সিরাজগঞ্জ , শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo সিরাজগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন Logo সিরাজগঞ্জে আ.লীগ ও কৃষকলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার Logo বাবুনগর মাদ্রাসায় যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যোগ দেবেন মহাসম্মেলনে Logo আপনাদের পয়সা না দিলে শ্রমিকদের ৩০ না ৪০ হাজার টাকা বেতন দিতে পারতাম-মাসুদুজ্জামান মাসুদ Logo প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা Logo মাথা নেই, বুকেই জোড়াচোখ, কে এই ‘ভূতদেবতা’ নিশিকান্ত? Logo গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও স্বমহিমায় ঢাকার রমনা কালী মন্দির Logo ছিনতাইকারী সন্দেহে দুই পুলিশ সদস্যকে পিটুনি দিলেন কুবি শিক্ষার্থীরা Logo হিলি স্থলবন্দরে শনিবার আমদানি-রপ্তানি বন্ধ, স্বাভাবিক থাকবে ইমিগ্রেশন Logo কারাগারে নিরাপত্তা জোরদারে ৭ দফা নির্দেশনা জারি

মাথা নেই, বুকেই জোড়াচোখ, কে এই ‘ভূতদেবতা’ নিশিকান্ত?

ভূত দেবতা। ছবি: আনন্দবাজার

(নিশিকান্ত, ভূতেশ্বর না কি কবন্ধ? নদিয়া ও বাংলার লোকবিশ্বাসে এক বিস্মৃত প্রেতরক্ষক দেবতা)

 

জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হচ্ছে। ঘাটের সিঁড়িতে উবু হয়ে বসে রয়েছে সাধনের বৌ। পিছন থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তার শরীরটা কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেই সঙ্গে কানে আসছে কিছু একটা চিবিয়ে খাওয়ার শব্দ।

 

 

মাথাটা গরম হয়ে গেল সাধনের। মাছ ধুতে এসে আবার কী কাণ্ড করছে বৌ! নির্ঘাত পাড় থেকে পেয়ারা পেড়ে বসে বসে খাচ্ছে। এ দিকে সে বাজার করে এনেছে, পেটে খিদেয় ছুঁচো দৌড়চ্ছে! বৌয়ের সে দিকে কোনও হুঁশ নেই!

 

“তবে রে!” বলে রাগে গজগজ করতে করতে বৌয়ের দিকে এগিয়ে গেল সাধন।

 

 

কাছে গিয়ে যা দেখল, তাতে তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। পেয়ারা নয়, চুবড়িতে রাখা পোনা মাছের টুকরো কাঁচাই চিবিয়ে খাচ্ছে তার বৌ! আর পা দিয়ে অনবরত ঘাটের জল ছলাৎ ছলাৎ করে নাড়ছে।

 

 

কাঁপতে কাঁপতে কোনও মতে সাধন বলে উঠল, “ও বউ…”

 

পরক্ষণেই বৌয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে এল এক বিকট আর্তচিৎকার। মুখের ভিতরকার মাছের রক্ত আর চিবোনো টুকরো ছিটকে এসে লাগল সাধনের গায়ে-মুখে। দড়াম করে ঘাটের উপরে লুটিয়ে পড়ল সে।

 

গ্রামের লোকের একটাই কথা— নিশ্চয়ই বাবা নিশিকান্তের দয়া হয়েছে!

 

 

কে এই বাবা নিশিকান্ত? ভূতচতুর্দশীর আগে বাংলার এক বিস্মৃত লোকদেবতার কথা না জানলেই নয়।

 

প্রেতের অধীশ্বর, ভূতেদের রক্ষাকর্তা নিশিকান্ত কোনও প্রচলিত পৌরাণিক দেবতা নন। তিনি বাংলার লোকবিশ্বাসে প্রেতের অধীশ্বর, ভূত-প্রেতের রক্ষক দেবতা। তাঁর মূর্তি গড়ার রীতিটিও বেশ অদ্ভুত। কোনও উঁচু জায়গায় মাটির ঢিবি তৈরি করে তার উপরে শায়িত অবস্থায় গড়া হয় দেবতার অবয়ব। তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকেন। মূর্তিতে প্রচলিত অর্থে মাথা নেই। বুকের গায়েই ফুটিয়ে তোলা হয় বিস্ফারিত দুই চোখ। মুখ থেকে বেরিয়ে থাকে দীর্ঘ লোলজিহ্বা, আর দুই পাশে উঁকি দেয় ভয়ঙ্কর শ্বদন্ত।

 

 

 

তবে এই মূর্তির অঙ্গসজ্জায় রয়েছে আশ্চর্য সমন্বয়। কোথাও বিল্বপত্রের চিহ্ন, কোথাও শ্রীবিষ্ণুর অভিজ্ঞান। কোথাও কপালে ত্রিপুণ্ড্রক, আবার কোথাও বৈষ্ণবদের রসকলি। শৈব ও বৈষ্ণব— দুই ধারার চিহ্নই যেন মিশে গিয়েছে এই বিচিত্র লোকদেবতার শরীরে।

 

 

লোকবিশ্বাসে তাঁর পরিচয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে, নিশিকান্ত মহাদেবের অনুচর। সেই কারণেই চৈত্রসংক্রান্তির প্রাক্কালে অনেকটা গাজনের অনুকরণে তাঁর উৎসব পালিত হয়। সন্ন্যাসী ও বালারা ভিক্ষা সংগ্রহ করেন। সেই ভিক্ষার চাল-ডাল দিয়ে তৈরি হয় হবিষ্যান্ন। বাড়ির বাইরে বসে তা গ্রহণ করেন ব্রতীরা। পরদিন, পয়লা বৈশাখে হয় দেবতার পুজো।

 

 

 

লোকবিশ্বাস বলে— বাতাস লাগা, প্রেতের উপদ্রব কিংবা নজর লাগার মতো সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ নিশিকান্তের পাটে এসে মুক্তি পান। লোকাচারে এই দেবতা তাই কেবল ভয়ঙ্কর নন, তিনি রক্ষাকর্তাও বটে।

 

 

অন্য একটি মত অনুসারে, তিনি কবন্ধ রাক্ষস। রামায়ণের সেই মস্তকহীন ভয়ঙ্কর রাক্ষস, যার ধড়েই ছিল চোখ-মুখ। প্রচলিত লোককথায় তাঁকে বৃত্রাসুরের সঙ্গী বলেও পরিচয় দেওয়া হয়। বৃত্রাসুরের মতো বজ্রাঘাতে তাঁরও মাথা কাটা পড়েছিল, কিন্তু প্রাণ যায়নি। পরবর্তীতে বনবাসকালে রামচন্দ্র তাঁকে বধ করে মুক্তি দেন।

 

 

কেউ বলেন বাবা ভূতেশ্বর, কেউ বলেন নিশিকান্ত, কেউ নিশকাইন্দা, আবার কেউ কবন্ধ। নামের এত বৈচিত্র থাকলেও লোকবিশ্বাসের মূল সুরটি একই— তিনি অশরীরীদের অধিপতি এবং বিপদে মানুষের আশ্রয়দাতা।

নদিয়া এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ভূতদেবতার পুজোর প্রচলন বহুদিনের। নদিয়ার ফুলিয়ায় তালতলা পাড়ার পুজোর ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে দেশভাগের স্মৃতি।

 

 

শোনা যায়, বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার বামুন-কুইচা গ্রামে এক সময়ে এই ভূতপুজোর প্রচলন ছিল। দেশভাগ ও পরবর্তী উদ্বাস্তু-জীবনের সময়কালে সেই দেশের মানুষ নিজেদের সঙ্গে বয়ে এনেছিলেন এই লোকবিশ্বাস। তাঁদেরই স্মৃতির সূত্র ধরে আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে ফুলিয়ার তালতলা পাড়ায় শুরু হয় এই পুজো।

 

 

প্রথমে ছিল পারিবারিক উদ্যোগ। কালের নিয়মে তা আজ সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। পুজোকে কেন্দ্র করে বসে মেলা। মানুষের ভিড়ে উৎসবের প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

 

 

ভূতেশ্বর বা নিশিকান্তের পুজোর শাস্ত্রীয় প্রমাণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু লোকদেবতার অস্তিত্ব খাল-বিল, নদী-নালা আর গভীর জঙ্গলে ঘেরা অতীত বাংলার মানুষের ভয়, বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা ও যাপনে। ভূতচতুর্দশীর আগে তাই লোকদেবতাদেরও স্মরণ করার পালা। চাইলে ঘুরে আসতে পারেন পয়লা বৈশাখের মেলায়।

 

সূত্র: আনন্দবাজার

 

জনতার কণ্ঠ.কম/এসসিডি

 

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সিরাজগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন

মাথা নেই, বুকেই জোড়াচোখ, কে এই ‘ভূতদেবতা’ নিশিকান্ত?

আপডেট টাইম : ০১:২১:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

(নিশিকান্ত, ভূতেশ্বর না কি কবন্ধ? নদিয়া ও বাংলার লোকবিশ্বাসে এক বিস্মৃত প্রেতরক্ষক দেবতা)

 

জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হচ্ছে। ঘাটের সিঁড়িতে উবু হয়ে বসে রয়েছে সাধনের বৌ। পিছন থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তার শরীরটা কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেই সঙ্গে কানে আসছে কিছু একটা চিবিয়ে খাওয়ার শব্দ।

 

 

মাথাটা গরম হয়ে গেল সাধনের। মাছ ধুতে এসে আবার কী কাণ্ড করছে বৌ! নির্ঘাত পাড় থেকে পেয়ারা পেড়ে বসে বসে খাচ্ছে। এ দিকে সে বাজার করে এনেছে, পেটে খিদেয় ছুঁচো দৌড়চ্ছে! বৌয়ের সে দিকে কোনও হুঁশ নেই!

 

“তবে রে!” বলে রাগে গজগজ করতে করতে বৌয়ের দিকে এগিয়ে গেল সাধন।

 

 

কাছে গিয়ে যা দেখল, তাতে তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। পেয়ারা নয়, চুবড়িতে রাখা পোনা মাছের টুকরো কাঁচাই চিবিয়ে খাচ্ছে তার বৌ! আর পা দিয়ে অনবরত ঘাটের জল ছলাৎ ছলাৎ করে নাড়ছে।

 

 

কাঁপতে কাঁপতে কোনও মতে সাধন বলে উঠল, “ও বউ…”

 

পরক্ষণেই বৌয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে এল এক বিকট আর্তচিৎকার। মুখের ভিতরকার মাছের রক্ত আর চিবোনো টুকরো ছিটকে এসে লাগল সাধনের গায়ে-মুখে। দড়াম করে ঘাটের উপরে লুটিয়ে পড়ল সে।

 

গ্রামের লোকের একটাই কথা— নিশ্চয়ই বাবা নিশিকান্তের দয়া হয়েছে!

 

 

কে এই বাবা নিশিকান্ত? ভূতচতুর্দশীর আগে বাংলার এক বিস্মৃত লোকদেবতার কথা না জানলেই নয়।

 

প্রেতের অধীশ্বর, ভূতেদের রক্ষাকর্তা নিশিকান্ত কোনও প্রচলিত পৌরাণিক দেবতা নন। তিনি বাংলার লোকবিশ্বাসে প্রেতের অধীশ্বর, ভূত-প্রেতের রক্ষক দেবতা। তাঁর মূর্তি গড়ার রীতিটিও বেশ অদ্ভুত। কোনও উঁচু জায়গায় মাটির ঢিবি তৈরি করে তার উপরে শায়িত অবস্থায় গড়া হয় দেবতার অবয়ব। তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকেন। মূর্তিতে প্রচলিত অর্থে মাথা নেই। বুকের গায়েই ফুটিয়ে তোলা হয় বিস্ফারিত দুই চোখ। মুখ থেকে বেরিয়ে থাকে দীর্ঘ লোলজিহ্বা, আর দুই পাশে উঁকি দেয় ভয়ঙ্কর শ্বদন্ত।

 

 

 

তবে এই মূর্তির অঙ্গসজ্জায় রয়েছে আশ্চর্য সমন্বয়। কোথাও বিল্বপত্রের চিহ্ন, কোথাও শ্রীবিষ্ণুর অভিজ্ঞান। কোথাও কপালে ত্রিপুণ্ড্রক, আবার কোথাও বৈষ্ণবদের রসকলি। শৈব ও বৈষ্ণব— দুই ধারার চিহ্নই যেন মিশে গিয়েছে এই বিচিত্র লোকদেবতার শরীরে।

 

 

লোকবিশ্বাসে তাঁর পরিচয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে, নিশিকান্ত মহাদেবের অনুচর। সেই কারণেই চৈত্রসংক্রান্তির প্রাক্কালে অনেকটা গাজনের অনুকরণে তাঁর উৎসব পালিত হয়। সন্ন্যাসী ও বালারা ভিক্ষা সংগ্রহ করেন। সেই ভিক্ষার চাল-ডাল দিয়ে তৈরি হয় হবিষ্যান্ন। বাড়ির বাইরে বসে তা গ্রহণ করেন ব্রতীরা। পরদিন, পয়লা বৈশাখে হয় দেবতার পুজো।

 

 

 

লোকবিশ্বাস বলে— বাতাস লাগা, প্রেতের উপদ্রব কিংবা নজর লাগার মতো সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ নিশিকান্তের পাটে এসে মুক্তি পান। লোকাচারে এই দেবতা তাই কেবল ভয়ঙ্কর নন, তিনি রক্ষাকর্তাও বটে।

 

 

অন্য একটি মত অনুসারে, তিনি কবন্ধ রাক্ষস। রামায়ণের সেই মস্তকহীন ভয়ঙ্কর রাক্ষস, যার ধড়েই ছিল চোখ-মুখ। প্রচলিত লোককথায় তাঁকে বৃত্রাসুরের সঙ্গী বলেও পরিচয় দেওয়া হয়। বৃত্রাসুরের মতো বজ্রাঘাতে তাঁরও মাথা কাটা পড়েছিল, কিন্তু প্রাণ যায়নি। পরবর্তীতে বনবাসকালে রামচন্দ্র তাঁকে বধ করে মুক্তি দেন।

 

 

কেউ বলেন বাবা ভূতেশ্বর, কেউ বলেন নিশিকান্ত, কেউ নিশকাইন্দা, আবার কেউ কবন্ধ। নামের এত বৈচিত্র থাকলেও লোকবিশ্বাসের মূল সুরটি একই— তিনি অশরীরীদের অধিপতি এবং বিপদে মানুষের আশ্রয়দাতা।

নদিয়া এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ভূতদেবতার পুজোর প্রচলন বহুদিনের। নদিয়ার ফুলিয়ায় তালতলা পাড়ার পুজোর ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে দেশভাগের স্মৃতি।

 

 

শোনা যায়, বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার বামুন-কুইচা গ্রামে এক সময়ে এই ভূতপুজোর প্রচলন ছিল। দেশভাগ ও পরবর্তী উদ্বাস্তু-জীবনের সময়কালে সেই দেশের মানুষ নিজেদের সঙ্গে বয়ে এনেছিলেন এই লোকবিশ্বাস। তাঁদেরই স্মৃতির সূত্র ধরে আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে ফুলিয়ার তালতলা পাড়ায় শুরু হয় এই পুজো।

 

 

প্রথমে ছিল পারিবারিক উদ্যোগ। কালের নিয়মে তা আজ সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। পুজোকে কেন্দ্র করে বসে মেলা। মানুষের ভিড়ে উৎসবের প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

 

 

ভূতেশ্বর বা নিশিকান্তের পুজোর শাস্ত্রীয় প্রমাণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু লোকদেবতার অস্তিত্ব খাল-বিল, নদী-নালা আর গভীর জঙ্গলে ঘেরা অতীত বাংলার মানুষের ভয়, বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা ও যাপনে। ভূতচতুর্দশীর আগে তাই লোকদেবতাদেরও স্মরণ করার পালা। চাইলে ঘুরে আসতে পারেন পয়লা বৈশাখের মেলায়।

 

সূত্র: আনন্দবাজার

 

জনতার কণ্ঠ.কম/এসসিডি