সংসারের অভাব ঘোচাতে একমাত্র ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন বাবা-মা। স্বপ্ন ছিল, ছেলে উপার্জন করে সংসারের হাল ধরবেন, দুই মেয়েকে নিয়ে একটু ভালো থাকবেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। মালয়েশিয়া থেকে ২৪ বছর বয়সী মনিরুল ইসলাম ফিরেছেন নিথর দেহ হয়ে। কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও এখনো অজানা পরিবারের কাছে। একমাত্র ছেলের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছাতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রামের পরিবেশ।
মনিরুল ইসলাম রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের কুমারগাড়ী (চন্দ্রকোনা) গ্রামের ইয়াছিন আলীর ছেলে। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে ২০২৩ সালের মার্চে জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। এক ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে মনিরুলই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান। তার পাঠানো টাকায় কোনোমতে চলত পরিবারের নিত্যদিনের খরচ।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ অক্টোবর মনিরুলের মৃত্যুর খবর পান স্বজনেরা। তবে কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার। স্বজনদের ভাষ্য, মনিরুলের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা ফোন করে জানান, রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি। সকালে আর ঘুম থেকে ওঠেননি। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা বাবা ইয়াছিন আলী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছেলেকে পাঠিয়েছিলাম টাকা উপার্জন করে সংসারটা ভালোভাবে চালাবে এই আশায়। আমার এক ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলে যে টাকা পাঠাত, তা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলত। এখন আমার কী হবে?’
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে শোকে মুহ্যমান তার মা। কথা বলতে গেলেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। বিলাপ করে বলেন, ‘আমার ছেলে আর নেই। এখন আমাকে মা বলে ডাকবে কে? সংসার চালাবে কে?’
মনিরুলের চাচা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘বড় ভাইয়ের ছেলেকে অনেক আশা নিয়ে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে ফিরল লাশ হয়ে। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সেটাও আমরা জানি না। গত ১৫ অক্টোবর ঠিক কী ঘটেছিল, তা জানতে চাই। আমার ভাতিজার আসলে কী হয়েছিল, কী কারণে তার মৃত্যু হলো, এর সঠিক তথ্য চাই।’
স্বজনেরা জানান, বিদেশে যাওয়ার পর মনিরুলের পাঠানো অর্থেই চলত পরিবারের দৈনন্দিন খরচ। বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো এবং দুই বোনের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার স্বপ্ন ছিল তার। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি এখন শোকের পাশাপাশি চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
শুক্রবার সকালে মনিরুলের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শেষবারের মতো তাকে দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন। বাড়িতে মরদেহ পৌঁছানোর পর স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরে জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

ন্যাশনাল ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 


















