(তৃতীয় পর্ব: বাড়ছে গণমাধ্যম: কমছে মফস্বল সাংবাদিকদের জীবনমান)
প্রসারিত তথ্য প্রযুক্তি শহর ছাড়িয়ে গ্রাম, দূর্গম চরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। সব শ্রেণীর মানুষই এখন ইন্টারনেট, ওয়াইফাই, হোয়াটসএপ, ফেসবুক, ইনস্ট্রোগ্রাম, ইমো ইত্যাদি প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে পরিচিত। দেশের মানুষ এখন ডিজিটালাইজসড হয়ে পড়েছে। আর সবার আগে প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে কিন্তু গণমাধ্যম। এখন আর কাগজের পাতায় সংবাদ লিখে পত্রিকা অফিসে ডাকযোগে পাঠাতে হয় না, করতে হয় না ফ্যাক্সও। আজকের সংবাদ দুদিন পরে পাঠকের কাছে পৌঁছে না। সকল সাংবাদিকের হাতে ল্যাপটপ, ট্যাব এবং মোবাইল। ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই মোবাইলে লিখে সেটা তাৎক্ষণিক অফিসে প্রেরণ করছেন সাংবাদিকরা। তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর গণমাধ্যমের কল্যাণে ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যেই সংবাদটি মানুষের কাছে চলে যাচ্ছে। মিডিয়ার কল্যাণে গ্রাম থেকে শহর কোন সংবাদ থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে না পাঠক ও দর্শক।
দেড় দশক ধরে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় একের পর এক মিডিয়ার অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান গণমাধ্যমের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধির সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে সংবাদকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে অন্তত ১০/১২ গুণ।
আজকের দিনে যে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, প্রশাসনিক কোন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকের ভীড়ে আয়োজকদের হিমশিম খেতে হয়। সংবাদ সম্মেলনের টেবিলে টিভি চ্যানেল, আইপি টিভি, ইউটিউব চ্যানেল এবং পত্রিকাগুলোর মাল্টিমিডিয়ার লোগোর স্তুপ জমা হয়। জনসভা মঞ্চের সামনে ক্যামেরা নিয়ে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকা ভিডিও জার্নালিস্টের ভীড়ে বক্তৃতা দেওয়া অতিথির মুখটা দেখতে না পেরে ক্ষেপে যায় উপস্থিত স্রোতারা।

প্রশ্ন হলো, জাতীয় গণমাধ্যমগুলো জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে তাদের হাতে কার্ড এবং লোগো ধরিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ একজন তরুণকে পুরোপুরি সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশ করানো হচ্ছে, কিন্তু মিডিয়া মালিকেরা তার পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা কতটুকো নিশ্চিত করছে?
আমার জানামতে প্রথম শ্রেণীর কোন কোন গণমাধ্যম জেলা প্রতিনিধিদের কিছু বেতনে নিয়োগ দিচ্ছে। আবার কোন কোন গণমাধ্যম বেতন নয়, মাসে কিছু টাকা সম্মানী হিসেবে ধরিয়ে দিচ্ছে। যার পরিমাণ উল্লেখ করার মতো নয়। আর দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির গণমাধ্যম বেতন/সম্মানী দেওয়া তো দূরের কথা উল্টো প্রতিনিধিদের কাছে নেওয়ার চেষ্টা করে। সামান্য বেতন, নামমাত্র সম্মানি অথবা বেতনহীন এসব মিডিয়াকর্মীদের জীবন কিভাবে চলছে? প্রশ্নটা অনেকেরই।
পড়ুন: (দ্বিতীয় পর্ব: হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও নিজেদের খবর কেউ লেখে না)
আর্থিক নিরাপত্তাহীন মফস্বল সাংবাদিকদের মানবেতর জীবনযাপনের গল্পটা কখনোই প্রকাশ্যে আসে না। পেটে ভাত না থাকলেও অফিসের এ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে ঠিকই যেতে হয়। দ্রব্যমূল্যের এই বাজারে নিভু নিভু প্রদীপের মতো অনেককে সংসার চালাতে হয়। গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য তাদের সরকারি-বেসরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়।
পড়ুন: মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?
কেউ কেউ সাংবাদিকতা পেশার পাশাপাশি অন্য ব্যবসার ওপরও নির্ভরশীল, অনেকেরই পারিবারিক সম্পদ রয়েছে কিংবা বাবা-ভাইয়ের বড় অংকের রোজগার রয়েছে। আর যাদের এসবের কোনটাই নেই, তাদেরকে নিউজের পাশাপাশি অফিসে অফিসে বিজ্ঞাপণের জন্য ছুটতে হচ্ছে। আর এত মিডিয়া! বিজ্ঞাপণ দিতেও সরকারি সংস্থাগুলো হিমশিম খাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী সাংবাদিকরা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বিজ্ঞাপণ বাগিয়ে নিচ্ছেন। এখানে মার খাচ্ছে দূর্বল অথচ প্রথিতযশা সাংবাদিক। ওই শ্রেণীর সাংবাদিকদের আয়ের পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে।
এদিকে গণমাধ্যম বাড়লেও মিডিয়াকর্মীদের জীবনমান ক্রমশই কমছে। নানা কারণে সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকদের গ্রহণযোগ্যতাও আশংকাজনক হারে কমে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের অংশ হিসেবে যে মর্যাদা সাংবাদিকদের ছিল-গত দেড় দশকে সেটা তলানিতে নেমে এসেছে। যার অনেকগুলো কারণও রয়েছে (চলবে)

রিপোর্টার: 




















One thought on “মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?”