে তার সঙ্গে বাধ্যতামূলক অন্য পণ্য অর্ডার দিতে হয়। এসব যন্ত্রণার কারণে অনেক ব্যবসায়ী প্রায় সময় বোতল বিক্রি বন্ধ করে দেন। আবার ক্রেতা ধরে রাখতে দোকানে বোতল রাখতেই হয় তাদের। সব মিলিয়ে খুচরা বিক্রেতারা উভয় সংকটের মধ্যে আছেন বলে জানান তারা।
এ বিষয়ে নিউমার্কেট বনলতা বাজারের মো. সাথী এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়ী মো. আলী আলমগীর বলেন, এর আগে বহুবার দাম বাড়ানোর সময় বোতল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে সময় শুধু ক্রেতা নন, আমাদেরকেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আবার আমাদেরকে বেশি দামে বোতল কিনতে হচ্ছে, ফলে বোতল বিক্রি করে মুনাফাও থাকছে না। বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বাজারে এখনো সরবরাহ প্রায় ঠিকঠাক রয়েছে। বোতল পাচ্ছি আমরা। তবে, কোম্পানিগুলো যে দাম বাড়াতে যাচ্ছে, সেটা আমাদেরকেও জানানো হয়েছে।
জনতার কন্ঠ. এস এ

ন্যাশনাল ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 



















