সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo পেকিন হাঁস পালনে লাখপতি সিংড়ার জাহিদ Logo জয়পুরহাটে বিজিবির অভিযানে প্রায় ৩ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ও কষ্টিপাথরের মূর্তিসদৃশ বস্তু উদ্ধার Logo বদলে গেল জাতীয় চার নেতার নামে থাকা জাহাজের নাম Logo রোজা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ Logo সিরাজগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন Logo সিরাজগঞ্জে আ.লীগ ও কৃষকলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার Logo বাবুনগর মাদ্রাসায় যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যোগ দেবেন মহাসম্মেলনে Logo আপনাদের পয়সা না দিলে শ্রমিকদের ৩০ না ৪০ হাজার টাকা বেতন দিতে পারতাম-মাসুদুজ্জামান মাসুদ Logo প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা Logo মাথা নেই, বুকেই জোড়াচোখ, কে এই ‘ভূতদেবতা’ নিশিকান্ত?
মৃতের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন

মধ্যরাতে মানিকের দাফন, ক্ষোভ প্রকাশ তাসনিম জারার

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী, দাফনের কার্যক্রম চলছে এবং তাসনিম জারা।

পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে বাধা ও বিতর্কের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তার অভিযোগ, মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা তাকে পিরোজপুরে দাফন করতে না দেওয়ার ঘোষণা দেন। পরিস্থিতির কারণে পরিবারের সদস্যদের নিজেদের হাতে কবর খুঁড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতের পর পুলিশ পাহারায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।

 

 

 

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে ঘটনাটিকে অমানবিক উল্লেখ করে বিচার, মানবাধিকার ও মৃতের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাসনিম জারা।

 

 

আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।

 

 

 

শনিবার সকাল দশটার দিকে ৮৭ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, মারা গেছেন। সারা দিন তার পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না।

তার জন্য বাড়িতে প্রথমে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল। মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, “কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি।” পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খুঁড়তে আর কাউকে পাওয়া যায়নি। যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত ব্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।

 

 

অবশেষে মাঝরাতের পর পুলিশ পাহারায়, মেয়ে আর বোনেদের খোঁড়া সেই কবরে ওনার দাফন হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে ছিলেন না।

 

 

 

 

 

এই বৃদ্ধ মানুষটি একজন সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন বলেছেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও করতে দেওয়া হবে না। দাফনের পর সেই একই নেতা বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।

 

 

 

 

মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।

 

 

 

 

আমাদের দেশে জানাজার আগে মৃতের ছেলে বা ভাই সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমার আব্বা যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, মাফ করে দেবেন।” আমরা মাফ করে দিই। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের সব হিসাব-নিকাশ শেষ। যা বাকি থাকে, তার বিচার আল্লাহর হাতে। শনিবার পিরোজপুরে জামায়াতের নেতাকর্মীরা অন্য পথে হেঁটেছেন। নিজের গ্রামে মানিক পশারীর জানাজাটুকুও হয়নি। গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে মাফ চাওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি তার পরিবার।

 

 

 

মানিক পশারীর ‘দাফন পিরোজপুরে হতে দেওয়া হবে না’ এই কথাটা জামায়াতের নেতাকর্মীরা এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে। ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, “জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।” এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সাথে সাথেই, বিরোধী দলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন।

 

 

 

একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে।

 

 

 

নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ। ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন। কিন্তু একজন মৃত মানুষের সাথে ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে এমন আচরণ করেন। বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?

 

মধ্যরাতে মানিকের দাফন নিয়ে তাসনিম জারার ক্ষোভ

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পেকিন হাঁস পালনে লাখপতি সিংড়ার জাহিদ

মৃতের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন

মধ্যরাতে মানিকের দাফন, ক্ষোভ প্রকাশ তাসনিম জারার

আপডেট টাইম : ১০:৫৩:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে বাধা ও বিতর্কের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তার অভিযোগ, মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা তাকে পিরোজপুরে দাফন করতে না দেওয়ার ঘোষণা দেন। পরিস্থিতির কারণে পরিবারের সদস্যদের নিজেদের হাতে কবর খুঁড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতের পর পুলিশ পাহারায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।

 

 

 

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে ঘটনাটিকে অমানবিক উল্লেখ করে বিচার, মানবাধিকার ও মৃতের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাসনিম জারা।

 

 

আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।

 

 

 

শনিবার সকাল দশটার দিকে ৮৭ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, মারা গেছেন। সারা দিন তার পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না।

তার জন্য বাড়িতে প্রথমে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল। মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, “কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি।” পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খুঁড়তে আর কাউকে পাওয়া যায়নি। যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত ব্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।

 

 

অবশেষে মাঝরাতের পর পুলিশ পাহারায়, মেয়ে আর বোনেদের খোঁড়া সেই কবরে ওনার দাফন হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে ছিলেন না।

 

 

 

 

 

এই বৃদ্ধ মানুষটি একজন সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন বলেছেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও করতে দেওয়া হবে না। দাফনের পর সেই একই নেতা বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।

 

 

 

 

মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।

 

 

 

 

আমাদের দেশে জানাজার আগে মৃতের ছেলে বা ভাই সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমার আব্বা যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, মাফ করে দেবেন।” আমরা মাফ করে দিই। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের সব হিসাব-নিকাশ শেষ। যা বাকি থাকে, তার বিচার আল্লাহর হাতে। শনিবার পিরোজপুরে জামায়াতের নেতাকর্মীরা অন্য পথে হেঁটেছেন। নিজের গ্রামে মানিক পশারীর জানাজাটুকুও হয়নি। গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে মাফ চাওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি তার পরিবার।

 

 

 

মানিক পশারীর ‘দাফন পিরোজপুরে হতে দেওয়া হবে না’ এই কথাটা জামায়াতের নেতাকর্মীরা এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে। ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, “জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।” এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সাথে সাথেই, বিরোধী দলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন।

 

 

 

একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে।

 

 

 

নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ। ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন। কিন্তু একজন মৃত মানুষের সাথে ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে এমন আচরণ করেন। বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?

 

মধ্যরাতে মানিকের দাফন নিয়ে তাসনিম জারার ক্ষোভ